মিরপুর-১, মোহাম্মদপুর, আদাবর ও ইসিবি চত্বর। রাজধানী ঢাকার চার স্থান। ভিন্ন প্রেক্ষাপট, ভিন্ন ঘটনা। হামলা, ভাঙচুর, দখলচেষ্টা ও লুটপাট। মাত্র ৪৭ ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে মিরপুর-১ নম্বরে ৫০ বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠান দরিদ্রদের স্বাস্থ্য ও টিকাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেয় দুই শতাধিক লোক। সর্বশেষ শনিবার রাত ১১টার দিকে ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের পর আশপাশের কয়েকটি বাড়িসহ স্থাপনায়ও হামলা করা হয়েছে। হামলাকারীরা বেশ কয়েকটি পিকআপে দলবদ্ধভাবে এসেছিল। কারও হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র।
মিরপুরে রাড্ডায় লুটপাটের ৩৭ ঘণ্টা পর শনিবার বেলা ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যানে ১৭ কাঠা জমি দখল ঘিরে চলে সশস্ত্র হামলা-ভাঙচুর। দুই ঘটনাস্থলের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার। একই দিন সকাল সাড়ে ৬টায় স্বল্প দূরত্বের আদাবর শ্যামলী হাউজিংয়ে ৮ তলা বাড়ি দখলের চেষ্টায় রামদা, চাপাতি, পিস্তলসহ প্রায় ২০ জনের একটি দল হামলা চালায়। সে ঘটনার ভয়াবহ দৃশ্য ধরা পড়ে সিসিটিভি ক্যামেরায়।
দুদিনের কম সময়ের ব্যবধানে রাজধানীর প্রায় ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে এসব ঘটনায় জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অপরাধীরা শঙ্কাহীন চিত্তে এসব করছে কিনা– এমন প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। আলাদা কারণে ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ চার স্থানে হামলা ও লুটপাটে জড়িত। তাদের অনেকের হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। কেউ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা-ভাঙচুরে জড়ায়। এমন ঘটনা শুধু রাজধানীতে নয়; দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই দলবদ্ধভাবে জমি দখলচেষ্টা, হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এতে প্রাণহানিও হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর এবং বর্তমান সরকারের সাত মাস পরও পুলিশ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে কিনা– এমন আলোচনা পুলিশ বাহিনীর ভেতরেও আছে। মাঠ পর্যায়ে দ্রুত আইন কার্যকর নিয়ে অনেক জায়গায় পুলিশের মধ্যে দ্বিধা দেখা যাচ্ছে। কিছু অপরাধ কর্মকাণ্ড শেষ হওয়ার অনেক পর ঘটনাস্থলে যাচ্ছে পুলিশ। অনেক জায়গায় আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। কেউ মব তৈরি করে পরিস্থিতি পাল্টাতে চান। পূর্ণ মনোবল নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা বা মানুষের আস্থার জায়গায় এখনও যেতে পারছে না পুলিশ। বাহিনীর ভেতরেও রয়েছে নানা বিভাজন। এর প্রভাব পড়ছে মাঠে। অনেক জায়গায় ভিন্নচিত্র দেখা যায়। কারও কারও সঙ্গে অপরাধীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
রাড্ডা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পর সেখানকার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক অসাধু নেতাকর্মীদের সঙ্গে থানা পুলিশের যোগসাজশের বিষয়টি সামনে আসছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গতকাল শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আদাবরে বাড়ি দখলের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা।
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট, ভাঙচুর এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ঘটনাগুলোকে কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত উল্লেখ করে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিসহ সারাদেশে দলের আত্মশুদ্ধি অভিযানের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন সমকালকে বলেন, দখল, হামলা, সংঘবদ্ধভাবে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। এসব দেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে– এটা বলার সুযোগ কম। কোথাও আবার এর সঙ্গে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার বিষয় উঠে আসছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা দিতে ব্যর্থ হলে মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হবে। এটি বন্ধ করতে দুইদিকে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। একটি হলো, আইনের যথাযথ প্রয়োগ। আরেকটি হলো রাজনৈতিক দলের মধ্যে শক্ত শৃঙ্খলার চর্চা। এটা করতে না পারলে শঙ্কাহীন চিত্তে অপরাধীরা একের পর এক ঘটনায় জড়াবে। একই জায়গায় একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটছে। অপরাধীরা যে ভয়ডরহীন– এটি তারই ইঙ্গিত দেয়।
নূর খান লিটন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তখনই নিষ্ক্রিয় দেখা যায়, যখন মনে করে– অপরাধীদের সঙ্গে প্রভাবশালী লোকজন রয়েছে। তখন তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা সমকালকে বলেন, যেসব ঘটনা ঘটছে, এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের সঙ্গে কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতার সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ অনেকে করতে পারেন। এ জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। অপরাধী যারাই হোক, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনলে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে।
পুলিশ সদরদপ্তরের মুখপাত্র এআইজি এএইচএম শাহাদাত হোসাইন সমকালকে বলেন, ঢাকায় যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার সঙ্গে পূর্ববিরোধ ছিল। জমির দীর্ঘ দিনের বিরোধ নিয়ে এসব ঘটেছে। তবে যারা শক্তি প্রদর্শন করতে গেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ সদস্যদের কোনো গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। প্রাথমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শাহ আলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
শাহাদাত হোসাইন বলেন, আদাবরসহ অন্য ঘটনায় আমাদের সদস্যদের শৈথিল্য থাকলে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকার চারটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিটি ঘটনায় দলবদ্ধভাবে হামলা হয়েছে। রাড্ডার ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সেখানে দেড় থেকে দুশ লোক হামলা চালিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। ঘটনা জানার অনেক পরে সেখানে পুলিশ পৌঁছালেও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। রাড্ডার ১০ কাঠা জমি দখল ঘিরে এ হামলা হয়েছে। ঘটনাস্থলে নেওয়া হয় এক্সক্যাভেটর। দীর্ঘ সময় হামলা ও লুটপাটের পর দখলকারীদের পক্ষ থেকে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে– এটি ছিল পরিকল্পিত। অল্প সময়ে এত আয়োজন সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টি ও তাঁর অনুসারীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে ফেরদৌসি আহমেদ সমকালের কাছে তা অস্বীকার করেছেন।
আদাবরে শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ১৫-২০ জন একটি বাড়ির সামনে আসে। কিছুক্ষণ বাড়িটি পর্যবেক্ষণ করে তারা। পরে চারজন মূল ফটকের সামনে আসে। তাদের মধ্যে দুজনের হাতে চাপাতি, একজনের হাতে রামদা ছিল। ফটকের একটু দূরে পিস্তল হাতে একজন দাঁড়িয়ে ছিল। সে-ই এ হামলার নির্দেশনা দিচ্ছিল।
বাড়ির মালিক আমিনুর রহমান খানের ভাতিজা মনির হোসেন সমকালকে জানান, হামলাকারীরা প্রথমে বাড়ির মূল ফটক খুলে সবাইকে বের হয়ে যেতে বলে। ভেতর থেকে কেউ বের না হওয়ায় তারা বাইরে থেকে ‘টাকা দে, বাড়িতে থাকিস, টাকা দিস না? বের হ’ বলে হুমকি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে চাপাতি ও রামদা দিয়ে গেটে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। ৯৯৯-এ ফোন করার প্রায় তিন ঘণ্টা পর পুলিশ সেখানে যায়।
সাম্প্রতিক আরও কিছু ঘটনা
হবিগঞ্জের বাহুবল বাজারের পুরাতন হাসপাতাল সড়কে গতকাল দুপুরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক স্ট্যান্ড দখল এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হন।
শুক্রবার কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে জলমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উপজেলা বিএনপির দুপক্ষে সংঘর্ষ হয়েছে। উপজেলার পূর্ব অষ্টগ্রামের আখড়াবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিলমাকশা জলমহালের ভোগদখল নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে উপজেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাঈদ আহমদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম শাহিনের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এর জেরে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর পাবনা সদরে ১০ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার প্রধান আসামির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। টানা কয়েক দিন ওই বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়।