Image description

বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ভারতের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তার অভিযোগ, অর্থনীতিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্টরা দেশের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করছে।

 

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খুলনা বিএল কলেজ ছাত্রশিবির আয়োজিত অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

কলেজের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগ না করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; জনগণের মেধা ও দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো প্রসঙ্গে তিনি ভারতের প্রভাবের অভিযোগ তুলে বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তার দাবি, এ কারণেই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুর্বল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ‘র’-এর এজেন্টরা প্রভাব বিস্তার করছে বলেও অভিযোগ করেন ছাত্রশিবির সভাপতি।

 

রাজনীতিতে মেধাবীদের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে আনার উদ্যোগ রয়েছে। সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দেশটির নেতৃত্বে মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা হয়।

 

সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রসঙ্গে ছাত্রশিবির সভাপতি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় দলীয় বিবেচনায় নম্বর দেওয়ার মাধ্যমে নিয়োগে বৈষম্য করা হয়েছে। দলীয় পরিচয় না থাকা কিংবা মাদরাসা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়া হতো বলেও দাবি করেন তিনি।

 

বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমানোর দাবিতে ছাত্রশিবির আন্দোলন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাইয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। চাকরির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দলীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনা গ্রহণযোগ্য নয়। পুলিশি যাচাই-বাছাইয়ের কারণে প্রাথমিকের প্রায় এক হাজার প্রার্থী চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও দাবি করেন নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তার অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য বা স্থানীয় নেতার সুপারিশ না থাকাকে চাকরি না দেওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

 

এর আগে মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ তাদের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা বের হওয়ার পর তাঁদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করা হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলেও তাদের নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত পরিকল্পনা নেই দাবি করে তিনি বলেন, পরীক্ষায় ব্যর্থ শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে আবারও এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন।

 

মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বড় পরিসরে সরকারি বৃত্তি চালুর প্রস্তাব দিয়ে ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, সরকার চাইলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য অর্থায়ন করতে পারে। বিদেশে পড়াশোনা শেষে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে মানবসম্পদ হিসেবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

 

তরুণদের সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি চাকরি ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ইংরেজি, আইইএলটিএস, জিআরই, প্রোগ্রামিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল মার্কেটিং, যোগাযোগ দক্ষতা ও গবেষণার মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দেন। ছাত্রশিবির ‘থ্রাইভ এন জেন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে জানিয়ে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি, আইইএলটিএস, গবেষণাপদ্ধতি ও বিভিন্ন সফট স্কিলের কোর্স থাকবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এসব সুবিধা পাবেন।

 

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চার বছর নিজেদের গড়ে তোলার কাজে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রথম বর্ষ থেকেই চাকরি কিংবা উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি শুরু করলে ভবিষ্যতে ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশ হতে হবে না।

 

শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে তরুণদের মধ্যে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ধূমপানসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রবণতা বাড়ছে। এসব থেকে দূরে থেকে যোগ্যতা ও চরিত্রের মাধ্যমে নিজেদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সমাজে তাঁদের প্রয়োজন তৈরি হয়।

 

তিনি বলেন, শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য নয়, মৃত্যুর পর দেশ ও সমাজে নিজের অবদান কী থাকবে—তরুণদের সেই প্রশ্নও নিজেদের করতে হবে। চরিত্র ও নৈতিকতা হারালে জীবনের অন্যান্য অর্জনও অর্থহীন হয়ে পড়ে।

 

 

বিএল কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাহী চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী, খুলনা মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি রাকিব হাসান ও সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন।

 

এ ছাড়া ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস শেখ কামরুল আলম, সাবেক মহানগর সভাপতি মুকাররম বিল্লাহ আনসারী, আজিজুল ইসলাম ফারাজী, মুশাররফ আনসারী, জাহিদুর রহমান নাঈম ও আরাফাত হোসেন মিলনসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

 

অনুষ্ঠানে ক্যারিয়ার সেশনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যাশা সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদের শিল্পীরা এতে অংশ নেন। নবীন শিক্ষার্থীদের আল কুরআন, ফুল, বই, ফোন স্ট্যান্ড, স্টিকার, বুকমার্ক, শুভেচ্ছা কার্ড ও স্ন্যাকসসহ বিভিন্ন উপহার দেওয়া হয়।

 

নবীনবরণ উপলক্ষে ক্যাম্পাসে তোরণ, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ও ফটো বুথসহ বিভিন্ন আয়োজন করা হয়। ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ডে নবীনদের শুভেচ্ছাবার্তার পাশাপাশি ইসলামের মৌলিক বিষয়, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি, ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক পরিচিতি এবং বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও জুলাই শহীদদের নিয়ে প্রদর্শনী করা হয়।