Image description
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি

কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করছে সরকার। কারও বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে ৬ মাসের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড প্রদান করা হবে। এ সংক্রান্ত অভিযোগ সামনে এলে সরকার একটি তদন্ত কমিটি করবে। ওই কমিটি যে সুপারিশ করবে তা বাস্তবায়নে ৩০ দিন অতিবাহিত হলে গাফলতির অপরাধে আদালতসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অর্থদণ্ড অথবা দুই মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড আরোপ করতে পারবেন।

বিচারে সন্তুষ্ট না হলে সংক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী নারী উচ্চ আদালতে কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করতে পারবেন। কেউ যৌন হয়রানির মিথ্যা অভিযোগ করলে এবং তা তদন্তে প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান করা হবে। সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির বিচার প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে এবং অন্যাদের ক্ষেত্রে ১৯৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির আলোকে পরিচালিত হবে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আইনটির খসড়া প্রস্তুত করতে সংশ্লিষ্টদের মতামত নিচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রওশন আরা বেগম যুগান্তরকে বলেন, আইন হচ্ছে এটা সত্য। আমি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রধান নই। আমি এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। কারণ ব্যাখ্যা করে সচিব বলেন, মন্ত্রণালয়ের এসব বিষয়ে কথা বলবেন মন্ত্রী। মহিলাদের সুরক্ষায় দেশে অনেক আইন থাকা সত্ত্বেও নতুন করে কেন আইনটি প্রণয়নের জন্য গ্রহণ করা হলো এমন প্রশ্নে সচিব বলেন-আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। যা বলার মন্ত্রী বলবেন। মন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে জানা গেছেন, তিনি ঢাকার বাইরে আছেন।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের আইন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে। এমন কি ভারতও ২০১৩ সালে এই আইন প্রণয়ন করেছে। বর্তমান যে আইনটি হচ্ছে তার ড্রাফট খুবই দুর্বল। অনেক অফৌজদারি অপরাধ ফৌজদারি অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শাস্তির ধারাগুলো বিধিমালাতে নিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কবে বিধিমালা হবে? ভারত কিংবা কানাডার আইনটি দেখে নিতে পরামর্শ দেন তিনি।

আইনের খসড়ায় সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সব স্থান কাজের স্থান হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। যেখানে যাতায়াতের জন্য কর্তৃপক্ষ যানবাহনের ব্যবস্থা করেছে। যেখানে কমপক্ষে একজন কর্মচারীর বেতন পরিশোধ করা হয়। ওই কর্মচারী সেখানে বিশ্রাম ও বিরতি দিয়ে খাবার গ্রহণ করেন। কর্মক্ষেত্র বলতে আরও বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যে কোনো যাত্রা, ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ অথবা অনুষ্ঠান অথবা সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়-এমন স্থানকে বোঝাবে। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলতে যোগাযোগ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সাহায্যে যে কোনো যোগাযোগকেও এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া কর্তৃপক্ষের দেওয়া যে কোনো আবাসন কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচিত হবে।

সব ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক, মৌখিক, অমৌখিক, অন্য কোনো জেন্ডার পরিপন্থি আচরণ যৌন হয়রানি হিসাবে বিবেচিত হবে। এ সবের যেটি ব্যক্তির জন্য অনিরাপদ, হুমকিস্বরূপ, অস্বস্তিকর, অপরাধ, বিব্রতকর ও অপমানজনক তা যৌন হয়রানি হিসাবে গণ্য হবে। আইনের খসড়ায় আরও বলা হয়, অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আবেদনমূলক আচরণ সরাসরি কিংবা ইঙ্গিত-যেমন শারীরিক স্পর্শ করার চেষ্টা, প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত ক্ষমতা ব্যবহার করে কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা, যৌন হয়রানি বা নিপীড়নমূলক উক্তি ও যৌন সুযোগ লাভের জন্য অবৈধ আবেদন। এ ছাড়া পর্নোগ্রাফি দেখানো, যৌন আবেদনমূলক মন্তব্য বা ভঙ্গি, অশালীন ভঙ্গি, ভাষা, মন্তব্য, উত্ত্যক্ত করা, ব্যক্তির অলক্ষ্যে তাকে অনুসরণ, যৌন ইঙ্গিতমূলক ভাষা ব্যবহার করে ঠাট্টা-উপহাস করাও এ আইনে অপরাধের আওতায় আসবে। পাশাপাশি চিঠি, টেলিফোন, মোবাইল, এসএমএস, ছবি, নোটিশ, কার্টুন, বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল, নোটিশ বোর্ড, অফিস, ফ্যাক্টরি, শ্রেণিকক্ষ, বাথরুমের দেওয়ালে যৌন ইঙ্গিতমূলক অপমানজনক কিছু লেখা, ব্ল্যাকমেইল বা চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে স্থির চিত্র ধারণ এবং এসবের কারণে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা যৌন হয়রানি হিসাবে গণ্য হবে। প্রেম নিবেদন, প্রত্যাখ্যানে হুমকি বা চাপ প্রদান, ভয় দেখিয়ে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রতারণা করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যৌন আপত্তিকর তথ্য প্রকাশ, আপত্তিকর বার্তা প্রেরণ ও অশালীন মন্তব্য করা। এছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জেন্ডারের পরিচয়ে কটূক্তি করা যৌন হয়রানি হিসাবে গণ্য হবে বলে আইনের খসড়ায় বলা হয়।

অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আইনের খসড়ায় বলা হয়, সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেরসকারি, ব্যক্তিমালিকানাধীন অন্য যে কোনো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি, মাদ্রাসা, মক্তব, একাডেমি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং কেচিং সেন্টার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণ্য হবে। কর্তৃপক্ষ বলতে সরকারি, বেসরকারি স্বায়ত্তশাসিত মালিকানাধীন অন্য কোনো ধরনের কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বলতে এই আইনের আওতায় হয়রানির শিকার ব্যক্তি। আইনের খসড়ায় সুরক্ষা বলতে ভুক্তভোগী, অভিযোগকারী, সাক্ষ্যসহ তাদের শারীরিক নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা, ব্যক্তির মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া।

অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন : আইন অনুমোদনের ৬০ দিনের মধ্যে গঠিত কমিটির কাছে যৌন হয়রানির অভিযোগ দায়ের করা যাবে। তদন্ত কমিটি প্রাথমিক ভাবে অভিযুক্তকে সতর্ক, তিরস্কার বা ভর্ৎসনা, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিতকরণ, ক্ষতিপূরণ আরোপ ও আদায় করে হয়রানির শিকার ব্যক্তিকে প্রদান করবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ের জন্য ছাত্রত্ব স্থগিত, পদোন্নতি বা স্কেলের নিম্ন ধাপে অবনমিতকরণ করতে পারবে। এছাড়া বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরিচ্যুতি, অব্যাহতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করতে পারবে। কমিটি ৩০ দিনের মধ্যে সুপারিশ বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে। ৩০ দিনের মধ্যে কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা আদালতে অভিযোগ দায়ের করবেন। তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার অপরাধে আদালত কর্তৃপক্ষের অর্থদণ্ড অথবা দুই মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করবেন। শাস্তির বিরুদ্ধেও ৩০ দিনের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি আপিল করতে পারবেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হলে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করবেন।

নিম্ন আদালতে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মেট্রোপলিটন ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলা দায়ের করতে পারবেন। মামলা শুনে ম্যাজিস্ট্রেট প্রাথমিক সত্যতা পেলে মামলার কার্যক্রম শুরু করবেন। অসন্তুষ্ট হলে আবেদনটি সরাসরি নাকচ করতে পারবেন। এই অপরাধের ক্ষেত্রে মামলা অআমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য হবে। বিচার কাজ ফৌজদারি কার্যবিধি ১৯৯৮ অনুসারে পরিচালিত হবে। প্রয়োজনে ট্রায়াল ইন-ক্যামেরা পরিচালিত হবে। কোনো ব্যক্তি দোষী হলে তাকে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড আরোপ করা যাবে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে উচ্চতর আদালতে আপিল করতে পারবেন। সংক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তিকে অন্যান্য আইনি প্রতিকার পেতে বাধা দেওয়া যাবে না। এই আইনের অধীনে কোনো প্রশাসনিক ও ফৌজদারি বিচার কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালিত হবে। উভয় ব্যবস্থা গ্রহণে আইনগত কোনো বাধা থাকবে না। অভিযোগের বিষয়বস্তু, অভিযোগকারীর পরিচয়, ঠিকানা, অভিযুক্ত ব্যক্তি, সাক্ষীর পরিচয়, তদন্তের কার্যধারা, অভ্যন্তরীণ কমিটির সুপারিশ, গৃহীত কোনো পদক্ষেপ প্রেস, ইলেকট্রনিক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা যাবে না।