ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশকে পুনর্নির্মাণে থ্রি-আর স্ট্র্যাটেজি বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের এ কৌশল তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক এ অধিবেশনে তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম-খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত দেশ মেরামতের জন্য বর্তমান সরকার পুনরুদ্ধার, পুনর্বহাল এবং পুনর্গঠন (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) এ তিন ‘আর’ কৌশল অনুসরণ করছে। তিনি তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সহায়তা কামনা করেন।
# রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহায়তার আহ্বান
তারেক রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে রোহিঙ্গা ইস্যুটি একটি মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি তার ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নারী শিক্ষা, নারী ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দেন। প্রধানমন্ত্রী সবার বসবাসের উপযোগী ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন।
এবার জাতিসংঘ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ চার দশক পর এ অধিবেশনে সভাপতির আসনে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো এবং বাংলায় জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়ে তার পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে এক অনন্য নজির গড়লেন। বিশ্ব সংস্থার এ সর্বোচ্চ মঞ্চে এর আগে তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভাষণ দেন।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাবা-মায়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্বসমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের শুরুতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি একাত্তরের শহীদ এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ করেন। সেই সঙ্গে গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ায় দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে অভিনন্দন জানান।
বৈশ্বিক সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানব সৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যূত হয়ে পড়ছে। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা-সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
# ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত
তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।
পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ, এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ, তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।
# পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান
চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অব্যাহত সমর্থনের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।
এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন আশা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্য আমি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি এক মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
# জলবায়ু ন্যায়বিচারে বৈশ্বিক পদক্ষেপের দাবি
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের তেমন ভূমিকা না থাকলেও বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবিলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। তাই ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরো জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ আশা করে।
পরিবেশ সুরক্ষায় ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি শুরুসহ তার সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী । এছাড়া সুন্দরবনের মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি, বৃহৎ জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনা-বেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো সরকারের নানা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে।
# সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ
আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই গড়বে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়ো-টেকনোলজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায় বা এ ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
# বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সকল দেশের ক্ষেত্রে এ উত্তরণ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য।
জনগণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই যে রাষ্ট্রে দলমত, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকলেই নিশ্চিন্তে, নিরাপদে সমান অধিকার, সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশবান্ধব একটি নিরাপদ এবং স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে চলছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে, আমরা অংশীদারত্ব উদ্ভাবন এবং দেশি বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, প্রতিটি শিশু তাদের সব সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে, সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা। এজন্যই আমরা বলি… ‘সবার আগে বাংলাদেশ-সবার জন্য বাংলাদেশ’।