আগুন লাগলে বেরিয়ে যাওয়ার নিরাপদ পথ নেই। কোথাও নেই কার্যকর অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ কিংবা জরুরি আলোর ব্যবস্থাও অনুপস্থিত। এমন অবস্থায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সর্বশেষ অগ্নিনিরাপত্তা জরিপে পরিদর্শন করা ভবনের প্রতি পাঁচটির প্রায় দুটিতে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি পাওয়া গেছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে পরিদর্শন করা ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবনের মধ্যে ৩ হাজার ৯৩৮টিই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কিংবা ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’। অর্থাৎ পরিদর্শন করা ভবনের ৩৭ দশমিক ৩৮ শতাংশেই অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নিশ্চিত করা হয়নি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এক বছরের ব্যবধানে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের হার বেড়েছে। ২০২৪ সালে পরিদর্শন করা ভবনের ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ অগ্নিঝুঁকিতে থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। প্রতিবছর পরিদর্শন, নোটিশ, সতর্কতা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন পরিদর্শন করেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ৬ হাজার ৫৯৫টি বা ৬২ দশমিক ৬২ শতাংশ ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা পরিস্থিতি ‘সন্তোষজনক’ পাওয়া গেছে। বিপরীতে ৩ হাজার ৩১৬টি বা ৩১ দশমিক ৪৮ শতাংশ ভবনকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ৬২২টি বা ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভবনকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ পরিদর্শন করা প্রতি পাঁচটি ভবনের মধ্যে প্রায় দুটি অগ্নিবিপর্যয় মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে। ঝুঁকির তালিকায় সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আবাসিক ভবন, পোশাক কারখানা, হাসপাতাল-ক্লিনিক, শপিং মল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট, কেমিক্যাল গুদাম ও ফিলিং স্টেশন—সব ধরনের স্থাপনাই রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, মানুষ আটকে যাওয়া এবং উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত ৬২২টি ভবনকে তারা বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন।
পুরোনো ঝুঁকির সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন ভবন
ফায়ার সার্ভিসের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বড় অংশ বহু বছর আগে নির্মিত। ভবনের কাঠামো ও ব্যবহারের ধরন এমন যে, অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান অগ্নিনিরাপত্তা মানদণ্ড পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এসব ভবন বছরের পর বছর ঝুঁকির তালিকাতেই থেকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন নির্মিত কিছু ভবনও প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই ব্যবহারে আসায় তালিকায় নতুন ঝুঁকি যুক্ত হচ্ছে।
পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন ভবন ও হাসপাতালের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
হাসপাতাল-রেস্টুরেন্ট-মার্কেটেও বড় ঝুঁকি
ফায়ার সার্ভিস সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পরিদর্শন করা ৬৫২টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
৪৭৩টি আবাসিক ভবনের মধ্যে ১৯০টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ২২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ১ হাজার ৫৩৩টি পোশাক শিল্পকারখানার মধ্যে ৫৯২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৮৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাওয়া গেছে। ৭২০টি অন্যান্য কলকারখানার মধ্যে ২৫১টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ৩৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ।
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ১ হাজার ৫৩টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে ৪৩২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৭৬টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ৪৮০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ১৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৯টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অপরদিকে, ১ হাজার ৭১টি রেস্টুরেন্টের মধ্যে ৩৭২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৪৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ১ হাজার ১৭১টি শপিং মল ও মার্কেটের মধ্যে ৩৪৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১০৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ।
৭৮৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাওয়া গেছে। ১০১টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ও সাতটি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া ‘অন্যান্য’ শ্রেণির ২ হাজার ৪০৪টি ভবনের মধ্যে ৫২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৯টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ।
কেমিক্যাল গুদামের ৮৮ শতাংশই ঝুঁকিতে
সবচেয়ে বেশি অগ্নিঝুঁকির চিত্র পাওয়া গেছে কেমিক্যাল গুদামে। পরিদর্শন করা ৯১টি কেমিক্যাল গুদামের মধ্যে ৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ ৮০টি গুদামই কোনো না কোনো মাত্রায় অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। হার হিসেবে তা প্রায় ৮৮ শতাংশ।
অগ্নিদাহ্য রাসায়নিকের উপস্থিতির কারণে এসব স্থাপনায় আগুন দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে। ফলে কেমিক্যাল গুদামের এই পরিস্থিতিকে দেশের অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল, মার্কেট ও পোশাক কারখানার বড় অংশে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতিও সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত অধিকাংশ ভবনেই অগ্নিনিরাপত্তার মৌলিক উপাদানে ঘাটতি রয়েছে। অনেক ভবনে কার্যকর ফায়ার এক্সিট নেই। পর্যাপ্ত বা সচল অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও জরুরি আলোর ব্যবস্থাও পাওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা যা বলছেন
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভবন জরিপের সময়ই মালিকপক্ষকে ত্রুটি ও ঝুঁকির কারণগুলো জানিয়ে তা সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “কী কী কারণে ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা মালিকপক্ষকে জানানো হয় এবং সমাধানের জন্য বলা হয়। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে থাকা ফায়ার সার্ভিসের ইন্সপেক্টররা নোটিশ দেন। অনেক সময় তাতেও কাজ হয় না। তখন সিটি করপোরেশন কিংবা জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।”
ঝুঁকি নিরসনে নির্দেশনা না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান, গত বছর ১৯২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ১৭৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ কোটি ৯৪ লাখ ৫২ হাজার ২২০ টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি আটটি মামলা করা হয়েছে।
বছরে ২৭ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ড
ফায়ার সার্ভিসের বার্ষিক প্রতিবেদনের অন্য অংশে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশ অগ্নিকাণ্ডের কারণ ছিল বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট।
অগ্নিকাণ্ডের এই উচ্চ সংখ্যার মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের হার বেড়ে যাওয়াকে আরও উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শুধু ভবন পরিদর্শন ও ঝুঁকির তালিকা প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। এজন্য সবার সচেতনতা জরুরি। পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তার ত্রুটি সংশোধনে ভবন মালিকদের বাধ্য করতে হবে।