Image description

মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া নিয়ে চলেছে ‘দোষারোপের রাজনীতি’। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ সরকারি দলের দিকে। আর সরকারি দলের এমপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ঘটনায় জামায়াত ও আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার কথা। দায় চাপানোর এই রাজনৈতিক কথার খেলার মাঝখানে রাড্ডার স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ভাঙচুর ও লুটের ঘটনার তদন্ত কতটা এগোল?

রাড্ডা হামলায় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা-কর্মী ও নারী সংসদ সদস্যদের দায়ী করেছে।

অন্যদিকে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে সরকার। ওই ঘটনার পর পাঁচদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ।

এর মধ্যে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাশেম ওই ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির ‘যোগসাজশ’ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।

তবে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে জামায়াত ও আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা আছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হোক। পুলিশ জানিয়েছে, একটি তদন্তে পুলিশের রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। সেটি মূলত পুলিশের গাফিলতি নিয়ে। মামলার তদন্ত নিয়ে অগ্রগতি কতটা, সে বিষয়ে এখনও কিছু জানা যায়নি।

অবশ্য গত শনিবার শাহ আলী থানার ওসিকে বদলি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ ডিএমপি।

তবে এনসিপির সরাসরি অভিযোগ বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) বিরুদ্ধে।

গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মিরপুর-১ নম্বরের ওই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে হামলা চালিয়ে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ভেঙে ফেলে একদল লোক। হামলাকারীরা ভাঙা ভবনের সামনে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লি.’ নামে একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়ে চলে যায়। ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকা টিকা দেওয়ার সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায় তারা।

যে অভিযোগ বিরোধী দলের

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে গত দুদিন ধরে বলা হচ্ছে ওই ঘটনায় একজন নারী সংসদ সদস্য জড়িত। সোমবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এর জন্য সরকারি দলের লোকজনকে দায়ী করেছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয়ই সরকারি দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এত বড় অপকর্ম করার সাহস কেউ করবে না। অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা উচিত।”

একই দিন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দাবি করেছেন, ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যারা হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছিল, তারাই এসে পরিষ্কার করছে বলে দাবি করেছেন। এর আগের দিন তিনি ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যের দিকে আঙুল তোলেন। বলেন, ‘‘আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, বিএনপির একজন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপির নেতৃত্বে, যার স্বামী এই এলাকার কমিশনার ছিলেন একসময় এবং যার ভাই ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন একসময়, তার নেতৃত্বে ধ্বংসযজ্ঞ, লুটতরাজ, একটা মবতন্ত্র কায়েম করা হলো।”

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

যুবদল নেতার অভিযোগ পুলিশের দিকে

অপর দিকে শাহআলী থানার ওসির ‘পৃষ্ঠপোষকতাতেই’ মধ্যরাতে ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় যুবদল সভাপতি সাজ্জাদুল মিরাজ। ঘটনার রাতেই এ দখলবাজি ঠেকাতে শাহআলী থানার ওসি ও মিরপুর বিভাগের ডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে দাবি করেছেন মিরাজ। ওই রাতে এক ফেসবুক পোস্টে মিরাজ লেখেন, “মিরপুর-১ মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের পাশে ‘রাড্ডা’ এখন দখল হচ্ছে।…প্রায় ৭/৮০০ শত লোকজন রাত দেড়টায় মাথায় লাল কাপড় পরে দখল চালাচ্ছে এখনো। শাহ্ আলী থানার ওসিকে এই বিষয়ে অবগত করেছি ১ ঘণ্টা আগে...পুলিশের সামনেই ভাঙচুর হচ্ছে কোন জবাব নেই। কতো টাকার বিনিময়ে একটি মানবিক সেবার কার্যালয় ভেঙ্গে ফেলার চুক্তি হয়েছে সবার কাছে তার জবাব দিতে হবে।”

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রোববার এই যুবদল নেতা জানান, যারা ভেঙেছে তাদের মুখে মাস্ক ছিল। তিনি লেখেন, ‘‘ওই ঘটনায় আমি ওসি সাহেবকে ফোন করি ১২টা ২০ মিনিটে। ওসি বলল, আমি তো ওখান থেকে মাত্র আসছি। কোনো কিছু তো দেখলাম না। আমি বললাম আবার যান। তো উনি এখানে (রাড্ডা) আসছে কি না আমি জানি না, উনি বলছে যে নাই। কিন্তু বললাম, এখনো ওরা ওখানেই অবস্থান করতেছে। কয়েকবার বললাম, তখন তিনি বলেন যে, ‘ভাই আবার যাচ্ছি’। তো আমি আবার এর মধ্যে ডিসি সাহেবের ফোন নম্বরে ফোন দিলাম।”

মিরাজ লেখেন, “এক ঘন্টা পর ওসি সাহেব আবারও আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘ভাই কোন ঠিকানাটা জানি বলছেন? তখন আমি বললাম, ভাই এটা কোন কথা। আপনাকে আমি ১২টা ২০ মিনিটে ফোন দিয়েছি এখন বাজে দেড়টা। এখন আপনি বলছেন, কোন মার্কেট? থানা থেকে এখানে আসতে বড় জোর দুই থেকে তিন মিনিট লাগবে।” শাহআলী থানার ওসি ঘটনাস্থলেই ছিলেন বলেও দাবি করে মিরাজ বলেন, ‘‘ দখলদাররা সব সময়ই থাকে কিন্তু এমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক যদি তাদের সহায়তা করে তাহলে কিন্তু দখলের পরিমাণটা বেড়ে যায়।”

যুবদল নেতার ওই সব মন্তব্য বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসি হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার চরচাকে বলেন, ‘‘এটা ওনার (যুবদল নেতা) বিষয়। এটা উনি বলতে পারবেন। কে দায়ী উনি কোন তথ্যের ভিত্তিতে বলেছেন? তবে আমাদের তদন্ত রিপোর্ট পুলিশের ঊর্ধ্বতন বিভাগে পাঠানো হয়েছে।”

তবে গত রোববারই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহআলী থানার ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন।

যা বলছেন এমপি তুলি

জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাশেমের অভিযোগের বিষয়ে সংরক্ষিত নারী এমপি চরচাকে বলেন, ‘‘জামায়াত আর শিবিরের কাজ হচ্ছে বট। উনি তাহলে বটের নেতা। কিছুক্ষণ আগে ওনার ভেরিফায়েড পেজ থেকে ফেক নিউজ গেছে। উনি যদি না জেনে এগুলো বলে থাকেন, তাহলে উনি বট হিসেবেই কাজ করতেছে। মিরপুরে উনাকে ফেসবুক এমপি হিসেবেই জানে। উনি ফেসবুকেই উল্টাপাল্টা লিখে থাকেন।”

রাড্ডার ঘটনা নিয় এই নারী সংসদ সদস্য চরচাকে বলেন, ‘‘আমরা স্বচ্ছ বিচারটা চাই।”

ঘটনার সঙ্গে জামায়াত ও আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা নিয়ে কোনো তথ্য আছে কি না জানতে চাইলে তুলি বলেন, ‘‘ওখানে (রাড্ডায়) আগের যেটা কমিটি ছিল ১৭ বছরের (আওয়ামী শাসনামলের) সময় সেই কমিটিগুলোতে তো আওয়ামী লীগের লোকজন ছিল। কমিটি নিয়ে কথা হচ্ছিল। এ কারণেই আমার ওই উক্তিটা আসছিল। না হলে তো আসত না।”

জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাশেমকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

যা বলছে পুলিশ

তদন্তে কী পাওয়া গেছে জানতে চাইলে পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসি নাছের রিকাবদার তা জানাতে রাজি হননি। চরচাকে তিনি বলেন, ‘‘তদন্ত দুইভাবে হয়। তার একটি হলো রেগুলার মামলা। ওইটাই মূল তদন্ত আরকি। ওই মামলার তদন্ত আমরা করতেছি। আলাদা করে তদন্ত রিপোর্ট পুলিশ করে না।” তিনি বলেন, ‘আরেকটি হলো পুলিশের গাফিলতি আছে কি না। আর সেটি ওই দিনই পেশ করা হয়েছে। আর যেটা মামলার তদন্ত, সেটা চলছে।”

তবে পুলিশের সক্রিয়তার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই। গত রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, রাড্ডার ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি বলেছেন, এ ঘটনায় শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে ও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হচ্ছে।