Image description

দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই কয়েকশ মানুষ নতুন করে মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন অনেকে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরাও নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। প্রশ্ন একটাই— কবে নিয়ন্ত্রণে আসবে ডেঙ্গু? কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে। তবে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে এ সময় আরও বাড়তেও পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর সারা দেশে একই গুরুত্ব দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ চালু রাখতে হবে। এক্ষেত্রে অনুসরণ করতে হবে ‘কলকাতা মডেল’।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলছেন, যে সমস্যা যত গভীরে, তা সমাধানে তত বেশি সময় লাগে। বাড়তি মনোযোগ দরকার। সারা দেশে এডিস মশার যে পরিমাণ লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে পুরো দেশই ডেঙ্গুর ভয়াবহ ঝুঁকিতে। আর ঢাকা শহরের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে এডিস মশার লার্ভা নেই। টানা পাঁচ বছর বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত পদক্ষেপই শুধু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

পঁাচ বছর সময়সীমার ব্যাখ্যা হিসেবে কবিরুল বাশার বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটির মানুষকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা এবং সেই চর্চা চালিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে মশা, রোগীর ওপর নজরদারি, পর্যাপ্ত গবেষণা, সেগুলো মাঠে বাস্তবায়ন, দক্ষ জনবল তৈরি, কার্যকর কীটনাশকের ব্যবস্থা করার যে প্রক্রিয়া, এতে এ সময় লেগে যাবে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৭৩ হাজার ৬৯৪ জন। আর মারা গেছে ২২৫ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ৬ এবং আক্রান্ত ২ হাজার ১৫৮ জন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০০ সাল থেকে যত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তার ৮০ শতাংশ রোগী গত চার বছরের। ডেঙ্গুতে মৃত্যুহারও বাংলাদেশে অনেক বেশি। কর্মক্ষম ব্যক্তিরা উল্লেখযোগ্য হারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা রয়েছেন বেশি ঝুঁকিতে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মারা গেছেন চট্টগ্রামের মনি আকতার। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে একপর্যায়ে দরকার হয় লাইফ সাপোর্টের। খরচ চালাতে পারবে না ভেবে এই নারীকে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার। অ্যাম্বুলেন্সে তোলার ছয় মিনিটের মাথায় মারা যান এই নারী। এই নারীর আট বছরের ছেলে আবু জাহেদও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। চিকিৎসা নিয়ে এখন বাড়িতে আছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পাঁচ বছর সময় দরকার বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেনও। এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন, ডেঙ্গু যে অবস্থায় পৌঁছেছে, সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসবে না। স্থানীয় মানুষ ও বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করে কাজ করতে হবে। এ সময় কাজের পাশাপাশি নিয়মিতভাবে ফল মূল্যায়ন করতে হবে। কোনো চ্যালেঞ্জ এলে দ্রুত সমাধান করতে হবে। জবাবদিহির সংস্কৃতিও জরুরি। এই পদ্ধতি অবলম্বন করে ভারতের কলকাতা শহর এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে।

ফগিং নয়, মশার জন্মস্থান শনাক্ত ও ধ্বংস— এর সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি, ডেটাবেজ, জনসম্পৃক্ততা ও আইন প্রয়োগ— এই মডেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করে সফল হয়েছে কলকাতা। এই মডেল আগে থেকে অনুসরণ করা হলেও ২০২৩ সালে কলকাতায় ডেঙ্গু বাড়ার পর ২০২৪ সালে কর্মসূচিটি শক্তিশালী ও পুনর্গঠন করা হয়। এটি তৎকালীন মেয়র একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। সম্ভাব্য প্রজননস্থল শনাক্তে ড্রোন, লার্ভিসাইড ও ডেটাবেজ ব্যবহার করা হয়; পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি বিভাগকে নিয়ে যৌথ অভিযান, জনসচেতনতা এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এতে কলকাতার মডেলটি মূলত নজরদারি, প্রজননস্থল ধ্বংস, প্রযুক্তি ও জনসম্পৃক্ততার সমন্বিত ব্যবস্থা।

২০২৩ সালে কলকাতায় ১৩ হাজার ৯২৬ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেও, ২০২৬ সালে জানুয়ারি থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কলকাতা মিউনিসিপাল করপোরেশন এলাকায় রোগীর সংখ্যা ৫৩৯— গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কম। অথচ বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি।

২৭ বছর ধরে মশা নিয়ে গবেষণা করছেন অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি বলছেন, এডিস মশা হুট করে আর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নেই। কয়েকটা বিষয় সমন্বিত করে কাজ করতে হবে। কার্যক্রম কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। শীতকালে মশা কম থাকে। এ সময় মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার করলে ভালো ফল আসবে। অথচ বাস্তবে থাকে ঢিলেঢালা ব্যবস্থা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক মো. হালিমুর রশীদের ভাষ্য, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কাজ করা হচ্ছে। তবে কতদিনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এখনই বলা যাচ্ছে না। সবকিছুর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যায় না। এখানে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতও একটি বড় বিষয়।