Image description

বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে তাদের আগ্রহের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশ সফরে এসে তিস্তা ব্যারাজ এলাকা পরিদর্শনও করে গেছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং একাধিক কূটনৈতিক সূত্র আমার দেশকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যৌথ সমীক্ষা চালাতে বাংলাদেশ ও চীনের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঠিক সেই সময়ে প্রকল্পটিতে যুক্ত হতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ করে তিস্তা প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপেরই অংশ। তিস্তা প্রকল্পকে সামনে রেখে এখানে চীন-যুক্তরাষ্ট্র ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি সামনে আসতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া ঢাকার জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। এই তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ২০২৪ সালেও ঠিক এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। চীনা অর্থায়নের বিষয়টি যখন প্রায় চূড়ান্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয় ভারত। এতে থেমে যায় তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ।

 

তিস্তা প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্ত হওয়ার আগ্রহের বিষয়ে জানতে চেয়ে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করার পরও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মার্কিন বিশেষজ্ঞ দলের তিস্তা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন বিষয়ে অবগত কূটনৈতিক সূত্র আমার দেশকে জানিয়েছে, মার্কিন বিশেষজ্ঞ দলের তিস্তা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন মার্কিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ওয়াশিংটন প্রকল্পটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই মনে হয়। বিশেষজ্ঞ দলের নেতৃত্বে ছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ড. ক্যালভিন ক্রিচ। তিনি মার্কিন ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সিনিয়র পানি বিশেষজ্ঞ এবং নদী প্রকৌশলের বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞও। আন্তর্জাতিক পানি পরিবহন পরিকাঠামো সংস্থার (পিআইএএনসি) সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

 

সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদী ভূ-আকৃতিবিদ্যা, পলি পরিবহন মডেলিং, ড্রেজিং এবং নৌ চলাচল বিষয়ে প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে এই মার্কিন বিশেষজ্ঞের। তিনি ঐতিহাসিক ইউএসএসিই ল্যাটিন আমেরিকা (ল্যাটাম) উদ্যোগের সিনিয়র কারিগরি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্রাজিল, পেরু, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর ও পানামাসহ বিভিন্ন দেশে পানি সম্পদ ও নদীপথ প্রকল্প পরিচালনা করেছেন।

 

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মার্কিন এই সামরিক বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ দলের তিস্তা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন নিশ্চিতভাবেই বহুল আলোচিত এই প্রকল্পে ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রা যোগ করছে। এছাড়া এই বিশেষজ্ঞ দলের পরিদর্শনের বিষয়ে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এর আগে গত ৩০ আগস্ট মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন আনুষ্ঠানিকভাবে তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শন করেন। এ সময় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার স্ত্রী ডায়ান ডাউ এবং মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শনের সময়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসক এবং রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি তিস্তার পানি প্রবাহ সম্পর্কে জানতে তিস্তা ব্যারাজের কন্ট্রোল রুম পরিদর্শনের পাশাপাশি তিস্তার মূল সেতুটি হেঁটে পার হন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শনের খবরটি ফলাও করে প্রচার করা হয় এবং বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে বেশ কৌতূহল তৈরি হয়। এর পরপরই কঠোর গোপনীয়তায় তিস্তা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে গেলেন মার্কিন বিশেষজ্ঞরা।

 

তিস্তা প্রকল্পে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হঠাৎ আগ্রহ এবং এই প্রকল্পে তারা ঠিক কীভাবে যুক্ত হতে চায়, সে ব্যাপারে জানতে চাইলে পানিসম্পদ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমার দেশকে বলেন, তিস্তা প্রকল্পের অবশ্যই একটি ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন এবং কীভাব এই প্রকল্পে যুক্ত হতে চায় তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের আগ্রহের কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বিস্তারিত তেমন কিছু বলা হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে তারা ইকোলজিক্যাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট অর্থাৎ তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশের ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে তা যাচাইয়ের কাজ করতে চায় তারা।

কর্মকর্তারা জানান, গত ৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশ সফরে এসে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনও করে গেছেন। আগামীতে যখন বিস্তারিত আলোচনা হবে, তখন হয়তো বিস্তারিত জানা যাবে যে, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আসল ভাবনা কী। এখন তারা আসতে চাচ্ছে এবং আমরাও তাতে সাড়া দিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ যাকে আসলে ‘না’ বলা আমাদের মতো দেশের পক্ষে রীতিমতো অসম্ভব।

 

এখানে ভারতের কোনো ভূমিকা আছে কিনা জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তারা বলেন, দেখুন, এখানে চায়না ফ্যাক্টর তো কাজ করছে। ২০১৬ সাল থেকে চীনের সঙ্গে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। এই মুহূর্তে চীন বেশ তৎপর। ২০২০ সালে প্রকল্প থেকে চীনকে সরাতেই ভারত এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। এই মুহূর্তে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এক অস্থির সময় পার করছে। তিস্তা প্রকল্পে চীনের যুক্ত হওয়া বা অর্থায়ন নিয়ে সরাসরি বিরোধিতা করার অবস্থায় নেই ভারত। এই পরিস্থিতিতে যদি যুক্তরাষ্ট্র তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হয়, তাহলে ভারতের অখুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই, বরং তারা হয়তো খুশিই হবে। তবে এটা সত্য যে, ভারত এই অঞ্চলে কোনো ধরনের মার্কিন তৎপরতা বা উপস্থিতি ভালো চোখে দেখে না।

 

এদিকে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিএনপি সরকার আবার সবকিছু নতুন করে শুরু করতে চাইছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানিয়েছেন, তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য নতুন সমীক্ষা চালানো হবে। এজন্য পানি গবেষণা ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) এবং সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) বিশেষজ্ঞ, পাউবোর বর্তমান ও সাবেক বিশেষজ্ঞ, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের কাজ চূড়ান্ত হয়েছে।

 

কর্মকর্তারা জানান, এই বিশেষজ্ঞ কমিটিতে অন্তত তিনজন চীনা বিশেষজ্ঞ রাখারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। চীনা বিশেষজ্ঞদের নাম চেয়ে গত ২ সেপ্টেম্বর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চীন সরকারকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়। একটি কূটনৈতিক সূত্র আমার দেশকে জানিয়েছে, চীন সরকার বিশেষজ্ঞদের নামের তালিকা না পাঠিয়ে জানতে চেয়েছে, এখানে চীনা বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা ঠিক কী হবে, তারা কি বাংলাদেশে সরেজমিনে কাজ করবে, নাকি বেইজিংয়ে বসে নানা ধরনের পরামর্শ দেবে। চীন তাদের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার আগে সার্বিক বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাইছে।

 

তবে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চাইছে সরকার। তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত একজন সিনিয়র কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে বলেন, তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে গত ১০ বছরে অনেক ঘটনা ঘটেছে। সব কিছুকে বাদ দিয়ে সরকার নতুন করে শুরু করতে চাইছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল নিয়ন্ত্রণ সরকার নিজের হাতেই রাখতে চাইছে। সরকার চায় না, তিস্তা ইস্যুতে পরাশক্তিগুলো প্রকাশ্যে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ুক।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এখানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই সহযোগিতা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

 

সমীক্ষার কাজে চীনা বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। এছাড়া চীনের কাছ থেকে ঋণ সহায়তাও পাওয়া যাবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যেতে পারে। তিস্তার উজানে ভারত ঠিক কী করছে, সে ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতির মাধ্যমে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে সরকার। এছাড়া তিস্তা ইস্যুতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণকেও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

 

তিস্তা প্রকল্পে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ এবং বাংলাদেশের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর আমার দেশকে বলেন, তিস্তা প্রকল্পে আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ। তারা চীনকে মোকাবিলা করতে চায়। তিস্তা প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ মানেই তারা এখানে চীনের বাইরের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। এক সময় এই প্রকল্পে ভারতও আগ্রহ দেখিয়েছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ দেখাচ্ছে, এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

 

তিনি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বাংলাদেশকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। তিস্তা একটি মেগা প্রজেক্ট। এখানে দুই দেশকেই যুক্ত করা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। চীনের কাছ থেকে তো আমরা কারিগরি এবং ঋণ সহায়তা দুটোই পেতে পারি। যুক্তরাষ্ট্র ঋণ সহায়তা দেয় না। তারা কারিগরি সহায়তা দিতে পারে। এতে আমরা যদি বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে এই প্রকল্পের জন্য ঋণ নিতে চাই, সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করতে পারে। তবে সরকারকে সব সময় মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ যেন ভূরাজনীতির খেলার মাঠে পরিণত না হয়। আমাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

 

এদিকে তিস্তা প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শহীদুজ্জামান। তিনি আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে বলেন, তিস্তা প্রকল্পে যদি যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত হয়, তাহলে এখানে ভারত আর নাক গলানোর সুযোগ পাবে না। আমাদের জন্য এটা ইতিবাচক। দুই পরাশক্তি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এটাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

 

এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে এই বিশ্লেষক বলেন, আমি তা মনে করি না। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া আছে। যুক্তরাষ্ট্র জানে, এই অঞ্চলে চীনকে বাদ দিয়ে তারা কিছু করতে পারবে না। আমাদের উচিত হবে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী করতে চাইছে তা খোলামেলাভাবে চীনের সঙ্গে আলোচনা করা। এক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের চীনের পরামর্শও নিতে হবে। কারণ চীন আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগী।

উল্লেখ্য, তিস্তা প্রকল্পটি ‘তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ নামে পরিচিত। এই প্রকল্পের ভাবনা শুরু হয় ২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাওয়ার কনস্ট্রাকশন অব চায়নার (পাওয়ার চায়না) সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার মাধ্যমে। এরপর শুরু হয় তিস্তা প্রকল্পের সমীক্ষার কাজ। ২০১৯ সালে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পাউবোর অধীনে চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন সমীক্ষার কাজ শেষ করে। চীনা বিশেষজ্ঞরা সরেজমিনে প্রকল্পের কারিগরি দিকসহ যাবতীয় বিষয় বিশ্লেষণ করে।

 

সমীক্ষার মাধ্যমে প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। প্রথমত, নদী খনন, যার মধ্যে জমে থাকা লাখ লাখ ঘনমিটার পলি পরিষ্কার করার জন্য নদীর তলদেশের ১০০ কিলোমিটারের (কিমি) বেশি অংশ খনন করা। দ্বিতীয়ত, নদীর তীরবর্তী প্রায় ১৭১ বর্গকিমি হারানো জমি আধুনিক কৃষি ও শিল্পাঞ্চলের জন্য খননকৃত মাটি ব্যবহার করে ভূমি পুনরুদ্ধার করা। তৃতীয়ত, আকস্মিক বন্যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে রক্ষা করতে ১০০ কিমিও বেশি নতুন ও মেরামতকৃত বাঁধ, সুবিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক এবং কয়েক ডজন জেটি সুবিধার নকশা প্রণয়ন।

 

২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার চীনের কারিগরি ও ঋণ সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় তখন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কাছে চিঠি দিয়ে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের কাছে ৯৮৩.২৭ মিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা চাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। ওই চিঠিতে প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় নদী খনন, জলাধার নির্মাণ এবং নদীর তীরে জনবসতি গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।

 

২০২২ সালে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চালানো সমীক্ষার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ করে চীন সরকার। প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রকল্প সহায়তার ঘোষণাও দেয় চীন সরকার। তবে তখন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি সই হয়নি। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক চুক্তি সইয়ের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত চীন সফরের সময়ে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চুক্তি সই হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই ঘোষণার পরপরই ২০২৪ সালের ৮ মে ঢাকায় উড়ে আসেন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা। তিনি হাসিনার সঙ্গে দেখা করে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং ঘোষণা দেন তিস্তা প্রকল্পে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে ভারত। নানা অজুহাতে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এড়িয়ে গেলেও তখন হঠাৎ করে তিস্তা প্রকল্পে ভারতের বিনিয়োগ প্রস্তাবটি ছিল মূলত চীনের সম্পৃক্ততা ঠেকানোর একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।

 

হাসিনা ২০২৪ সালের ৯ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এরপর ওই বছরের ২১-২২ জুন ভারতে রাষ্ট্রীয় সফর করেন হাসিনা। দিল্লি সফরের মাত্র দুই সপ্তাহ পর ৮-১০ জুলাই বেইজিং সফর করেন তিনি। ওই সফরে তিস্তার ইস্যুটি এড়িয়ে যায় বাংলাদেশ। ফলে খালি হাতে ফিরতে হয় হাসিনাকে। ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে হাসিনা ঘোষণা করেনÑ তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন প্রস্তুত। কিন্তু আমি চাই, এই প্রকল্প ভারত বাস্তবায়ন করুক। ভারত যদি এই প্রকল্প হাতে নেয়, তাহলে সরকার যা যা প্রয়োজন তার সব কিছুই করবে। ওই ঘোষণার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশ থেকে পালিয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেন হাসিনা। পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার চীনের সহায়তায় তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়নের কাজ শুর করতে পারেনি। এখন তিস্তা প্রকল্পে চীনের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ দেখানোর পর এই প্রকল্পের ব্যাপারে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে চাইছে বিএনপি সরকার।