ভালো নেই নারায়ণগঞ্জের রঙের ব্যবসায়ীরা। দামবৃদ্ধি ও কম উৎপাদনের কারণে কমেছে বেচা-কেনা। কোনো কোনো ব্যবসায়ী সারাদিন বসে থেকেও কোনো ক্রেতা পান না। কোনো কোনো দোকান আছে যেখানে সারাদিন চলে যায়, বনি-বাট্টা পর্যন্ত হয় না। ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণেই তাদের এই ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না।
কোনো কোনো ব্যবসায়ীর অবস্থা এরকম যে, আর কিছুদিন এভাবে চলতে থাকলে তারা ব্যবসা ধরে রাখতে পারবেন না। তারপরও তারা আশাবাদী হয়ত একদিন তাদের দিন ফিরবে। তাদের ব্যবসা পরিস্থিতি ভালো হবে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সময় শহরের টানবাজার এলাকায় রঙের জমজমাট ব্যবসা ছিল। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার উপায় থাকতো না মালামাল বোঝাই ঠেলাগাড়ির জন্য। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই তাদের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে থাকে। আর এই রঙের ব্যবসা সাধারণত গার্মেন্টস এবং ডাইংয়ের কারখানার সঙ্গে সম্পর্কিত। গার্মেন্টস ডাইং কারখানা ভালো থাকলে রঙের ব্যবসাও ভালো থাকে।
এদিকে বর্তমানে ডলারের দাম বাড়ার কারণে সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বগতির দিকে। যে কারণে অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। বেশি নিনিয়োগের কারণে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারছেন না। কয়েক বছরের ব্যবধানে পণ্যগুলোর দাম দিগুণ হয়ে গেছে। সেইসঙ্গে বিভিন্ন গার্মেন্টস এবং ডাইং বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্যাস বিদ্যুতের সমস্যার কারণে উৎপাদন কমে গেছে। দিনের পর দিন অনেক গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের ব্যবসা গার্মেন্টস এবং ডাইংয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে এখানেও প্রভাব পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ীকে পথে নামতে হচ্ছে। এখান থেকে বিভিন্ন পণ্য বাকি নিয়ে থাকে। গার্মেন্টসের উৎপাদন বন্ধ থাকলে তাদের বকেয়া পরিশোধ করতেও সমস্যা হয়ে যায়। এসব কারণে ক্রেতাদের আনাগোনা একেবারে কমে গেছে।
মেসার্স সুমন এন্টারপ্রাইজের মালিক সুমন চন্দ্র সাহা বলেন, অনেকদিন রঙের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার পর নিজেই প্রতিষ্ঠান করেছি। মনে করেছিলাম এবার হয়ত একটু বেশি লাভবান হব। কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেওয়ার পর মনে হচ্ছে অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি। সারাদিন চলে যায়, কোনো ক্রেতা পাই না। যেদিন বিক্রি হয় সেদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বিক্রি হয়। অথচ একটা প্রতিষ্ঠান চালাতে অনেক টাকা খরচ হয়। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে। যদি একটা ভালো চাকরি পেয়ে যাই তাহলে ব্যবসা ছেড়ে দেব।
‘তাহমিদ কালার’র ম্যানেজার সামসুদ্দিন বলেন, বর্তমানে একেবারেই বেচা-কেনা নেই। এমনও দিন যায় যেদিন বনি বাট্টা পর্যন্ত করতে পারি না। আমাদের মালিক বলে দিয়েছে দোকান ছেড়ে দিবে। তিনি আর এই ব্যবসা করবেন না। কারণ তাকে প্রতিমাসে লোকসান গুণতে হচ্ছে।
‘নিউ বিসমিল্লাহ বিউটি কালার’র মালিক আব্দুল মালেক বলেন, বিগত ৩০ বছর ধরে এই রঙের ব্যবসা করে আসছি। একসময় জমজমাট ব্যবসা ছিল। দোকানের চারপাশে এত পরিমাণ ক্রেতা থাকত কথা বলে শেষ করতে পারতাম না। আর এখন ক্রেতা নেই বললেই চলে। একদম বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এখানে প্রভাব পড়েছে। জানি না এভাবে কতদিন ব্যবসা ধরে রাখতে পারব।
বাংলাদেশ নীট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেডিওএ) সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন বলেন, আমাদের শিল্প কারখানার সঙ্গে অনেক কিছুই সম্পৃক্ত থাকে। গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের উৎপাদন বন্ধ ছিল। বর্তমানে গ্যাংস সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই রং এবং কেমিকেলের দাম বেড়ে গেছে। আগে যে রং কিনতাম ৫৫০ টাকা দিয়ে সেটা ৮৭৫ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এরকম হলে কীভাবে ব্যবসা করবো? এসব বিষয়গুলোর দিকে সকলেরই নজর দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডাইস অ্যান্ড কেমিকেল মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল হোসেন বলেন, বর্তমান ব্যবসা পরিস্থিতি খুবই খারাপ অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই ক্রমান্বয়ে ব্যবসা খারাপের দিকে যাচ্ছে। দেশের পরিস্থিতিতে ডলারের ঊর্ধ্বমুখী, এজন্য আমাদের মালামালের রেট অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ব্যবসাটা গার্মেন্টসের সঙ্গে সম্পর্কিত। গার্মেন্টসে দিনের পর দিন অর্ডারের সংখ্যা কমছে। যে কারণে দিন দিন ব্যবসা খারাপের দিকে যাচ্ছে। সরকারের কাছে আহ্বান জানাই, যদি বিভিন্ন সেক্টরে সুনজর দেয় তাহলে আমরা দেশের জন্য ভালো কিছু দিতে পারব।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নারায়ণগঞ্জ জেলার সহকারী পরিচালক হৃদয় রঞ্জন বনিক বলেন, আমাদের নিয়মিত বাজার তদারকি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই কার্যক্রমের মধ্যে ভোক্তার যেন ন্যায্যমূল্যে পণ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হয় এবং সঠিক মূল্যে যেন পণ্য পেতে পারে সে লক্ষ্যে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ যদি ন্যায্যমূল্যে পণ্য পেতে প্রতারিত হয় তাহলে আমাদের কাছে অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নিব।