‘আচ্ছা, বাইকে যেভাবে জিপিএস ট্র্যাকার লাগায়, এইভাবে কি বাচ্চাদের শরীরেও লাগানো যাবে? হাতঘড়িতে বা অন্য কোনোভাবে! আমার সিরিয়াসলি ভয় ঢুকে গেছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের একটি গ্রুপে ঢুকতেই চোখে পড়ল পোস্টটি। পোস্ট করেছেন ইকবাল আহমেদ নামের এক ব্যক্তি। নিজের সন্তানকে নিয়ে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা জানিয়ে সমাধানের পথ খুঁজেছেন এই বাবা।
ইকবাল আহমেদ একা নন, তাঁর পোস্টে একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন অর্ধশতাধিক অভিভাবক। কেউ নিজের শিশুসন্তান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। কেউ পরামর্শ চেয়েছেন, কেউবা দিয়েছেন।
আমি চাই, নিরাপত্তা থাকুক। সরকার যেন সেটা নিশ্চিত করে। মা–বাবা খেয়াল রাখবে, মা–বাবা দায়িত্ব নেবে, এটা বললে তো হবে না।
অনেকের ভাষ্য, শিশুকে স্মার্ট ওয়াচ পরালে বিপদ এড়ানো যেতে পারে। আপত্তি জানিয়ে একজনের কমেন্ট, এই স্মার্ট ওয়াচ নেওয়ার জন্যই হামলা করবে।
পোস্টটির আলোচনায় অনেক অভিভাবক শিশুর স্কুলের পোশাক ও ব্যাগে পৃথক ট্র্যাকার লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, শিশুর জুতায় ট্র্যাকার লাগানো যেতে পারে। তাহলে শিশুটি কোথায় যাচ্ছে, কোথায় অবস্থান করছে, সেসব জানা যাবে।
কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর অভিভাবকেরা যে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, তা এই পোস্ট থেকে বোঝা গেল।
মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করলে ইকবাল প্রথম আলোকে বললেন, তাঁর বাড়ি সিলেটের জগন্নাথপুরে। তাঁর একটি দোকান আছে। একমাত্র সন্তানের বয়স সাড়ে চার বছর। বাড়িতে তাঁর মা আর স্ত্রী মিলে শিশুটির দেখাশোনা করেন।
অপ্রতিম গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হয়েছিল। পরিবার জানায়, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোনটি নিয়ে বের হয়েছিল অপ্রতিম। পরে আর বাসায় ফেরেনি। পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
দেশে একের পর এক শিশু নিখোঁজ, কারও কারও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে বিচলিত ছিলেন ইকবাল। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সর্বশেষ নিখোঁজের পর অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর উদ্বেগ আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। নিজের সন্তানের কথা ভেবে তিনি এখন আতঙ্ক বোধ করছেন।
ইকবাল আরও বলেন, ‘আমি চাই নিরাপত্তা থাকুক। সরকার যেন সেটা নিশ্চিত করে। মা–বাবা খেয়াল রাখবে, মা–বাবা দায়িত্ব নেবে, এটা বললে তো হবে না।’

অপ্রতিম গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হয়েছিল। পরিবার জানায়, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোনটি নিয়ে বের হয়েছিল অপ্রতিম। পরে আর বাসায় ফেরেনি। পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল অপ্রতিম। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার কোটবাড়ি এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকত সে। মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসা করেন।
নানাভাবে শিশুরা হত্যার শিকার হচ্ছে। প্রতিবেশীদের মাধ্যমে, পরিচিত–অপরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে। পরিবার কতখানি নিরাপত্তা দিতে পারে, সে প্রশ্নও আসে। পরিবারের ওপর দায়িত্ব চাপালে কিংবা ঘটনা ঘটার পর পরিবারের ওপর দায় চাপালে চলবে না।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান গতকাল রোববার দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নেওয়া হয়। বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে শিশুটির মাথায় আঘাত করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হলে আইফোনটি নিয়ে সটকে পড়ে আসামিরা।
এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবার করা হত্যা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ। তুহিন ছাড়া অন্য দুজন কিশোর। এই তিনজনের বাইরে আরেক তরুণের সম্পৃক্ততা যাচাই করছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি তুহিনের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আরেকটি বিরোধের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে শিশু নিখোঁজের ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ। নিখোঁজ শিশুরা বেঁচে আছে কি না, সে তথ্য জানা নেই কারও।
‘পরিস্থিতি দেখে অস্থির লাগছে’
ইকবালের পোস্টে এক নারী কমেন্ট করেছেন, ‘আমার ছেলের বয়স ১১ বছর। বিকেলে সাইকেল চালায়। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যায়। সত্যি বলতে, সবাইকে দেখছি অপ্রতিমের মা–বাবাকে দোষারোপ করছে যে উনারা বাচ্চার বন্ধুদের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতেন না। আসলে এই বয়সে সব সময় পেছনে পড়ে থাকা সম্ভব না। আমি আমার ছেলের ফ্রেন্ডদের গার্ডিয়ানের (বন্ধুদের অভিভাবক) সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। বাইরে যাওয়ার আগে নিশ্চিত হই, ওর সঙ্গে আজ কে কে খেলবে।’
ওই নারী আরও লিখেছেন, ‘তারপরও একদিন ওর ওস্তাদ আমাকে জানিয়েছেন, ওরা বন্ধুরা অন্য আরেকটি গ্রুপের সঙ্গে সাইকেলের কম্পিটিশন (প্রতিযোগিতা) করছে। সেই গ্রুপটাকে ওস্তাদজির কাছে সুবিধার মনে হয়নি। এ জন্য আমাকে জানিয়েছেন।’
‘এসব শুনে আর বর্তমান পরিস্থিতি দেখে খুবই অস্থির লাগছে।’ লিখেছেন ওই নারী।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর কেউ কেউ বলছেন, শিশুটি তার চেয়ে বয়সে বড়দের সঙ্গে মিশত। মোটরসাইকেল চালাত। টিকটকে ভিডিও আপলোড করত। ‘কিশোর গ্যাং’–এর সদস্যদের সঙ্গে অপ্রতিমের চলাফেরার অভিযোগ তুলছেন কেউ কেউ। তাঁদের প্রশ্ন, এসব বিষয় অপ্রতিমের মা–বাবা কেন জানতেন না?
এমন নানা অভিযোগ এখন অপ্রতিমের মা–বাবাকে শুনতে হচ্ছে। ফেসবুকের লেখালেখিতে দেখতে হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, নিখোঁজ থাকা বা নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার হওয়া অন্যান্য শিশুদের বেলায় কী বলবেন অভিযোগকারীরা?
এককেন্দ্রিক দায় চাপিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা এড়ানোর সুযোগ নেই। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা আর দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত সাজা নিশ্চিত না করায় শিশুহত্যার ঘটনা বাড়ছে।
নিখোঁজ শিশুদের খতিয়ান
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে দেশে শিশু নিখোঁজের ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ। নিখোঁজ শিশুরা বেঁচে আছে কি না, সে তথ্য জানা নেই কারও।
পুলিশ যে শিশুদের উদ্ধারের কথা জানিয়েছে, তাদের সবাইকে জীবিত নাকি অপ্রতিমের মতো কারও কারও মরদেহ পাওয়া গেছে, সে তথ্য স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের এক শিশু বিদ্যালয়ে যায়। পরে আর বাড়ি ফেরেনি। দুই দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় শিশুটির মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন।
পাবনা সদরে ৯ সেপ্টেম্বর ১০ বছরের এক শিশু নিখোঁজ হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর স্থানীয় একটি ডোবা থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রাজধানীর মিরপুরের শিশু ইব্রাহিম প্রায় চার মাস ধরে নিখোঁজ।
এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুদের কারও কাছেই দামি কোনো জিনিস ছিল না।
কেবল পরিবারকে দায়ী করলে চলবে না
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ফাতেমা রেজিনা ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, নানাভাবে শিশুরা হত্যার শিকার হচ্ছে—প্রতিবেশীদের মাধ্যমে, পরিচিত–অপরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে। পরিবার কতখানি নিরাপত্তা দিতে পারে, সে প্রশ্নও আসে। পরিবারের ওপর দায়িত্ব চাপালে কিংবা ঘটনা ঘটার পর পরিবারের ওপর দায় চাপালে চলবে না।

শিশুকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ দিতে হবে উল্লেখ করে ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, এখন একক আর ছোট পরিবার বেশি। শিশুকে সারাক্ষণ দেখে রাখা ছোট পরিবারের পক্ষে সম্ভব না–ও হতে পারে। কিশোর বয়সীরা খবরদারি মেনেও নেয় না। কীভাবে শিশুর জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা যায়, সেটা নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। শিশুকে শেখাতে হবে, কোন ঘটনা বিপদ ডেকে আনতে পারে।
দেশে রাজনৈতিক বিদ্বেষ, পারিবারিক সংঘাত, পূর্বশত্রুতাসহ বিভিন্ন কারণে রাগ, ক্ষোভ, প্রতিশোধ থেকেও শিশুহত্যার ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এককেন্দ্রিক দায় চাপিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা এড়ানোর সুযোগ নেই। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা আর দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত সাজা নিশ্চিত না করায় শিশুহত্যার ঘটনা বাড়ছে।
এই শিক্ষকের মতে, শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশের প্রস্ততি থাকা দরকার। সেই অপরাধে কিশোরেরা জড়িত থাকলে কী ধরনের ‘পিয়ার প্রেশার বা ইনফ্লুয়েন্স’ (সমবয়সীদের চাপ বা প্রভাব) ছিল, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।