Image description

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে প্রায় ছয় বছর আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এক গৃহবধূর বাচ্চা হয়। চার মাস পর শিশুটি মারা যায়। এরপর চেষ্টা করেও ওই নারী আর গর্ভধারণ করতে পারেননি। সম্প্রতি চিকিৎসকের পরামর্শে একাধিক পরীক্ষা করার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর লাইগেশন (বন্ধ্যাকরণ) করা হয়েছে। গৃহবধূর অভিযোগ, ছয় বছর আগে অস্ত্রোপচারে শিশু জন্মের সময় অনুমতি না নিয়ে চিকিৎসক তাঁর লাইগেশন করেছেন। 

ওই গৃহবধূর নাম কুলসুম আক্তার (৩০)। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা সদরের মরাপুকুরপাড় গ্রামের বাসিন্দা ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা শামসুজ্জামান সবুজের স্ত্রী। 
চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি ও কুলসুম আক্তারের স্বামী শামসুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি সন্তান প্রসবের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি হন কুলসুম আক্তার। ওই দিন দুপুরে গাইনি বিশেষজ্ঞ জিনান রেজা তাঁর অস্ত্রোপচার করেন। তাঁর ছেলেসন্তানের জন্ম হয়। চার দিন পর ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। তবে মাত্র চার মাস বয়সে মুখে ওষুধ আটকে শিশুটি মারা যায়। অকালে সন্তান হারিয়ে স্বামী-স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরবর্তী সময় তারা আবার সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে গর্ভধারণ হচ্ছিল না। এ নিয়ে অনেক চিকিৎসককে দেখান। কিন্তু কাজ হচ্ছিল না। সর্বশেষ গত ৭ মার্চ এক চিকিৎসকের পরামর্শে কুলসুমের এইচএসজি পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, তাঁর ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ। ২ এপ্রিল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচার করা হয়। সেখানকার সার্জারি নোটে উল্লেখ করা হয়, তাঁর দুই পাশের ফ্যালোপিয়ান টিউবের মধ্যবর্তী অংশ অনুপস্থিত, যা বাইলেটারাল টিউবাল লাইগেশনের স্পষ্ট লক্ষণ।
সন্তান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় কুলসুম ২৬ আগস্ট সিলেট এমএজি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। ৮ সেপ্টেম্বর চিকিৎসকরা তাঁর মাইক্রোসার্জিক্যাল রিক্যানালাইজেশন (টিউব পুনঃসংযোগ) অস্ত্রোপচার করেন। ওসমানী মেডিকেলের অপারেশন নোটেও লেখা হয়, কুলসুমের ডান ও বাঁ– উভয় পাশের ফ্যালোপিয়ান টিউব শক্ত করে লাইগেশন (বাঁধা) করা ছিল। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউব দুটির বাঁধা অপসারণ করে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করেন।


 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ২০২০ সালের অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) রেজিস্টার পর্যালোচনায় দেখা যায়, রেজিস্টারে কুলসুমের অস্ত্রোপচারের বিবরণে শুধু ‘লোয়ার ইউটেরিয়ান সিজারিয়ান সেকশন’ উল্লেখ রয়েছে। 

শামসুজ্জামান সবুজ বলেন, ‘ওই চিকিৎসক আমার স্ত্রীর সিজার করার সময় আমাদের অনুমতি না নিয়ে লাইগেশন করে ফেলেন। সিজারে জন্ম নেওয়া আমাদের ছেলেসন্তান চার মাস বয়সে মারা যায়। পরবর্তী সময় আমার স্ত্রীর গর্ভধারণ না হওয়ায় আমরা বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করাই। এক পর্যায়ে গত মার্চ মাসে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে পরীক্ষা করাতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে। আমরা আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাই। এরপর টিউব পুনঃসংযোগ করা হয়। চিকিৎসকের অবহেলার জন্য, ক্ষতি করার জন্য আমি আইনের আশ্রয় নেব।’ 
যোগাযোগ করলে ২৫০ শয্যা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তৎকালীন গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. জেনিন রেজা বলেন, ‘ওই দিন সিজার অপারেশনের সময় কোনো ধরনের লাইগেশন করা হয়নি। কুমিল্লা মেডিকেল কোথাও লিখে দেয়নি যে লাইগেশন করা হয়েছে। আমি কুমিল্লা মেডিকেলের রিপোর্ট দেখেছি, তাতে ব্লকের কথা বলা আছে। কখনও কোনো কারণে টিউব ব্লক হয়ে গেলে রিক্যানালাইজেশন করা হয়। রোগীর লাইগেশন করা হয়েছে এমন কোনো রেকর্ড আমাদের ওটি রেজিস্টারেও নাই।’ 


 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, ‘রোগীর স্বামী অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর স্ত্রীর অনেক দিন সন্তান না হওয়ার কারণে তারা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন, তাঁর লাইগেশন করা আছে। তাদের অভিযোগ ছিল, ২০২০ সালে আমাদের এখানে সিজার অপারেশন করার সময় ডাক্তার ভুলে লাইগেশন করেছিলেন। আমি তাঁর স্বামীর উপস্থিতিতে ওটি থেকে ২০২০ সালের রেজিস্টার খাতা এনে দেখেছি, ওই তারিখে লাইগেশনের কোনো এন্ট্রি নেই। তাঁর বাচ্চা হয়েছে জীবিত এবং সুস্থ বাচ্চা হয়েছিল রেকর্ড আছে। তা ছাড়া আমি ওই ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনিও বলেছেন, তিনি সিজারের অপারেশনের সময় লাইগেশন অপারেশন করবেন কেন?’ এক প্রশ্নের জবাবে ডা. রতন বলেন, সিজার অপারেশনের সময় ভুলে লাইগেশন অপারেশন করার সুযোগ নেই। কারণ লাইগেশন করতে হলে জরায়ুর দুপাশই ওপেন করতে হবে। ওই নারীর রিপোর্ট দেখে আমাদের ধারণা, অন্য কোথাও তাঁর অপারেশন হতে পারে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান জানান, সাধারণত এ রকম অপারেশন করানোর আগে রোগী কিংবা অভিভাবকের সম্মতি লাগে এবং ওটি রেজিস্টারে তা উল্লেখ থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো নোট নেই। রোগীর সম্মতি ছাড়া লাইগেশন করালে চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। এ ছাড়া ওই নারী পরবর্তী সময় অন্য কোথাও লাইগেশন করিয়ে থাকতে পারেন।