জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই বাসভাড়া বাড়ানোর আলোচনা সামনে আসে। কিন্তু বাসের ভাড়া নির্ধারণে শুধু জ্বালানি তেলের দামই বিবেচনায় থাকে না। একটি বাস সড়কে নামানো থেকে শুরু করে প্রতিদিন চলাচল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্মীদের বেতন—সব মিলিয়ে রয়েছে অন্তত ১৭ ধরনের ব্যয়ের চাপ। এসব ব্যয় বাড়লে তার প্রভাবও পড়ে বাস পরিচালনার মোট খরচে। আর সেই বাড়তি খরচের একটি অংশ সমন্বয় করা হয় যাত্রীভাড়ার মাধ্যমে।
বাস মালিকদের হিসাবে, জ্বালানি তেলের দাম ছাড়াও বাসভাড়া বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি। দেশের অধিকাংশ বাসের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ডলারের দাম বাড়ায় এসব যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে বাসের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে।
এর সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকদের মজুরি। চালক, চালকের সহকারী, হেলপারসহ পরিবহন খাতের কর্মীদের বেতন-মজুরি বাড়লে বাস পরিচালনার দৈনিক ও মাসিক ব্যয়ও বাড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মীদের খাবার, থাকার ব্যবস্থা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার খরচও মালিককে বহন করতে হয়।
বাস কেনার জন্য নেওয়া ব্যাংক ঋণের সুদও শেষ পর্যন্ত পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। নতুন বাস কিনতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হওয়ায় অনেক মালিক ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করেন। ঋণের সুদহার বাড়লে মাসিক কিস্তির পাশাপাশি সুদের খরচও বাড়ে। সেই অর্থও বাসের আয় থেকেই পরিশোধ করতে হয়।
বাসের যন্ত্রাংশের দাম বাড়াও একটি বড় কারণ। ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স, ক্লাচ, ব্রেক, টায়ার, ব্যাটারি, লুব্রিকেন্টসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নিয়মিত পরিবর্তন বা মেরামত করতে হয়। এসব পণ্যের অনেকগুলোই আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ও আন্তর্জাতিক বাজারদরের প্রভাব পড়ে।
বাসের টায়ার ও ব্যাটারির দাম বৃদ্ধিও আলাদা করে ব্যয় বাড়ায়। ভারী যান হিসেবে বাসের টায়ার দ্রুত ক্ষয় হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর তা পরিবর্তন করতে হয়। একইভাবে ব্যাটারি, ইঞ্জিন অয়েল ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের খরচও নিয়মিত বহন করতে হয়।
বাসের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত ব্যয়ও বাড়ছে। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় সড়কে চলাচল করায় বাসের ইঞ্জিন, ব্রেক, সাসপেনশন ও অন্যান্য যান্ত্রিক অংশে চাপ পড়ে। ফলে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি হঠাৎ নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশ মেরামতের ব্যয়ও রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে বাসের ফিটনেস, নিবন্ধন, রুট পারমিট ও বিভিন্ন সরকারি ফি। এসব ফি ও চার্জ বাড়লে তা বাস পরিচালনার সামগ্রিক ব্যয়ে যোগ হয়। একইভাবে বিমা, কর ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও মালিকদের বহন করতে হয়।
বাস রাখার জায়গা বা ডিপোর খরচও রয়েছে। নিজস্ব জায়গা না থাকলে বাস মালিককে পার্কিং বা গ্যারেজ ভাড়া দিতে হয়। শহরাঞ্চলে জমির মূল্য ও ভাড়া বেশি হওয়ায় এ খাতেও উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়।
বাস পরিচালনায় শ্রমিকের পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যয়ও থাকে। টিকিট বিক্রি, হিসাবরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও অফিস পরিচালনার জন্য কর্মী রাখতে হয়। এসব খরচও শেষ পর্যন্ত বাস পরিচালনার মোট ব্যয়ের অংশ। সড়কে চলাচলের সময় টোল ও বিভিন্ন ধরনের সড়ক ব্যবহারের খরচ রয়েছে।
দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সেতু ও মহাসড়কের টোল দিতে হয়। রুট ও চলাচলের পরিমাণ অনুযায়ী এই ব্যয়ও মোট পরিচালন খরচে যুক্ত হয়।
বাসের দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও মালিকের ব্যয়ের একটি অংশ। দুর্ঘটনায় বাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামত ব্যয় ছাড়াও কয়েক দিন বাস চলাচল বন্ধ থাকায় আয় হারানোর বিষয় থাকে। ফলে একটি বাসের আয়-ব্যয়ের হিসাব করতে গিয়ে এসব ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হয়।
এ ছাড়া যানজটের কারণে একই দূরত্ব অতিক্রম করতে বেশি সময় লাগায় জ্বালানি ও শ্রম—দুই ধরনের ব্যয়ই বাড়ে। একটি বাস নির্দিষ্ট সময়ে যত বেশি ট্রিপ দিতে পারে, আয়ও তত বাড়ে। যানজটে পড়ে ট্রিপের সংখ্যা কমে গেলে একই বাস ও শ্রমিক দিয়ে কম আয় হয়। রাস্তার অবস্থা খারাপ হলেও বাসের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ে। ভাঙাচোরা সড়কে চলাচলের কারণে টায়ার, সাসপেনশন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে মেরামত ও যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের প্রয়োজনও বাড়ে।
বাসের নতুন বডি তৈরি বা পুরোনো বাস সংস্কারের ব্যয়ও রয়েছে। একটি বাস দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর তার বডি, আসন, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ অংশ সংস্কার করতে হয়। বাজারে লোহা, স্টিল, রং ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়লে এই ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর খরচও বাস মালিকদের পরিচালন ব্যয়ের অংশ। ওয়ার্কশপ, ডিপো, কার্যালয় ও রক্ষণাবেক্ষণকেন্দ্র পরিচালনায় বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবা নিতে হয়। এসবের মূল্য বৃদ্ধি সামগ্রিক ব্যয় বাড়ায়।
সব মিলিয়ে বাসভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের দাম সবচেয়ে দৃশ্যমান উপাদান হলেও এর বাইরে রয়েছে আরও বহু ব্যয়ের চাপ। ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, যন্ত্রাংশ, শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ, টায়ার-ব্যাটারি, সরকারি ফি, টোল, পার্কিং, বিমা, প্রশাসনিক ব্যয়সহ অন্তত ১৭টি খাত বাস পরিচালনার মোট ব্যয়কে প্রভাবিত করে।
তবে এসব ব্যয় বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাত্রীভাড়া বাড়বে—এমন নয়। ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আয়-ব্যয়ের হিসাব, যাত্রীর ওপর বাড়তি চাপ এবং পরিবহন মালিকদের পরিচালন ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হয়। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বাসভাড়া সমন্বয়ের আলোচনায় এবার এসব ব্যয়ের হিসাবও সামনে আসছে।