Image description

কঠিন একটি অর্থবছর পার করার পর দেশের পোশাক রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে চলমান জ্বালানি সংকট। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতির কারণে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে–এমন আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা তাদের ক্রয়াদেশের (অর্ডার) একটি অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোতে সরাতে শুরু করেছেন।

খাতসংশ্লিষ্ট ও রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, সমস্যাটি এখন আর কেবল বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা হ্রাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বার বার গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বাংলাদেশি কারখানাগুলো সময়মতো পণ্য পাঠাতে পারবে কি না–তা নিয়েই মূলত মূল উদ্বেগে পড়েছেন বিদেশি ক্রেতারা।

সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ পতন হয়েছিল। তবে তীব্র জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মুখ দেখে খাতটি। তবে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার প্রকৃত প্রভাব আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে রপ্তানির পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম টাইমসকে বলেন, উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটায় ডেলিভারি বিলম্বের আশঙ্কায় অনেক নিটওয়্যার ক্রেতা তাদের আদেশের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) ব্যাঘাত এবং সংকট সমাধানে দুই বছর সময় চেয়ে দুই মন্ত্রীর বক্তব্য ক্রেতাদের আত্মবিশ্বাস নাড়িয়ে দিয়েছে।’

বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) সভাপতি মো. আবদুল হামিদ জানান, বিশ্ববাজারে চাহিদা এমনিতেই মন্দা, তার ওপর জ্বালানি সংকটে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় ক্রেতাদের আস্থা বড় ধাক্কা খেয়েছে। ইউরোপের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমলেও বাংলাদেশ বাজার অংশীদারত্ব হারিয়েছে, যা ক্রেতাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ারই ইঙ্গিত দেয়।

 

তিনি জানান, তার ফরাসি ক্লায়েন্ট কারফুর এবং কোঅপারেটিভ ইউসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে কোঅপারেটিভ ইউ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কেনাকাটা ৩৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বড় ক্রেতারা তাদের কেনাকাটা নির্দিষ্ট হারে কমাচ্ছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্রয়াদেশ বাংলাদেশের এক কারখানা থেকে অন্য কারখানায় যাচ্ছে না, বরং দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে চলে যাচ্ছে।’

উৎপাদন খরচ বেশি হওয়া সত্ত্বেও কেবল সময়মতো পণ্য পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকায় কিছু আদেশ চলে যাচ্ছে চীনে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবিধা নিতে ভারতও বড় বাজার দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও পোশাক খাতে তাদের অবকাঠামো এখনো বাংলাদেশের চেয়ে ছোট।

ইউরোপীয় প্রধান প্রধান ব্র্যান্ডগুলোর ঢাকা কার্যালয়ে কর্মরত দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিশ্ববাজারের মন্দা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে ঝুঁকি কমানোর অংশ হিসেবেই ব্র্যান্ডগুলো কেনাকাটায় বৈচিত্র্য আনছে এবং অর্ডার কমাচ্ছে। তবে সার্বিক অর্ডার পতনের হার একক কিছু কারখানার পরিস্থিতির মতো ততটা ভয়াবহ নাও হতে পারে বলে মত দেন তারা।

 

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পতন বেশি। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক আমদানি কমেছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যার বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের পতনের হার ছিল কম এবং ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া উল্টো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের সংগৃহীত ইউরোস্ট্যাটের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক আমদানি কমেছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে মূল্যের বিচারে সবচেয়ে বড় পতনের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ, যেখানে পতন ঘটেছে ১৬ শতাংশেরও বেশি। মূলত ইউরোপীয় ক্রেতাদের মধ্যেই অর্ডার কমানো ও অন্য দেশে সরানোর প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

উৎপাদন ব্যাঘাত সরবরাহ শৃঙ্খলে আঘাত হানছে

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে প্রাথমিক বস্ত্র বা টেক্সটাইল খাতে। উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি কারখানাগুলো ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কাপড় সরবরাহ করতে পারছে না। গত দুই মাসেরও কম সময়ে সুতার দাম পাউন্ড প্রতি ৫০ সেন্ট বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম চাপে পড়েছেন মিল মালিকরা।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক সহসভাপতি এবং এনজেড টেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সালেউধ জামান খান জানান, তার কারখানায় পর্যাপ্ত অর্ডার থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের চাহিদার মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ কাপড় দিতে পারছেন।

 

তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার না করলে সরবরাহ অর্ধেকের নিচে নেমে যেত। একজন দায়িত্বশীল সরবরাহকারী হিসেবে আমরা খরচ বাড়িয়েও চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছি।’

তিনি আরও জানান, অনিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুতের কারণে ডাইয়িং ইউনিটগুলোতে কাপড়ের মান নষ্ট হচ্ছে এবং অপচয় বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন টন চাহিদার বিপরীতে তারা মাত্র ৪ মিলিয়ন টন সরবরাহ করতে পারছেন। এতে ক্রেতাদের বিকল্প উৎসে যেতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

এইচ অ্যান্ড এম, ইউনিক্লো, জিও জিন্স, মুজি, বাস্তা এবং লেভিসের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো আস্থা হারালে অপরিশোধিত পোশাকের অর্ডারগুলো বড় সংকটে ফেলবে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, ‘পরিস্থিতি উন্নত হলেও হয়তো আমাদের কারখানার ফ্লোরগুলো খালি পেড়ে থাকবে।’

বার্ষিক ৬ মিলিয়ন ডলারের শিশুতোষ নিটওয়্যার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘নিট সিন্ডিকেট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিকেএমইএ পরিচালক মো. আবদুল হান্নান জানান, আগামী গ্রীষ্ম ও বসন্ত মৌসুমের জন্য তার চার ইউরোপীয় ক্রেতা অর্ডার ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, সবচেয়ে বড় অর্ডারের অংশটি এশিয়ার এক প্রতিযোগী দেশে চলে গেছে।

 

তিনি জানান, নিটওয়্যার রপ্তানিকারকদের প্রায় ৫০ শতাংশই এখন নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পেরে ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষিতে হিমশিম খাচ্ছেন। শিপমেন্টে বিলম্ব হলে বাধ্য হয়ে আকাশপথে (এয়ার ফ্রেইট) পণ্য পাঠাতে হয় কিংবা বড় মূল্যছাড় দিতে হয়।

হান্নান বলেন, নর্ডিক অঞ্চলের ক্রেতারা আগে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, কিন্তু এখন তারা চান সুনির্দিষ্ট শিপমেন্টের নিশ্চয়তা—যা বর্তমান পরিস্থিতিতে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিকেএমইএ’র ৫৫০টি সক্রিয় সদস্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেবল ৫০টির মতো বড় প্রতিষ্ঠান নিজেদের আর্থিক সক্ষমতায় টিকে রয়েছে, বাকিরা সক্ষমতার পুরো ব্যবহার করতে পারছে না।

বিকল্প উৎস পরখ করছেন ক্রেতারা

তবে তৈরি পোশাকের সব খাতের চিত্র এক নয়। এনার্জিপ্যাক ফ্যাশনসের চেয়ারম্যান হুমায়ুন রশীদ জানান, ওভেন বা ওভেন পোশাক রপ্তানিকারকরা তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারণ, তারা মূলত আমদানিকৃত কাপড়ের ওপর নির্ভর করেন। এ ছাড়া উচ্চমূল্যের পোশাকের অবস্থাও কিছুটা ভালো।

বিজিএমইএ’র একজন পরিচালক টাইমসকে জানান, এফএসআরইউ বিভ্রাট ও এলএনজি সংকটের পর থেকেই বিদেশি ক্রেতারা প্রতিনিয়ত খোঁজ নিচ্ছেন তারা সময়মতো পণ্য পাবেন কি না। অনেক ক্রেতাই ইতিমধ্যে ভারত, মিশর, ইন্দোনেশিয়া এবং কম্বোডিয়াতে কেনাকাটার কিছু অংশ সরিয়ে নিচ্ছেন।

বিজিবিএ সভাপতি হামিদ বলেন, শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প উৎস পরখ করে দেখছেন। তবে সরকার যেভাবে আশ্বাস দিয়েছে সেভাবে জ্বালানি পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হলে এটি স্থায়ী সমস্যা হবে না।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এমনিতেই এক ধরনের ধীরগতি ছিল। অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে রপ্তানিতে বড় ধস দেখতে পাওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেন তিনি।

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রমুখী ওভেন পোশাক রপ্তানিকারকরা কিছুটা আশার আলো দেখছেন। তাদের মতে, ওভেন খাতের প্রবৃদ্ধি নিটওয়্যার ও ডেনিমের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিতে পারে। মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল একটি শীর্ষ ওভেন পোশাক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসেই দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এবং এক ক্রেতার অর্ডার কমলে অন্য ক্রেতার অর্ডারে তা পূরণ হয়ে যাচ্ছে। তবে পুরো খাত এই সুবিধা পাবে কি না তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।