যিনি গাছের কান্না শুনতে পান, অনুভব করেন পরিবেশের ক্রমবর্ধমান ক্ষত। সেই ক্ষত সারাতে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ান তিনি। গাছ লাগানো থেকে শুরু করে বন রক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা তৈরি কিংবা তরুণদের সংগঠিত করা—সবকিছুতেই তার নিরলস প্রচেষ্টা। বলছি তরুণ পরিবেশকর্মী রাতুল মুন্সির কথা। লাল মাটি ও আনারসের জন্য বিখ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুরে তার বেড়ে ওঠা। একটা সময় তার বাড়ির কাছেই ছিল বিস্তীর্ণ শালবন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই বন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে সরে গেছে। দিনের পর দিন শালবনের পরিধি কমে যাওয়া তাকে ভাবিয়ে তোলে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনই যেন তাকে পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে আরও দৃঢ় করেছে।
ছেলেবেলা থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে তার সখ্য। গাছ লাগানো ও পরিচর্যার অভ্যাসও তখন থেকেই। তবে প্রকৃতিকে গভীরভাবে বোঝার শিক্ষা শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক দ্রাবিড় সৈকতের কাছ থেকে তিনি হাতে-কলমে প্রকৃতি পাঠের সুযোগ পান। শিখেছেন গাছের যত্ন, প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব এবং সবুজায়নের গুরুত্ব। ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি শতবর্ষী বটগাছ ও পুকুর রক্ষায় সহপাঠীদের সঙ্গে টানা ৩৭ দিনের আন্দোলনে অংশ নেন রাতুল। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য যেন গাছটি কাটা বা পুকুরটি ভরাট করা না হয়—ছিল তাদের দাবি। আন্দোলনের সফলতা তার পরিবেশ আন্দোলনের পথকে আরো দৃঢ় করে।
এরপর ক্যাম্পাসের প্রতিটি গাছের সঙ্গে যেন তার বন্ধুত্ব তৈরি হয়। শুধু চারা রোপণ নয়, সময়মতো পানি ও জৈব সার দেওয়া, পরিচর্যা করা—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন আন্তরিক। একটি বীজ থেকে চারা তৈরি করে সেটিকে মহিরুহে পরিণত করার প্রক্রিয়াও তার ভালোভাবে জানা। গাছের প্রতি তার মমত্ববোধের একটি ঘটনা আজও মনে রাখার মতো। একবার ক্যাম্পাসের একটি মহুয়াগাছের বাকল ও পাতা খেয়ে ফেলে একটি ছাগল। গাছটি প্রায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। রাতুল পাশের গ্রাম থেকে গোবর সংগ্রহ করে পুরো গাছে প্রলেপ দেন। অনেকটা ভাঙা হাড়ে প্লাস্টার দেওয়ার মতো। যত্নে গাছটি আবার প্রাণ ফিরে পায়। আজও সেই মহুয়াগাছটি দাঁড়িয়ে আছে, আর তার শরীরে নেই সেই পুরোনো ক্ষতচিহ্ন। রাতুলের দাবি, জীবনের এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২৫ হাজার গাছ রোপণ করেছেন। পাশাপাশি অসংখ্য অসুস্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত গাছের পরিচর্যা করে সেগুলো বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।

৪০০ কিলোমিটার বৃক্ষ পদযাত্রা
পরিবেশ রক্ষার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ২০২০ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কিলোমিটার হেঁটে বৃক্ষ পদযাত্রায় অংশ নেন রাতুল। এ কর্মসূচির আওতায় ৪০০টির বেশি বাজার ও ২৬টি উপজেলায় বৃক্ষরোপণ এবং আগ্রাসী বৃক্ষ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা হয়। ফলদ বাংলাদেশ সংগঠনের হয়ে তিনি প্রায় তিন লাখ ফলদ গাছ রোপণে অংশ নিয়েছেন বলে জানান। দেশের ৬৪ জেলায় বিলুপ্তপ্রায় ও দুর্লভ বৈলামগাছ রোপণের পাশাপাশি একক প্রচেষ্টায় দুই হাজারের বেশি তালগাছও লাগিয়েছেন। ছাত্রজীবনে হাতখরচ ও টিউশনি থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশও তিনি গাছ লাগানো ও পরিবেশ রক্ষায় ব্যয় করেছেন।
শালবন রক্ষায় লড়াই
মধুপুর গড় বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল। শালগাছে আচ্ছাদিত এই বন দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের দখল ও বৃক্ষনিধনের চাপের মুখে রয়েছে। কোথাও আগুন দিয়ে বন উজাড়, কোথাও গাছের বাকলে রাসায়নিক প্রয়োগ করে গাছ মেরে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। বনের এই পরিস্থিতি রাতুলকে ব্যথিত করে। তাই শালবন রক্ষায় তিনি নিয়মিত সচেতনতা ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় মানুষকে বনের গুরুত্ব বোঝানোর পাশাপাশি তরুণদেরও পরিবেশ রক্ষার কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন। তার লক্ষ্য, তরুণদের নিয়ে একটি শক্তিশালী পরিবেশবাদী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। এ উদ্দেশ্যেই তিনি বাংলাদেশ বনসম্পদ গবেষণা ও উন্নয়ন পরিষদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন।
‘পৃথিবীটা শুধু মানুষের জন্য নয়’
প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে রাতুলের ভাবনাও বিস্তৃত। তার মতে, পরিবেশ শুধু গাছ কিংবা বন দিয়ে গঠিত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বন্যপ্রাণী পর্যন্ত প্রতিটি প্রাণ। রাতুল বলেন, ‘আমরা শুধু ভাবি—আমাকে বাঁচতে হবে, আমাকে খেতে হবে। অথচ মৌমাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ পরাগায়ন না করলে ফসল উৎপাদন হবে না। গাছ আমাদের অক্সিজেনসহ জীবনের মৌলিক চাহিদার অনেকটাই পূরণ করে। তারপরও আমরা নির্বিচারে গাছ কাটছি, বন উজাড় করছি।’