চোরাচালান ঠেকাতে সিলেটের বিভিন্ন সড়ক ও রেলপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশিতে ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ করেছেন পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীরা। সম্প্রতি চোরাচালানবিরোধী পদক্ষেপ জোরদার করেছে সিলেট প্রশাসন। কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করেছেন, তল্লাশির সময় তাদের বারবার জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশির মুখে পড়তে হয়েছে যা হয়রানিমূলক ও বিব্রতকর।
জাফলং ভ্রমণে যাওয়া সাইফুল ইসলাম জানান, সোমবার সিলেটে ফেরার পথে জৈন্তাপুরের কাটাগাং এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ তাদের বাস থামিয়ে মালামাল তল্লাশি করে। এ সময় তার কাছে থাকা একটি কম্বলের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তিনি বলেন, স্থানীয় একটি দোকান থেকে কেনা দুই হাজার ১০০ টাকা দামের কম্বল নিয়ে পুলিশ তাকে প্রশ্ন করে। পরে অন্য যাত্রীরা হস্তক্ষেপ করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন নবদম্পতি মিনহাজুল আবেদিন ও রোজিনা বেগম। তারা শ্রীমঙ্গল থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন।
তারা জানান, রাত প্রায় ৩টার দিকে দুই রেল পুলিশ সদস্য তাদের সিটের ওপর রাখা লাগেজ নামিয়ে তল্লাশি করেন। রোজিনা বেগম অভিযোগ করেন, এক পুলিশ সদস্য অন্য যাত্রীদের সামনে তার ব্যাগ থেকে ব্যক্তিগত পোশাক বের করে দেখেন। তিনি প্রতিবাদ ও চিৎকার শুরু করলে তল্লাশিতে কিছু না পাওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা চলে যান।
সিলেট-জাফলং, সিলেট-কম্পানীগঞ্জ ও ঢাকা-সিলেট সড়কপথসহ সিলেট-ঢাকা রেলপথে চলাচলকারী পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ উঠেছে।
সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় সিলেটে থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে চোরাচালানের পণ্য পরিবহন ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তল্লাশি কার্যক্রম বাড়িয়েছে।
তবে পর্যটকদের অভিযোগ, জনপ্রিয় পর্যটন এলাকায় যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষও এসব অভিযানের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিশেষ করে যারা ভ্রমণের সময় স্থানীয় বাজার থেকে বিভিন্ন পণ্য কিনে নিয়ে ফেরেন তাদের প্রতিটি পণ্যের উৎসের হিসাব দিতে হচ্ছে।
পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারী পর্যটকদের অভিযোগ, হাইওয়ে পুলিশ, থানা পুলিশ, পর্যটন পুলিশ ও রেল পুলিশ তাদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং ব্যাগ, যানবাহন ও অন্যান্য মালামাল তল্লাশি করছে।
তারা বলেন, নিরাপত্তার প্রয়োজনে তল্লাশি করা যেতে পারে। তবে চোরাচালান প্রতিরোধের নামে সাধারণ যাত্রীদের বারবার তল্লাশি করা হলে তা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এতে নারী, শিশু ও পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীরা বেশি সমস্যায় পড়েন।
জাফলং, তামাবিল, বিছানাকান্দি, লোভাছড়া ও রাতারগুলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসেন। এসব পর্যটন এলাকার কয়েকটি সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে নিয়মিত চোরাচালানবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চোরাচালানকারীদের অন্যতম ব্যবহৃত পথ হিসেবে পরিচিত। একই সড়ক দিয়ে জাফলং, লালাখালসহ জৈন্তাপুরের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যান পর্যটকরা।
ফলে চোরাচালানে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত পথেই পর্যটকদের চলাচল করতে হয় এবং তাদেরও তল্লাশির মুখে পড়তে হয়।
পর্যটকরা প্রশ্ন তুলেছেন, পর্যটন এলাকা থেকে প্রকাশ্যে কেনা পণ্যের জন্য কেন তাদের তল্লাশি করা হবে। তাদের অভিযোগ, জাফলং, সদাপাথর ও বিছানাকান্দিসহ বিভিন্ন স্থানে ভারতীয় প্রসাধনী, কম্বল, জিরাসহ নানা পণ্য প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্য বিক্রি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা তো নেওয়া হচ্ছেই না বরং যারা এসব পণ্য কিনে ফিরছেন তাদের পথে তল্লাশির মুখে পড়তে হচ্ছেছে।
সাইফুল ইসলাম বলেন, সীমান্তবর্তী পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তামূলক অভিযান প্রয়োজন। তবে এমনভাবে অভিযান পরিচালনা করা উচিত নয়, যাতে পর্যটকরা অপমানিত বোধ করেন।
‘চোরাচালান, মাদক ও অন্য অপরাধ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান প্রয়োজন। তবে তল্লাশির সময় পর্যটকদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়’, যোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে সিলেট আঞ্চলিক হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার দীপক জ্যোতি খিশা বলেন, ‘তল্লাশির সময় পর্যটকদের হয়রানি করা উচিত নয়। আমাদের কোনো সদস্য পর্যটকদের হয়রানি করলে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পর্যটকদের হয়রানির অভিযোগ নাকচ করেছেন সিলেট রেলওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার জান্নাত আফরোজ। তিনি বলেন, ‘পর্যটকরা সব সময় নির্দোষ নন। তারা সিলেটে এসে জিরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রসাধনীসহ নানা পণ্য কেনেন। এতে সরকার রাজস্ব হারায়।’
তিনি জানান, সন্দেহজনক যাত্রীদের তল্লাশি করার নির্দেশনা রয়েছে রেল পুলিশের। তবে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারী যাত্রীদের এমন তল্লাশি না করার বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) মাসুদ রানা বলেন, বিষয়টি মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা করা হবে। স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়া ভারতীয় পণ্যগুলো ব্যবসায়ীরা বৈধভাবে দেশে এনেছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।