কবরস্থান সংকটে ভুগছে রাজধানী ঢাকা। ঘনবসতিপূর্ণ শহরে কবরের জন্য এক টুকরো মাটিও এখন মূল্যবান সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নিবন্ধিত পাবলিক কবরস্থানগুলোতে সাধারণ কবরের সরকারি ফি ৫০০ টাকা।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন কবরস্থানগুলো ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সাধারণ দাফনের সরকারি নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। তবে কবরের আকার অনুযায়ী খনন, বাঁশ ও চাটাইয়ের খরচ আলাদা। আর দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ বছরের জন্য ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থান ও খরচ
ডিএনসিসির সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস বাংলানিউজকে বলেন, ডিএনসিসির আওতায় বর্তমানে সাতটি নিবন্ধিত পাবলিক কবরস্থান রয়েছে। এগুলো হলো বনানী, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী, রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন, উত্তরা ৪, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টর এবং চামুরখান (দক্ষিণখান) কবরস্থান।
তিনি বলেন, মৃত ব্যক্তির সঠিক তথ্য সংরক্ষণে স্বজনদের নির্ধারিত তথ্য ফরম পূরণ করতে হয়। কারণ শোকের সময়ে মুখে বলা তথ্য ভুল হলে পরবর্তী সময়ে ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন কাজে সমস্যা হতে পারে। সাধারণ কবরের সরকারি ফি ৫০০ টাকা পরিশোধের পর সিটি করপোরেশনের হলুদ রঙের রশিদ দেওয়া হয়। এর বাইরে কবর খনন, বাঁশ ও চাটাইয়ের জন্য নির্ধারিত টেন্ডারভিত্তিক খরচ রয়েছে।
বনানী কবরস্থান
ঢাকার অন্যতম পরিচিত বনানী কবরস্থানের প্রায় ১৯ হাজার কবর রয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ ব্লকে ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত বিক্রি বা সংরক্ষিত কবর রয়েছে প্রায় ৯ হাজার।
বনানী কবরস্থানের মোহরার মো. হারুন অর রশিদ বাংলানিউজকে বলেন, ২০০৭ সালের আগে বিভিন্ন সময়ে বিক্রি করা কবরগুলোর মালিকানা সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। এসব জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং দলিল করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এসব কবরে দাফনের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন শুধু পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে।
অন্যদিকে, ‘ডি’ ব্লকে রয়েছে সাধারণ কবরের এলাকা। এখানে সাধারণ কবরের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। সাধারণ কবরের সরকারি ফি ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে বাঁশ, চাটাই, কবর খনন এবং শ্রমিকদের কাজ অনুযায়ী আরও কিছু খরচ যুক্ত হয়।
দাফনের জন্য মৃত ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেট ও এনআইডির ফটোকপি প্রয়োজন হয় জানিয়ে বনানী কবরস্থানের এই মোহরার বলেন, দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
সাধারণ কবরের মেয়াদ দুই বছর। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে সেখানে নতুন করে দাফন করা যায় না। কবরের তথ্য কম্পিউটারভিত্তিক ডিজিটাল এন্ট্রি ও ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হয়। এই ডাটাবেজ আইসিডিডিআরবির সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে।
তবে বনানীর সংরক্ষিত কবরের নিয়ম আলাদা। যার নামে কবর বরাদ্দ রয়েছে, প্রথমে তাকে দাফন করতে হয়। এরপর তার স্বামী বা স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন ও ছেলে-মেয়েদের দাফনের সুযোগ রয়েছে। এরপর নাতি-নাতনি, জামাতা বা পুত্রবধূকে দাফন করতে বিশেষ প্রশাসনিক অনুমোদন প্রয়োজন হয়। অনুমোদনের পর ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে স্বজনদের লিখিত দিতে হয়, যাতে পরে ওয়ারিশদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি না হয়।
সংরক্ষিত কবরে পুনরায় দাফনের জন্য প্রতিবার ৫০ হাজার ৫০০ টাকা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ব্যাংকে জমা দিতে হয়। সাধারণ কবরকে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ করতে চাইলে খরচ আরও বেশি। বনানীতে ১৫ বছরের জন্য সাধারণ সারির কবর সংরক্ষণে ৩ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য সাড়ে ৪ কোটি টাকা লাগে। এ ধরনের আবেদন মাসে দুই-তিনটি আসে বলে জানান বনানী কবরস্থানের মোহরার হারুন অর রশিদ।
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান: ৫০০ টাকা থেকে ৯০ লাখ
ঢাকার অন্যতম বড় কবরস্থান মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান। ৬৩ দশমিক ৫৪০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এ কবরস্থানে ১৯৮৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৯১৭টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
এখানে স্থায়ী সংরক্ষিত কবর রয়েছে ৫ হাজার ৭৬০টি এবং মেয়াদি সংরক্ষিত কবর ২৫০টি। কবরস্থানটি সাধারণ এলাকা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এলাকা, মেয়াদি সংরক্ষিত এলাকা এবং পূর্বে অনুমোদিত স্থায়ী এলাকায় ভাগ করা আছে।
সাধারণ দাফনের সরকারি রেজিস্ট্রেশন ফি ৫০০ টাকা। এর বাইরে অনুমোদিত বাঁশ, চাটাই ও কবর খননের জন্য নির্ধারিত ফি ১ হাজার ৪৫৬ টাকা। দুস্থ, অসহায় ও বিত্তহীনদের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ মোহরার (কবরস্থানের দায়িত্বে থাকা) চাইলে প্রতীকী ১০০ টাকা ফি নিতে পারেন।
দাফনের জন্য মৃত ব্যক্তির এনআইডি ও মেডিকেল সার্টিফিকেট নিয়ে নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হয়। সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দাফন করা যায় এবং প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তিন ঘণ্টার মধ্যে দাফন সম্পন্ন করা যায়।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, মিরপুরে ১৫ বছরের মেয়াদি কবরের ফি ২০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা। তবে সাধারণ এলাকার একটি কবর দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে খরচ তিনগুণ হতে পারে। অর্থাৎ ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকার পরিবর্তে দিতে হতে পারে ৯০ লাখ টাকা।
সাধারণ এলাকায় যাতে ঢালাওভাবে কবর কিনে পাকা করে ফেলা না যায় এবং সাধারণ মানুষের দাফনের জায়গা সংকট তৈরি না হয়, সেজন্যই এই বাড়তি ফি রাখা হয়েছে। এখানে কবরের সর্বোচ্চ মাপ ৮ ফুট বাই ৪ ফুট। দুটি কবরের মধ্যে এক ফুট ফাঁকা রাখা বাধ্যতামূলক। সংরক্ষিত কবরের ওপর ছাদবিহীন সর্বোচ্চ তিন ফুট উঁচু পাকা বাঁধাই করা যায়; তবে মাজার নির্মাণ নিষিদ্ধ।
রায়েরবাজার বধ্যভূমি কবরস্থান দাফনের জন্য বিস্তৃত
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থান ঢাকার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দাফনস্থল। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ উদ্বোধনের পর থেকে এখানে ২৭ হাজারের বেশি মানুষকে দাফন করা হয়েছে।
প্রধান গোর খোদক ও ম্যানেজার লিয়াকত আলী সরকার বাংলানিউজকে জানান, বড় কোনো দুর্যোগ বা বিপর্যয়ে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মরদেহ দাফনের প্রয়োজন হলে এখানে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ৮৫ হাজার কবর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
তিনি বলেন, দাফনের আগে মৃত ব্যক্তির এনআইডির ফটোকপি, স্বজনের এনআইডির ফটোকপি এবং হাসপাতালে মৃত্যু হলে হাসপাতালের মৃত্যুসনদের ফটোকপি দিতে হয়। এখানে সরকারি দাফন ফি ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে বাঁশসহ কবরস্থানের নির্ধারিত চার্জ ১ হাজার ৩৫০ টাকা। কবর খননের জন্য স্বতন্ত্র সরকারি ফি নেই; গোর খোদকদের স্বেচ্ছায় যে অর্থ দেওয়া হয়, সাধারণত ২ থেকে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
লিয়াকত আলী সরকার বলেন, প্রাথমিকভাবে একটি সাধারণ কবরের মেয়াদ দুই বছর। এরপর একই জায়গায় নতুন মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। তবে কবর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সংরক্ষিত থাকলে অনেক সময় দুই বছরের পরও কবরটি কয়েক বছর টিকে থাকে।
তিনি আরও জানান, রায়েরবাজারে দীর্ঘমেয়াদি কবর সংরক্ষণের সুযোগও রয়েছে। ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ১৫ লাখ টাকা ফি দিতে হয়। এজন্য ডিএনসিসির গুলশান-২ কার্যালয়ে আবেদন করতে হয়। অনুমোদনের পর নির্ধারিত টাকা জমা দিতে হয়।
কবরস্থানটির ভেতরে রয়েছে একটি লেক, তিনটি ব্রিজ ও একটি পাঞ্জেগানা মসজিদ। জানাজা ও গোসলের ব্যবস্থাও রয়েছে। সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কার্যক্রম চলে। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে সাতটি মরদেহ দাফন করা হয়। নিরাপত্তায় রয়েছেন ১৮ জন আনসার সদস্য।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিনা মূল্যে সংরক্ষণ
সাধারণ কবরের মেয়াদ দুই বছর হলেও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। ডিএনসিসির কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা মূল্যে ১০ বছর কবর সংরক্ষণ করা হয়।
বনানী ও মিরপুরেও সাধারণ এলাকায় দাফন করা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ১০ বছর বিনামূল্যে কবর সংরক্ষণের সুবিধা রয়েছে। রায়েরবাজারে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আজীবন সংরক্ষণের সুবিধা রয়েছে বলে জানান ডিএনসিসির এই কর্মকর্তা।
ডিএনসিসিতে ২০০৭ সালের পর বন্ধ কবর বিক্রি
ডিএনসিসির কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, ২০০৭ সালের পর থেকে নতুন করে কবর বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ। ডিএনসিসির কবরস্থানগুলোতে সাধারণ নিয়মে অগ্রিম কবর সংরক্ষণেরও সুযোগ নেই। বিশেষ ক্ষেত্রে জায়গার প্রাপ্যতা বিবেচনায় মেয়র অনুমতি দিতে পারেন।
ডিএনসিসির এই কর্মকর্তা জানান, আগে কেনা স্থায়ী কবরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ওয়ারিশ যেমন পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান ও সহোদরদের পুনরায় দাফনের সুযোগ রয়েছে। বনানীতে এর জন্য ৫০ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য কবরস্থানে ৩০ হাজার ৫০০ টাকা ফি দিতে হয়। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের দুই বছরের মধ্যে পুনরায় দাফন করা যায় না।
ডিএসসিসিতে ২৫ বছরের কবর সংরক্ষণে ২০ লাখ
ডিএসসিসির আওতাধীন কবরস্থানগুলোতে সাধারণ দাফনের সরকারি নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। তবে কবরের আকার অনুযায়ী খনন, বাঁশ ও চাটাইয়ের খরচ আলাদা। আর দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ বছরের জন্য নির্ধারিত ফির মধ্যে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
পাঁচ কবরস্থানে প্রতিদিনের দাফন
ডিএসসিসির আওতায় মুসলিমদের দাফনের জন্য তালিকাভুক্ত কবরস্থান রয়েছে পাঁচটি—আজিমপুর, জুরাইন, ধলপুর ব্রাহ্মণচিরণ, মুরাদপুর ও খিলগাঁও। এসব কবরস্থানে দাফনের পাশাপাশি মৃতের গোসল, জানাজা ও সনদসংক্রান্ত সেবাও দেওয়া হয়।
ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান বাংলানিউজকে জানান, আজিমপুর পুরোনো কবরস্থানের আয়তন ৩৫ একর। সেখানে প্রায় ২৫ হাজার কবর রয়েছে, যার মধ্যে ২ হাজার ৬০০টি সংরক্ষিত। নতুন আজিমপুর কবরস্থান ২ দশমিক ৫০ একর জায়গায়, যেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০টি কবর রয়েছে এবং সবগুলোই সংরক্ষিত।
জুরাইন কবরস্থানের আয়তন ১৭ দশমিক ২৬ একর। এখানে প্রায় ১২ হাজার কবর রয়েছে, যার মধ্যে ২ হাজার ৭০০টি সংরক্ষিত। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তিনটি লাইনে প্রায় ২০০টি কবর সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া মুরাদপুরে ৪৮ শতাংশ ও ধলপুরে ৪৯ শতাংশ জায়গা রয়েছে।
খিলগাঁও কবরস্থানের আয়তন প্রায় পাঁচ একর। সেখানে প্রায় চার হাজার কবর রয়েছে, যার মধ্যে ১৯টি সংরক্ষিত।
কবরস্থানগুলো ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রণাধীন কবরস্থান পরিচালনা নীতিমালা-২০২০’ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রণাধীন কবরস্থান পরিচালনা প্রবিধানমালা-২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা করপোরেশন সভার অনুমোদনের পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
সাধারণ দাফনে খরচ ৯৫৫ থেকে ১,৫৮০ টাকা
জুরাইন, ধলপুর ও মুরাদপুর কবরস্থানের মোহরার মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, বর্তমানে দাফনের নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। কবর খনন, বাঁশ ও চাটাইসহ সব মিলিয়ে বড়দের দাফনে খরচ ১ হাজার ৫৮০ টাকা, মাঝারি কবরের ক্ষেত্রে ১ হাজার ২১০ টাকা এবং শিশুর জন্য ৯৫৫ টাকা।
মোহরার মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, ডিএসসিসির নির্ধারিত মাপ অনুযায়ী বড়দের কবর ৮ ফুট বাই ৪ ফুট, মাঝারি ৫ ফুট বাই ৩ ফুট এবং শিশুর কবর ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি বাই ২ ফুট। তবে জায়গার সংকটের কারণে সবসময় নির্ধারিত মাপ বজায় রাখা সম্ভব হয় না।
আমিনুল ইসলাম জানান, সাধারণ কবর মূলত এক বছর পর্যন্ত থাকে। এরপর একই জায়গায় নতুন কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তবে সাধারণ এলাকায় দাফনের পর নীতিমালা অনুযায়ী ১০, ১৫, ২০ ও সর্বোচ্চ ২৫ বছরের জন্য লিজের আবেদন করা যায়।
আজিমপুরে ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ ২০ লাখ
আজিমপুর কবরস্থানে রয়েছে পুরোনো ও নতুন দুটি অংশ। এই কবরস্থানের মোহরার মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, নতুন অংশের সব কবর স্থায়ী। পুরোনো অংশে স্থায়ী কবরের পাশাপাশি লিজভিত্তিক কবরও রয়েছে।
আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার বলেন, ১০ বছরের জন্য কবর লিজের ফি ৫ লাখ, ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ, ২০ বছরের জন্য ১৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ২০ লাখ টাকা। এসব টাকা এককালীন সিটি করপোরেশনে জমা দিতে হয়। তবে নতুন করে কাউকে স্থায়ী কবর দেওয়ার সুযোগ নেই।
আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার বলেন, বিদ্যমান স্থায়ী কবরে নীতিমালা অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির ছেলে, মেয়ে, স্বামী, স্ত্রী, ভাই ও বোনকে পুনঃকবর দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে পুনঃকবর ফি ৫০ হাজার টাকা।
রবিউল ইসলাম বলেন, আজিমপুরে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি মরদেহ আসে। প্রতিবছর দাফনের সংখ্যা বাড়লেও কবরস্থানের আয়তন বাড়ছে না। ফলে জায়গার সংকটে সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রস্থ সবসময় বজায় রাখা সম্ভব হয় না।
জুরাইন-ধলপুর-মুরাদপুরে নিরাপত্তা ও জনবল সংকট
জুরাইন, ধলপুর ও মুরাদপুর কবরস্থানে সাধারণ দাফনের জন্য ৫০০ টাকা নিবন্ধন ফি দিতে হয়। নির্ধারিত ইজারাদারের মাধ্যমে কবর খনন, বাঁশ ও চাটাইয়ের টাকা আদায় করা হয়।
এই কবরস্থানগুলোর দায়িত্বে থাকা মোহরার আমিনুল ইসলাম জানান, জুরাইন কবরস্থানে ইমাম ও মুয়াজ্জেমের পদ শূন্য রয়েছে। ইমাম না থাকায় বর্তমানে তিনিই নিয়মিত নামাজ ও জানাজা পড়াচ্ছেন। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীরও সংকট রয়েছে। কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা বাড়ালে কবরস্থানের নিরাপত্তা আরও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
খিলগাঁও কবরস্থান
ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ একর আয়তনের খিলগাঁও কবরস্থানে প্রায় চার হাজার কবর রয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি সংরক্ষিত। এখানেও ডিএসসিসির একই কবরস্থান ব্যবস্থাপনা নীতিমালা কার্যকর রয়েছে এবং সাধারণ দাফনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ৫০০ টাকা নিবন্ধন ফি ও সংশ্লিষ্ট খরচ প্রযোজ্য।
দাফনের আগে প্রয়োজনীয় কাগজ
ডিএসসিসির কবরস্থানে এখনো অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট কবরস্থানে গিয়ে হাতে লিখে আবেদন করতে হয়। মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য, নাম, জন্মতারিখ, লিঙ্গ, মৃত্যুর তারিখ ও স্থান, দাফনের তারিখ, বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা, মৃত্যুর কারণ, জাতীয়তা ও পেশাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়। আবেদনকারীর নাম ও মোবাইল নম্বরও নথিভুক্ত করা হয়।
নির্ধারিত ফি পরিশোধের পর মৃতদেহ গোসল, জানাজা, কবর খনন ও দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। সাধারণত সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দাফন করা হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এর পরও দাফন করা যায়।
বেওয়ারিশ লাশের দাফনেও ব্যবস্থা
দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের ক্ষেত্রে সাধারণ কবরের জন্য নির্ধারিত ফি ও অনুমোদিত ঠিকাদারের বিল প্রযোজ্য। তবে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের প্রকৃত খরচ ডিএসসিসি বহন করে।
ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান জানান, জুরাইন কবরস্থানে বেওয়ারিশ মরদেহের জন্য নির্ধারিত জায়গা রয়েছে। পুরোনো সাধারণ এলাকার ১১ নম্বর সড়কের উত্তর-পূর্ব ব্লকে ২০টি লাইনের প্রতিটিতে ২৫টি করে মোট ৫০০টি কবর রয়েছে। সেখানে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বা অন্য স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দাফন করা হয়। নির্ধারিত সংখ্যক বেওয়ারিশ মরদেহের এক-তৃতীয়াংশ প্রকৃত দাফন ব্যয় ডিএসসিসি বহন করে।
কবরের মেয়াদ শেষ হলে কী হয়
ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান জানান, সংরক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত কবর ছাড়া অন্যান্য কবর সাধারণ কবর হিসেবে বিবেচিত হয়। মেয়াদি সংরক্ষিত কবরের মেয়াদ শেষ হলে স্বজনরা সেটি নবায়ন বা সময় বৃদ্ধি না করলে কবরটি সাধারণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সেখানে পরবর্তী সময়ে অন্য কাউকে দাফন করা যাবে।
ডিএসসিসির এই কর্মকর্তা বলেন, পুরোনো কবরের তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আজিমপুর কবরস্থানের কয়েক বছরের তথ্য ডিজিটালভাবেও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
জায়গার সংকট দুই সিটিতেই
ঢাকা শহরে সরকারি ও বেসরকারি/ট্রাস্ট পরিচালিত মিলিয়ে প্রায় ২০টিরও বেশি প্রধান কবরস্থান রয়েছে। এর মধ্যে ডিএনসিসির ৭টি ও ডিএসসিসির ৫টি। দুই সিটি করপোরেশনের কবরস্থান ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, দাফনের সংখ্যা বাড়লেও জমির পরিমাণ বাড়ছে না।
ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান বাংলানিউজকে জানান, ডিএসসিসির কবরস্থানের মোট জায়গা প্রায় ৫৯ একর। বিপরীতে ডিএনসিসির কবরস্থানের জায়গা প্রায় ১৯২ একর। দুই সিটির জনসংখ্যা প্রায় সমান হলেও দক্ষিণে কবরস্থানের জায়গা তুলনামূলকভাবে কম। এ কারণে নতুন কবরস্থান করার একটি প্রস্তাব করপোরেশন সভায় অনুমোদিত হয়েছে এবং বর্তমানে জমি নির্বাচনের কাজ চলছে।
অন্যদিকে ডিএনসিসির কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস বাংলানিউজকে জানান, ঢাকার জমি সীমিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি কবর সংরক্ষণের ফি বেশি রাখা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের দাফনের জায়গার সংকট আরও তীব্র না হয়।
সব মিলিয়ে রাজধানীতে মৃত্যুর পর শেষ ঠিকানার জন্যও জায়গা এখন আর সহজলভ্য নয়। সাধারণ দাফনে কয়েকশ থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে খরচ হলেও সেই কবর ধরে রাখার সময় যত বাড়ে, খরচও তত বাড়তে থাকে। কোথাও লাখ টাকা, কোথাও কোটি টাকা; কবরের জায়গার এই মূল্যই যেন বলে দিচ্ছে, জীবিত মানুষের বসবাসের মতো মৃত মানুষের শেষ ঠিকানার জন্যও ঢাকা শহরে জায়গা কতটা দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে।