Image description

ঘুষ নেওয়ার বাহারি কায়দা! কেউ নেন প্রকাশ্যে, কেউবা আড়ালে। অফিসেই নেন এক দল, আরেক দল বাইরে। টাকা গুনে নেন, আবার নেন হাতের আন্দাজেও। তবে শিক্ষা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) কর্মকর্তারা যেন সবাইকে ছাপিয়ে— ঘুষ নেন তারা কিস্তিতে!

ফাইল আটকে রেখে ঘুষ নেওয়ার সংস্কৃতি নতুন নয়। কিন্তু সরকার জানার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া নতুন। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মূল কাজ পড়ানো। অথচ সেই কাজ বাদ দিয়ে তারা মরিয়া হয়ে ওঠেন পরিদর্শনের দায়িত্ব পেতে। কারণ, সেখানে ‘কাঁচা টাকা’। প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষকদের নানা অনিয়মের সুযোগ নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করেন পরিদর্শকরা। একজনের সনদে অন্যজন চাকরি করছেন, নিবন্ধন পাল্টে ফেলেছেন, নিজে মানবিকে পড়ে বিজ্ঞান পড়াচ্ছেন— এমন জালিয়াতিও রয়েছে।

এসব ধরতে তক্কে তক্কে থাকেন পরিদর্শকরা। অনিয়ম পেলেই ‘ঘাড় মটকে’ দেন। জালিয়াতির ধরন বুঝে ঠিক হয় ঘুষ এককালীন নেওয়া হবে, নাকি কিস্তিতে। কম জালিয়াতি হলে এক মাসের এমপিওর সমান, বেশি হলে আরও বেশি। অনিয়ম না করলেও কোনো প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক-কর্মচারীর এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ টাকা নেওয়ার নজির রয়েছে নজরানা হিসেবে। দপ্তরটির মূল কাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক, নিয়োগ এবং অার্থিক বিষয়াদি নিরীক্ষা। জাল সনদ ধরাও তাদের কাজ। নিয়োগ ও জাল সনদ ধরার দিকেই পরিদর্শকরা বেশি মনোযোগী। কারণ, এখানে অনিয়ম এবং ঘুষের হার বেশি।

গত ১০ বছরে ডিআইএতে এমন ১২ হাজার ফাইলের সন্ধান মিলেছে, যেখানে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করতেন কর্মকর্তারা— এমন তথ্য পেয়েছে আগামীর সময়। টাকা পেলে ইতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া বা তদন্ত প্রতিবেদন গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। টাকা না দিলে নেমে আসত শাস্তির খড়্গ।

কিস্তিতে ঘুষ আদায় হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছিল নির্বিকার। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক তদবিরে পরিদর্শকরা পদায়ন পেতেন। টাকায়ও মিলত পদায়ন। একই ধারা বহাল থাকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও। পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন ছিল। এমনকি প্রতিবেদন জমা দেওয়ারও নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না।

এই জটিলতা থেকে বের হতে গত মার্চ থেকে পরিদর্শন বন্ধ রেখেছে ডিআইএ। আটকে থাকা প্রতিবেদন জমা দিতে ৪৭ পরিদর্শককে গত ২০ আগস্ট চিঠি দেওয়া হয়েছে।

একাধিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে কিস্তিতে ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এর একটি যশোর সদর উপজেলার মাহিদিয়া সম্মিলনী মহিলা আলিম মাদ্রাসা।

২০১৮ সালে ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে পরিদর্শন করেন তৎকালীন পরিদর্শক ড. এনামুল হক। ৯টির প্রতিবেদন জমা দিলেও মাহিদিয়ার প্রতিবেদন জমা দেননি। সাত বছর পর প্রতিবেদনটি জমা দিতে বলা হলে এনামুল জানিয়েছেন, তিনি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট ফাইলে এর কোনো নথি নেই। এনামুলের ভাষ্য, ‘অধিদপ্তর প্রতিবেদন হারিয়ে ফেললে আমার কী করার আছে?’

প্রতিবেদন অনুসন্ধান করতে গিয়ে মেলে ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য। ছয় শিক্ষক জালিয়াতি করে চাকরি করছেন বলে অভিযোগ। গণিতের প্রভাষক তরিকুল ইসলাম চাকরি করছেন অন্য তরিকুলের সনদ ব্যবহার করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক শারমিন আক্তারের এনটিআরসিএ সনদ শিমুল হোসেনের নামে। সহকারী মৌলবি আমেনা খাতুন চাকরি করছেন আসমা খাতুনের কাগজপত্র ব্যবহার করে। আরও তিন প্রভাষক মুস্তাক আহমেদ, আব্দুল কাইয়ুম ও মাসুম পারভেজ— সমাজকর্মে স্নাতক করে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন যথাক্রমে রসায়ন, পদার্থ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানে। মুস্তাক আহমেদের নিজের কোনো সনদ নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, নিজের সনদ দিয়েই চাকরি নিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ড. এনামুল ওই প্রতিষ্ঠান থেকে এককালীন ২০ লাখ টাকা এবং ছয় অভিযুক্ত শিক্ষকের কাছ থেকে আলাদাভাবে ৩ লাখ টাকা করে নেন। পরে ছয় শিক্ষকের কাছ থেকে কিস্তিতে ঘুষ নেওয়া শুরু করেন। আজও প্রতিবেদনটি জমা হয়নি বলে জানা গেছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে ডিআইএ আরেক পরিদর্শক পাঠায়। তিনিও দায়সারা প্রতিবেদন দেন। প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির আগের প্রতিবেদন গায়েব ছিল। তাই পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিই।’

শুধু মাহিদিয়া নয়, প্রতিবেদন আটকে রেখে কিস্তিতে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান চালিয়েছে আগামীর সময়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের প্রমাণ মিলেছে।

যশোরে একই ট্যুরে ড. এনামুল ২০০ শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে তাদের এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ ঘুষ নিয়েছেন— এমন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। মামলাটি চলমান। পরে তাকে শরীয়তপুরে বদলি করা হলেও কিস্তিতে ঘুষ নেওয়া থামেনি বলে অভিযোগ। অডিটরদের দিয়েও কিস্তিতে টাকা নেওয়া হতো।

ড. এনামুল দুদকে মামলা চলমান থাকার দোহাই দিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করে ওই মাদ্রাসার চার শিক্ষক বলেছেন, বাধ্য হয়েই কিস্তিতে টাকা দিতে হয়েছে। প্রতিবেদন দিয়ে দেওয়ার হুমকি নিয়মিত আসত।

পুরো ডিআইএ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, ‘এই সংস্থার কর্মকর্তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে এক মাসের সমান এমপিওর টাকা নিয়ে আসেন। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা এখানে পদায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে বেশি ভিড় করেন।’

সাড়ে ১২ হাজার প্রতিবেদন ঘিরে ঘুষের আসর: ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত আটকে থাকা প্রতিবেদনের সংখ্যা সাড়ে ১২ হাজার। এসব প্রতিবেদন আটকে রেখে চলত ঘুষের আসর।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ডিআইএর পরিচালক হিসেবে কাজী কাইয়ুম শিশির, সাইফুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও আফলাতুন দায়িত্ব পালন করেন। সাইফুল ইসলাম ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ নিয়ে পেন্ডিং প্রতিবেদন নিষ্পত্তিতে জোর দেন। এতে পরিদর্শকদের একাংশ অসহযোগিতা শুরু করেন।

ডিআইএর সর্বশেষ তথ্য বলছে, জবাবের অভাবে ১ হাজার ৭৯৬টি প্রতিবেদন ত্রিপক্ষীয় অডিট আপত্তিতে আটকে আছে। ক্র্যাশ প্রোগ্রামের পরও ৭১৩টি প্রতিবেদন ৪৭ পরিদর্শকের কাছে আটকে আছে। ২৯৮টি প্রতিবেদন আটকে রেখে শীর্ষে আছেন সাবেক পরিদর্শক হেমায়েত উদ্দিন। তাদের ৯ জন অবসরে গেছেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক এক প্রশ্নের জবাবে আগামীর সময়কে বলেছেন, আগের প্রতিবেদন পেন্ডিং রেখে নতুন করে ট্যুর হবে না। পরিদর্শনে কেউ ঘুষ চেয়েছে— এমন অভিযোগ পেলেই বদলি করা হবে।

পরিদর্শন কম, প্রতিবেদন বেশি: বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন করে পরিদর্শনের চেয়ে আগের প্রতিবেদন জমা দেওয়ায় বেশি মনোযোগী। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ১২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের বিপরীতে প্রতিবেদন জমা হয়েছিল ১ হাজার ৮৮৭টি। পরের অর্থবছরে ২ হাজার ২০৯টি পরিদর্শনের বিপরীতে জমা পড়ে মাত্র ১ হাজার ৩৪৯টি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৩৫৮টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন হলেও প্রতিবেদন জমা হয় ১ হাজার ২৬টি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক লাফে কমে পরিদর্শনে নেমে আসে ৭১২টি।

ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক আফলাতুন বলেছেন, ‘সবাইকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছি— আগের কোনো প্রতিবেদন পেন্ডিং রেখে নতুন কোনো ট্যুর হবে না। এজন্য অনেকের মন খারাপ, এতে আমার কিছু করার নেই। দপ্তরটির ইমেজ উদ্ধারের চেষ্টা করছি।’

মন্ত্রণালয়ের তাগাদাও উপেক্ষিত: পেন্ডিং প্রতিবেদনের সংখ্যা জানতে গত মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ডিআইএকে তাগাদা দিলে সাত মাসেও তথ্য জমা হয়নি। অনিষ্পন্ন প্রতিবেদন ঘিরে দীর্ঘদিনের ঘুষ-বাণিজ্যের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে— এমন অভিযোগে তথ্য আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে সুপার আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা) আশরাফুল আলম বলেছেন, ‘পেন্ডিং প্রতিবেদনের সংখ্যা চেয়ে এখনো পাওয়া যায়নি। কেন জমা দেওয়া হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

পুরনো সিন্ডিকেট, নতুন ফরম্যাট: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ডিআইএতে সময়ে সময়ে নতুন সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এর শীর্ষে ছিলেন পরিদর্শক মকবুলার রহমান। বর্তমানে তিনি নিজেকে এক এমপির আত্মীয় পরিচয় দেন। চাঁদপুরের ফরক্কাবাদ উচ্চবিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে সব শিক্ষকের এক মাসের সমান বেতন ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ দুদকে পড়লেও তদন্ত হয়নি। সম্প্রতি ১০টি মাদ্রাসা পরিদর্শনেও তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মকবুলার রহমানের বক্তব্য, সব অভিযোগ অসত্য।

তালিকায় রয়েছেন গাজী কাওছার, আবু দাউদ ডেভিড, কাওছার হোসেন, ফজিলাতুন্নেসা মিতু, অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব ও ওয়াহেদ। ৩২তম বিসিএসে চাকরি পাওয়া এক নারী পরিদর্শকের বিরুদ্ধেও যাত্রাবাড়ীর একটি কলেজ তদন্তে একপক্ষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন।

সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক ফজিলাতুন্নেসা মিতুর বিরুদ্ধেও গোপালগঞ্জের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও তৎকালীন একজন উপদেষ্টাকে দিয়ে সেই আদেশ বাতিল করানোর অভিযোগ রয়েছে। কাওছার হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হলে তাকে বদলি করা হয়। পরে ফের ডিআইএতে এসে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ। বক্তব্যের জন্য ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। শিক্ষা পরিদর্শক শায়লা শারমিন শুচির বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

পরিচালক-যুগ্ম পরিচালকের ‘ক্যাশিয়ার’ পাঁচজন: ডিআইএর সাবেক পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালকের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে শিক্ষা পরিদর্শক সনজয় চন্দ্র মণ্ডল, আবু দাউদ, রোকনুজ্জামান রাজিব, আজিম কবীর ও সুপারিনটেনডেন্ট আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে। আর্থিক বিষয় দেখভালের পাশাপাশি কোন পরিদর্শককে কোন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হবে, সেই নকশাও তারা করে দেন বলে অভিযোগ।

দীর্ঘদিন ডিআইএতে থাকা আবু সুফিয়ান কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কত টাকা ঘুষ আসবে, সেই হিসাবও বুঝিয়ে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আগের দুই পরিচালক শহিদুল ইসলাম ও সাইফুল ইসলামকে অলিখিতভাবে সুফিয়ান চালাতেন— এমন অভিযোগও রয়েছে। তার সংকেত ছাড়া পরিদর্শন প্রতিবেদন পাস হতো না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে আবু সুফিয়ান বলেছেন, ‘আমি ছোট কর্মকর্তা। পরিচালক কেন আমার ওপর নির্ভরশীল হবেন? আমি আদিষ্ট হয়ে কাজ করি। অধিদপ্তরের কেউ কেউ আমাকে টার্গেট করেছেন।’