Image description

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর থেকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশের দামের তুলনার প্রসঙ্গ বারবার আনা হলেও যে কথাটি বলা হচ্ছে না, তা হলো দুই দেশে পরিবহন ভাড়ার ব্যাপক পার্থক্য।

বাংলাদেশে নগর পরিবহন, শহরতলী ও দূরপাল্লায় যে হারে বাস ভাড়া দিতে হয়, পশ্চিমবঙ্গে সে ভাড়া অনেক কম।

আবার সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ যে হারে ভাড়া নির্ধারণ করে, যাত্রীদের কাছ থেকে নানা কৌশলে আদায় করা হয় তার চেয়ে অনেক বেশি। বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, আসলে যাত্রীদের অভিযোগ করার কোনো জায়গাও নেই।

বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে পুলিশের ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ারই নেই, অথচ বিআরটিএর পর্যাপ্ত লোকবল নেই।

যাত্রী অধিকার নিয়ে সোচ্চার সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সারা দেশে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় যে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে, এর জন্য মূলত প্রশাসনিক দুর্বলতা দায়ী। যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে পারে না, সেই সঙ্গে পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।’

পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে টাইমসকে বলেন, সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিআরটিএ একটি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নন টেকনিক্যাল লোক ভরা এই সংস্থাকে এটাকে পুরোপুরি ঢেলে না সাজালে সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব নয়।

তেলের দাম বাড়লে ভাড়া বাড়ে, কমলে কমে না

পশ্চিমবঙ্গেও গত আট বছরে জ্বালানি তেলের দাম বহুবার বাড়লেও বাস ভাড়া একবারও বাড়ানো হয়নি। অথচ বাংলাদেশে এই সময়ে ভাড়া বেড়েছে চারবার। আবার ২০২২ সালের পর ৬ দফায় ডিজেলের দাম মোট ১৩ টাকা কমানোর পরও বাস ভাড়া কমেনি একটুও।

২০২১ সালের নভেম্বরে, ২০২২ সালের আগস্ট, চলতি বছরের এপ্রিল এবং গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম বাড়ানোর পর প্রতিবার বাস ভাড়া বাসে আনুপাতিক হারে।

প্রতিবার দেখা গেছে, সরকার যে হারে ভাড়া বাড়ায়, আদায় হয় তার চেয়ে বেশি। বিআরটিএ কিছুদিন উচ্চবাচ্য করে, কিন্তু পরে বাড়তি ভাড়াই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এরপর সেই বাড়তি ভাড়ার ওপর আবার বাসে, সেখানেও আদায় হয় আরও বেশি।

কিন্তু ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা, ২০২৪ সালের ৭ মার্চ ৭৫ টাকা, ১ সেপ্টেম্বর ১ টাকা ২৫ পয়সা এবং ২০২৫ সালের ১ জুন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি আরও ২ টাকা করে কমানো হলেও বাস ভাড়া কমেনি।

সরকারের পক্ষ থেকে কখনো কিলোমিটারে ৫ পয়সা, কখনও ২ পয়সা, তখনও ৩ পয়সা ভাড়া কমানোর ঘোষণা কার্যকর হয়নি।

চলতি বছরের এপ্রিলে ডিজেলের দাম বাড়িয়ে ২০২২ সালের আগস্টের তুলনায় কেবল ২ টাকা বেশি করার পর বাস ভাড়া বেড়ে যায় ওই বছরের চেয়ে বেশি।

পশ্চিমবঙ্গে বাস মালিকদের সমিতি ওয়েস্ট বেঙ্গল বাস অ্যান্ড মিনিবাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ নারায়ণ বসু টাইমসকে বলেন, ‘২০১৮ সালে রাজ্য সরকার বাস ভাড়া বৃদ্ধি করেছিল, যখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ৬৫ রুপি। বর্তমানে তেলের দাম ১০০ রুপি। কিন্তু সরকার থেকে বাস ভাড়া এখনো বাড়ানো হয়নি।’

ভাড়া নির্ধারণের নীতিমালা যাত্রীর বিপক্ষে

পশ্চিমবঙ্গে নগর পরিবহন ও শহরতলীতে একজন যাত্রী কত বেশি দূরত্বে যাবে, তার ভাড়ার হার তুলনামূলকভাবে তত কম।

বর্তমানে কলকাতায় ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। দূরত্ব ৮ কিলোমিটার পর্যন্ত হলে ভাড়া হয় ১২ টাকা এবং ১২ কিলোমিটার হলে ভাড়া হয় ১৫ টাকা।

অর্থাৎ, ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া আড়াই টাকা হলেও যাত্রাপথ ১২ কিলোমিটার হলে প্রতি কিলোমিটারে তা হয়ে যায় ১ টাকা ২৫ পয়সা।

দূরপাল্লায় সাধারণ বাসে প্রথম ৪ কিলোমিটারের জন্য ভাড়া ১০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ৭০ পয়সা যোগ হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ঠিক করে দেওয়া হয়। কোনো যাত্রী ৫ কিলোমিটার দূরত্বে গেলে যে হারে ভাড়া, ৩০ কিলোমিটার দূরত্বেও তা একই।

 

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৭০ পয়সা, শহরতলীতে তা ২ টাকা ৫৯ পয়সা আর দূরপাল্লায় ২ টাকা ৪০ পয়সা।

ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের পথে ৮৬ কিলোমিটারের জন্য ভাড়ার হার যত, ঢাকা থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত ৪৩৮ কিলোমিটারের পথেও ভাড়ার হারও একই রকম। অথচ পথের দূরত্ব বেশি হলে গাড়ি চালানোর খরচ কমে আসে।

অথচ লঞ্চের ক্ষেত্রে দূরত্ব বেশি হলে ভাড়ার হার কমে। বর্তমানে, নদীপথে প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাড়া ৩ টাকা ১৭ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৭১ পয়সা।

আশীষ কুমার দে বলেন, ‘কম দূরত্বে যে হারে ভাড়া বাড়বে, বেশি দূরত্বে তার চেয়ে কম হারে বাড়বে–এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাসে তা অনুসরণ করা হয় না। এটা বিআরটিএর দুর্বলতা বা অনিয়ম কিংবা পরিবহন মালিকদের প্রতি দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।’

বাড়তি ভাড়া আদায়ের যত কৌশল

বড় বাসে ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৫১ আসন ধরে। তবে যাত্রীর সুবিধার জন্য আসন কমালে ভাড়া বাড়তে আনুপাতিক হারে।

দূরপাল্লায় বেশিরভাগ রুটেই বাস মালিকরা ৪০ আসন ধরে ভাড়া নির্ধারণ করে। কিন্তু বাসে গুনে আসন পাওয়া যায় ৪৪ থেকে ৪৭টি। অর্থাৎ চার থেকে সাতটি আসন কমিয়ে ১১ আসনের ভাড়া যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হয়।

কিলোমিটার চুরি আরেক কৌশল। ঢাকা থেকে কাপাসিয়া হয়ে কিশোরগঞ্জ পর্যন্ত সড়কের দূরত্বে ১০২ কিলোমিটার হলেও বাস মালিক সমিতি ভাড়া নির্ধারণ করেছে ১৩০ কিলোমিটার ধরে।

নগর পরিবহনে ভাড়া দূরত্বের বদলে আদায় করা হয় নির্ধারিত দূরত্বে ওয়েবিল হিসাবে। একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে আরেকটি দূরত্ব পর্যন্ত ওয়েবিলে ১০ টাকা ভাড়া হলে পরের ওয়েবিলে যোগ হয় আরও ১০ টাকা, পথে যাত্রী যেখানেই নামুক, ভাড়া দিতে হয় পুরো পথের।

এখানে কিলোমিটারের কোনো হিসাব নেই, ঢাকায় প্রতি কিলোমিটারে ৪ টাকা বা তার চেয়ে বেশি আদায়ের নজিরও আছে।

আশীষ কুমার দে টাইমসকে বলেন, ‘বাসে দূরত্ব অনুযায়ী নতুন ভাড়ার তালিকা টানানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেটাই তো সরকার কখনো নিশ্চিত করতে পারেনি।’

ভাড়া নির্ধারণের সময় বাসে গড়ে আসনের ৭০ শতাংশ যাত্রী ধরা হয়। অর্থাৎ যে বাসে আসন ৪৭টি, সেখানে আসলে বৈধ আসন ৪০টির ৭০ শতাংশ, মানে ২৮ জন যাত্রী ধরে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু নগর পরিবহনে থাকে উপচে পড়া ভিড়, দূরপাল্লায় খালি আসন থাকে কমই।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব খন্দকার মোজাম্মেল হক টাইমসকে বলেন, ‘সরকারই মালিকদের একচেটিয়াভাবে ভাড়া নির্ধারণের সুযোগ দেয়। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়, সব অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ভাড়া নির্ধারণের টেবিলে থাকে সরকার ও মালিক সমিতি। এখানে যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধি কই?’

এসব বিষয় জানতে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানকে কল করলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

ব্যাপক চাঁদাবাজি, অভিযোগ পুলিশের বিপক্ষেও

কিশোরগঞ্জের একটি বাস মালিক যে হিসাব দিয়েছেন, তাতে একটি বাসে প্রতিদিন ২ হাজার টাকার আশপাশে নানা ধরনের চাঁদা দিতে হয়।

চাঁদা আদায়কারীদের মধ্যে ২ জেলার মালিক সমিতি যেমন আছে, তেমনি যাত্রাপথে ভৈরব, নরসিংদীর মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নকেও টাকা দিতে হয়।

এর বাইরে আছে পুলিশের টাকা। সেই বাস মালিক বলেন, ‘যতগুলো হাইওয়ে থানা আছে, সবগুলোতে প্রতি মাসে টাকা দিতে হয়। একে আমরা মান্থলি বলি।’

এর বাইরে প্রতি বছর ফিটনেস নবায়নের সময় বাস প্রতি ৫ হাজার টাকা, তিন বছর পরপর রুট পারমিট নেওয়ার সময় ৫ হাজার টাকা এবং নতুন বাস নিবন্ধনের সময় ৮ হাজার টাকার টাকা করে ঘুষ দিতে হয় বলে অভিযোগ তার।

চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ টাইমসকে বলেন, ‘পরিবহন পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু ব্যয় থাকেই। পরিবহন খাতের এসব বিষয় দেখভালের জন্য সংগঠন ও অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং সাংবাদিকরাও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। দীর্ঘদিনের এই প্রক্রিয়া একদিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়।’

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ও পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের পণ্য পরিবহনে অঞ্চল থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয় শ্রমিক ইউনিয়নকে। আবার প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে পুলিশ প্রশাসনকে মান্থলি দিতে হয়। এসবই তো খরচ বাড়ায়।’

পরিবহন খাতে এই চাঁদাবাজি ওপেন সিক্রেটের মতো। বরাবরের মতোই পুলিশ এটা স্বীকার করতে চায় না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই।’

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইডি ফারুক আহমেদ ফোনই ধরেননি।

ছোট নোটের অভাবে বাড়ে খরচ

বিশেষ করে নগর পরিবহনে যাত্রীরা খুচরা টাকার অভাবে বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছে। দূরত্ব ভেদে ভাড়া এখানে নির্ধারিত হয় ১০ টাকা, ১৫ টাকা, ২০ টাকা, অর্থাৎ একক হয়ে গেছে ৫ টাকা। কিন্তু দূরত্ব অনুযায়ী ১১ টাকা ১২ টাকা বা ১৩ টাকা দেওয়ার সুযোগ এখানে নেই। এর কারণ, বাজারে পর্যাপ্ত খুচরা টাকার প্রচলন নেই।

এর কারণ হলো বাংলাদেশ ব্যাংক বহু বছর ধরেই ছোট নোট বাজারে ছাড়া বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি কয়েনও এখন আর বানানো হয় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসাইন টাইমসকে বলেন, ‘১ ও ২ টাকার নোট বা কয়েন বাজারে কম দেখা যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে এগুলোর ব্যবহার আগের তুলনায় অনেক কমেছে। বাস ভাড়ার মতো লেনদেনেও এখন সাধারণত ১০, ১৫ বা ২০ টাকার মতো অঙ্ক ব্যবহৃত হয়। আমরা অন্য মূল্যমানের নোট ছাপায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী টাইমসকে বলেন, ‘একে এক ধরনের সুশাসনের অভাব হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ১ ও ২ টাকার নোটের ঘাটতির কারণে উৎপাদকরা একটা বড় ধরনের মুনাফা অর্জন করছে। সেটা সবজির বাজার থেকে শুরু করে পরিবহন পর্যন্ত।’