মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে এবার শুরু হয়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট। বিশ্ববাজারে বাড়তি দাম ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে দেশে এলপিজি আমদানি কমে গেছে। বাজারে চাহিদার চেয়ে ৩০ শতাংশ সরবরাহ কমে গেছে। এতে অনেক জায়গায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দুই হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। এটি আরও বাড়তে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, গত আগস্টে এলপিজি আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন। ১৩টি বেসরকারি কোম্পানি আমদানি করেছে। আর এ মাসে আমদানি করেছে ৯টি কোম্পানি। ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার টন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বলছে, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স নিয়েছে ৫২টি কোম্পানি। এর মধ্যে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরতে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব প্ল্যান্ট আছে।
আমদানি করার সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির। যদিও নিয়মিত আমদানি করে ৮ থেকে ৯টি কোম্পানি। গত বছর শেষ তিন মাসে আমদানি কমায় সংকট তৈরি হয়েছিল। এখন আবার আমদানি কমতে শুরু করেছে।
প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে। দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশই যায় গৃহস্থালির রান্নায়। পরিবহনে, শিল্পকারখানাতেও এলপিজি ব্যবহার করা হচ্ছে।
এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের সদস্যরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর বন্ধ থাকায় সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনার পাশাপাশি জাহাজেও নিয়মিত হামলা হচ্ছে। এতে বিশ্ববাজারে এলপিজির ঘাটতি তৈরি হয়েছে, বেশি দামেও পাওয়া যাচ্ছে না। জাহাজভাড়া বেড়েছে কয়েক গুণ। কেউ কেউ আমদানি বন্ধ রেখেছেন।
এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, যাঁদের এলপিজি আমদানির চুক্তি আছে, তাঁরাও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সরবরাহ কম পাচ্ছেন। খোলাবাজারেও সরবরাহ কমেছে। বিইআরসি ১৬০ ডলার আমদানি দর ধরে এলপিজির দাম সমন্বয় করেছিল। এখন বিশ্ববাজারে দাম ২৬০ থেকে ৪০০ ডলার পর্যন্ত। আগামী মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই সরবরাহ ধরে রাখতে বাধ্য হয়েই রেশনিং করতে হচ্ছে।
এলপিজি বাজারের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি মেঘনা ফ্রেশ এলপি গ্যাসের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা প্রথম আলোকে বলেন, বেশি দামে হলেও আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে মেঘনা গ্রুপ। কিন্তু বাড়তি দামেও চাহিদামতো বিশ্ববাজারে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রতি মাসেই এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। এ মাসের জন্য বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয় ২ সেপ্টেম্বর। যদিও ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বাড়তি দিয়ে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে।
এলপিজি বাজারের মাত্র ১ শতাংশ সরকারি কোম্পানির হাতে, বাকিটা বেসরকারি খাতে। বেসরকারি খাতে আমদানি কমায় গত ডিসেম্বরে দেশে এলপিজির সংকট দেখা দেয়। এরপর সরাসরি আমদানির উদ্যোগ নেয় সরকার। গত ২০ জানুয়ারি তিন শর্তে বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমোদন দিয়েছিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এরপর ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দফায় সরবরাহকারী খোঁজা হয়; কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি।
পরে ৪ আগস্ট স্পিড মার্কেটিং নিজে থেকে এলপিজি সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করলে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে পাঁচ হাজার টন এলপিজি সরবরাহের কাজ দেওয়া হয় তাদের। তবে এলপিজি কবে আসবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আমদানি করা এলপিজি দেওয়া হবে অনুমোদিত বেসরকারি অপারেটরদের। পরে তারা নিজেরা তা বাজারজাত করবে।
এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের সভাপতি আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সরকার নিজেই তো এলপিজি আনতে পারছে না, বেসরকারি খাত কীভাবে আনবে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের উন্নতি না হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। সরকার আমদানি করে সরবরাহ বাড়াতে পারে।
এক সপ্তাহ আগে পাশের বাসায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছে ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। আর এখন তাঁর কিনতে হয়েছে ২ হাজার ১০০ টাকায়।মোহাম্মদপুরে হাউজিং লিমিটেডের বাসিন্দা তামান্না আখতার
এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশই রান্নার কাজে

দেশে আবাসিকে নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয় ২০১৫ সালে। এরপর রান্নার জ্বালানি হিসেবে দ্রুত বাড়তে থাকে এলপিজির ব্যবহার। বছরে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এলপিজির চাহিদা আছে। প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে। দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশই যায় গৃহস্থালির রান্নায়। পরিবহনে, শিল্পকারখানাতেও এলপিজি ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রতি মাসেই এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। এ মাসের জন্য বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয় ২ সেপ্টেম্বর। যদিও ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বাড়তি দিয়ে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। বাজারে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গত ডিসেম্বরের তীব্র সংকটে দেশের কোনো কোনো এলাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার তিন হাজার টাকায়ও বিক্রি হয়।
মোহাম্মদপুরে হাউজিং লিমিটেডের বাসিন্দা তামান্না আখতার প্রথম আলোকে বলেন, এক সপ্তাহ আগে পাশের বাসায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছে ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। আর এখন তাঁর কিনতে হয়েছে ২ হাজার ১০০ টাকায়।
কয়েক দিন ধরে বাজারে এলপিজির বাড়তি দামের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সংকটের সময় অভিযানের ঝুঁকি থাকে। খুচরা বিক্রেতারা দোকান বন্ধ করে দিলে সরবরাহ আরও কমতে পারে। এখন পর্যন্ত আমদানি ঠিকঠাক হচ্ছে। তবে আমদানি অব্যাহত রাখা নিয়ে শঙ্কা আছে।বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর গত এপ্রিলে দেশের ইতিহাসেও সর্বোচ্চ দাম বাড়ে এলপিজির। এপ্রিলের শুরুতে ১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ানো হয় ৩৮৭ টাকা। এরপর একই মাসের ১৯ এপ্রিল আবার বাড়ানো হয় ২১২ টাকা। তবে জুন ও জুলাইয়ে টানা দুই মাস দাম কমানো হয় দেশে। এরপর গত তিন মাস কিছুটা বাড়া-কমার মধ্যে ছিল দাম। এখন নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাড়তি দাম ঠেকাতে ভোক্তা অধিকারের অভিযানের ভয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কেউ কেউ দোকান বন্ধ করে রাখছেন। এতে বাজারে এলপিজি সরবরাহের সংকট আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক দিন ধরে বাজারে এলপিজির বাড়তি দামের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সংকটের সময় অভিযানের ঝুঁকি থাকে। খুচরা বিক্রেতারা দোকান বন্ধ করে দিলে সরবরাহ আরও কমতে পারে। এখন পর্যন্ত আমদানি ঠিকঠাক হচ্ছে। তবে আমদানি অব্যাহত রাখা নিয়ে শঙ্কা আছে। তাই কেউ কেউ মজুত করে বাজারে সরবরাহ কমাতে পারে। পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।