Image description

গত ৯ সেপ্টেম্বর পাবনায় ১০ বছর বয়সী একটি শিশু নিখোঁজ হয়। দিনরাত তার খোঁজ চালান মা-বাবা। পরে বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে শিশুটির স্যান্ডেল জোড়া পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক পাবনা সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। কিন্তু শিশুর কোনো খোঁজ মেলেনি।

সন্ধানের ষষ্ঠ দিনে হতাশায় স্বজন ও প্রতিবেশীরা রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করেন। একই দিনে শিশুর বাবা অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে একটি অপহরণ মামলা করেন।

পরের দিন বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় একটি খণ্ডবিখণ্ড মরদেহ উদ্ধার হয়। পরে পুলিশ নিশ্চিত করে, এই মরদেহ নিখোঁজ হওয়া সেই শিশুর।

ওই দিন বিকেলে পুলিশ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এবং হত্যা ও ধর্ষণে অভিযুক্ত করে আদালতে পাঠায়।

গত শুক্রবার স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা মূল আসামির বাড়িঘর ভাঙচুর করে এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।

শিশু হত্যা ও নিখোঁজের পরিসংখ্যান

পাবনার এই শিশুহত্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়া অন্তত ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া মরদেহের অনেকগুলো মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল এবং কিছু মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আসকের পরিসংখ্যানে দেখা যায় চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে মোট ২৫৪ শিশুহত্যা হয়েছে।

নিহতদের ১১০ জনই ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। ছয় বছরের কম ৭৪ জন। সাত থেকে ১২ বছর বয়সী নিহত শিশুর সংখ্যা ৬০। নিহত ১০ শিশুর বয়স জানা সম্ভব হয়নি।

বিগত বছরগুলোর তথ্যও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর গড়ে অন্তত ৪১০ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে।

২০২০ সালে শিশু হত্যার ঘটনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সে বছর মোট ৫৮৯ শিশুকে হত্যা করা হয়, যার মধ্যে নিখোঁজের পর মরদেহ মিলেছিল ৩৬ জনের। ২০২৫ সালেও পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। ওই বছর ৪১০ শিশু হত্যার ঘটনা রেকর্ড হয় এবং নিখোঁজের পর ৪৮ টি মরদেহ উদ্ধার হয়।

মাদ্রাসায় বাড়ছে যৌন সহিংসতার ঘটনা

গত ১৯ মে রাজধানীর বনশ্রীর আলোকিত কোরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদ্রাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে ১০ বছর বয়সী একটি শিক্ষার্থী।

ময়নাতদন্তে শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া যায়। শিশুর মা একই মাদ্রাসার ১৯ বছর বয়সী ছাত্র শিহাব হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

মামলায় অভিযোগ করা হয় শিহাব ও মাদ্রাসার সাথে যুক্ত অন্য ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ছেলেটিকে যৌন নির্যাতন করে আসছিলেন। সহ্য করতে না পেরে শিশুটি আত্মহত্যা করে।

গত ফেব্রুয়ারিতে সাভারে আরেকটি ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। সেখানে সাত বছর বয়সী একটি শিশুকে মারকাজুল উলুম আশ-শারিয়্যাহ মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন তাঁর বাবা। ভর্তির মাত্র ২২ দিনের মাথায় এক জ্যেষ্ঠ সহপাঠী শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করে। বিষয়টি জেনে ফেলার পর অন্য আরেক ছাত্র ঘটনা ফাঁসের ভয় দেখিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। ওই মাদ্রাসার আরও চারজন ছাত্র ধারাবাহিকভাবে শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতন চালায়। শেষমেশ শিক্ষকের কাছে সাহায্য চাইতে গিয়েছিল শিশুটি। সেই শিক্ষকও তাকে ধর্ষণ করেন। ঘটনার ৬ মাস পর এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শিশু অধিকার বিষয়ক সংগঠন ‘শিশুরাই সব’ ষান্মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে সারাদেশে ৩৩৬ শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে।

অনেক ঘটনার অভিযুক্তরা মাদ্রাসার শিক্ষক বা শিক্ষার্থী।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম সোহাগ জানান শিশুরা সহজ লক্ষ্যবস্তু হওয়ার কারণেই তাদের ওপর বেশি সহিংসতা হয়।

রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘শিশুদের সহজেই প্রলুব্ধ করা যায়। পরিবারকে জিম্মি করার উদ্দেশ্যেও তাদের ব্যবহার করা হয়। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যও অনেক সময় শিশুদের নিশানা বানানো হয়।’

তিনি জানান, সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক কারণ রয়েছে।

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের সংগঠন ‘সাইকক বাংলাদেশ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সায়মা আক্তার জানান, সমাজে মানুষের সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সায়মা আক্তার বলেন, ‘ভয়াবহ দৃশ্য বারবার দেখলে মানুষের অনুভূতির তীব্রতা কমতে থাকে। বর্তমান বাস্তবতায় মানুষের কাছে কষ্ট ও যন্ত্রণা একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারপাশের নেতিবাচক খবর শুনতে শুনতে মানুষের মন আগের মতো আর নাড়া দেয় না।’

শিশুদের ওপর সহিংসতার পেছনে কোন ধরনের মনস্তত্ত্ব কাজ করে জানতে চাইলে সায়মা আক্তার বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে মানুষ শিশুদের ওপর নির্যাতন চালায়। অনেকের মনে জন্মগত অপরাধ প্রবণতা থাকে। কিছু মানুষ সামাজিক নিয়ম মানতে চায় না এবং তারা কাউকে পরোয়া করে না তা প্রমাণ করতেই এই ধরনের অপরাধ করে। প্রতিবাদ করার ক্ষমতা না থাকায় শিশুরা সহজেই অপরাধের শিকার হয়।’

সায়মা আক্তার আরও বলেন, ‘সামাজিক বাস্তবতা থেকেও অনেকে সহিংসতা শেখে। অপরাধ করে সহজে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলে অপরাধীরা এই কাজগুলোকে সহজ ভাবতে শুরু করে।’