Image description

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে বর্তমানে ঠিক কোন স্ট্যাটাসে (আইনি মর্যাদায়) অবস্থান করছেন—জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার অগ্রগতিও জানতে চাওয়া হয়েছে। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে দুই দফায় আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কমিটির সদস্য এস কে আজিজুল বারী জানতে চান, শেখ হাসিনা ভারতে ঠিক কোন স্ট্যাটাসে বা আইনি মর্যাদায় অবস্থান করছেন। তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে রয়েছে, তাও জানতে চান তিনি।

সূত্র জানায়, বৈঠকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে দেশে ফেরত আনার বিষয়টি শুধু একটি আইনি বা প্রশাসনিক প্রশ্ন হিসেবে নয়, কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট বলে আলোচনায় আসে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তার বর্তমান আইনি মর্যাদা সম্পর্কে বৈঠকে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তার বিস্তারিত কোনো নির্দিষ্ট কথা তিনি উল্লেখ করেননি। ফলে তিনি ভারতে ঠিক কোন ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক অবস্থানে রয়েছেন—এ বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবেই রয়েছে।

বৈঠকে দেশে আলোচিত শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার অভিযুক্তকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়। কমিটির সদস্য এস কে আজিজুল বারী এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি জানতে চান।

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভারতে আটক ওই অভিযুক্তকে বাংলাদেশে ফেরত আনার বিষয়ে ভারতীয় উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। অভিযুক্তকে ফেরত পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কোর্ট ওয়ারেন্টও ভারতের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান থাকায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

বৈঠকে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার ও পরে জামিন পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তার জামিনের বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে কোনো ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে কি না এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কী ধরনের আইনি বা কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাও জানতে চান কমিটির এই সদস্য।

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বেনজীর আহমেদের জামিনের বিষয়ে ইউএই সরকারের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করার অংশ হিসেবে একটি লিগ্যাল ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনি ও দাপ্তরিক কাগজপত্র ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

কমিটির আলোচনায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে আসে। বিশেষ করে নারী কর্মী ও শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা, জরুরি যোগাযোগ এবং অভিযোগের পরবর্তী অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কমিটির এক সদস্য প্রবাসীদের জন্য আলাদা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা অ্যাপ চালুর প্রস্তাব দেন। জরুরি হটলাইনে যোগাযোগকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অভিযোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কার্যকর কেস-ট্র্যাকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় আসে।

স্থায়ী কমিটির আলোচনায় অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। সূত্র জানায়, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অভিবাসন ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে অনিয়মিত অভিবাসন, মানব পাচার, জাল ভিসা ও দলিলপত্রের ব্যবহার এবং অননুমোদিত পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিরাপদ, সুষ্ঠু ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার, দেশে ফেরত আনা এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির আলোচনায় দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটও গুরুত্ব পেয়েছে। বৈঠকে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে রোহিঙ্গা সমস্যাটি বিশ্বের অন্যতম জটিল, বহুমুখী ও দীর্ঘায়িত মানবিক বিপর্যয় এর রূপ ধারণ করেছে। এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্যই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ঝুঁকি। দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক প্রয়াস চালিয়ে বাংলাদেশ সরকার এই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

কমিটির আলোচনায় পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থের সম্পর্কও উঠে আসে। নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি আলোচনায় স্থান পায়। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কালবেলা