Image description

সার কারখানার উৎপাদন বছরের উল্লেখযোগ্য সময় বন্ধ থাকলেও প্লান্ট সংরক্ষণ বা ‘প্রিজারভেশন’ কাজের অজুহাতে বাড়তি গ্যাস বিলের খড়গ নেমে এসেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ওপর। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের শর্ত ভঙ্গ হওয়ায় এবং উচ্চমূল্যে গ্যাস বিল পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটির ঘাড়ে অতিরিক্ত প্রায় ৬১ কোটি টাকার আর্থিক বোঝা চেপেছে। উদ্ভূত এই সংকট কাটাতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২৯ টাকা ২৫ পয়সার পরিবর্তে আগের মতো ১৬ টাকায় নামিয়ে আনার জোর প্রস্তাব দিয়েছে বিসিআইসি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, গ্যাসের দাম ও সরবরাহ নিয়ে বিসিআইসির চারটি ইউরিয়া সার কারখানাকে কেন্দ্র করে এই জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কারখানাগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়ার কথা থাকলেও, গ্যাসের সংকটের কারণে বছরের বেশির ভাগ সময়ই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। তবে কারখানা বন্ধ থাকলেও যন্ত্রপাতির সুরক্ষার জন্য নিয়মিত কিছু গ্যাস ব্যবহার করে প্লান্ট সচল রাখতে হয়।

এ কারণে বন্ধ থাকা অবস্থায় প্লান্ট সংরক্ষণে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ২৯ টাকা ২৫ পয়সার বদলে আগের মতো ১৬ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে বিসিআইসি। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে সংস্থাটি।

বিসিআইসি জানিয়েছে, ইউরিয়া সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকায় পেট্রোবাংলা বিভিন্ন সময়ে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয় কিংবা পুরোপুরি বন্ধ রাখে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানাগুলো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় রাখা যায় না।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, গ্যাসের মূল্য কমাতে আমরা দাবি জানিয়েছি। আশা করি সরকার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রিজারভেশনের গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করবে।

বিসিআইসি জানিয়েছে, সার উৎপাদনের সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও অন্যান্য উপাদান কারখানার যন্ত্রপাতিতে ক্ষয় সৃষ্টি করতে পারে। তাই উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়ও নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে প্লান্ট সংরক্ষণ করতে হয়। এই সংরক্ষণ কার্যক্রমে প্রয়োজন হয় গ্যাসের। ফলে উৎপাদন না থাকলেও কারখানাগুলোর গ্যাস ব্যবহার অব্যাহত থাকে এবং সেই গ্যাসের বিলও পরিশোধ করতে হয়।

বিসিআইসি আরো জানিয়েছে, চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানা থেকে বছরে ন্যূনতম ১৮ লাখ টন সার উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে বছরে ৩৩০ দিন ৭০ শতাংশ লোডে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সাত কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং গ্যাসের মিশ্রিত মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়।

পেট্রোবাংলা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২৮ টাকা ৭৮ পয়সা প্রস্তাব করলেও বিইআরসির মূল্যায়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মিশ্রিত গড় ক্রয়মূল্য ২১ টাকা ১৫ পয়সা নির্ধারিত হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সার কারখানার জন্য গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ২৯ টাকা ২৫ পয়সা ধার্য করা হয় এবং ৩৩০ দিন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিসিআইসির মূল অভিযোগ হলো, দাম বাড়ানোর এই শর্ত বাস্তবে পূরণ হয়নি।জানা গেছে, মূল্যবৃদ্ধির আগে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে বিসিআইসি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিল। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, প্রতিদিন ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট বা এমএমসিএফডি গ্যাস নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করা হলে এবং বছরে ৩৩০ দিনের হিসাব ধরে গ্যাসের দাম যৌক্তিকভাবে বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু সরবরাহ এর চেয়ে কম হলে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ১৬ টাকা রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

বিসিআইসির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে চারটি সার কারখানা প্লান্ট প্রিজারভেশনের কাজে মোট প্রায় ৪ কোটি ৬৬ লাখ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছে। বর্তমান নির্ধারিত ২৯ টাকা ২৫ পয়সা দরে এই গ্যাসের মূল্য প্রায় ১৩৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। একই পরিমাণ গ্যাস আগের ১৬ টাকা দরে হিসাব করলে মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু প্লান্ট সংরক্ষণের গ্যাসেই দুই দরের ব্যবধানে প্রায় ৬২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, কারখানাভেদে উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়ও ছিল দীর্ঘ। বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার কারখানা গত অর্থবছরে ৩২ দিন বন্ধ ছিল। শাহজালাল সার কারখানা বন্ধ ছিল ৪৪ দিন। যমুনা সার কারখানা ১৬৪ দিন এবং চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কারখানা ১৭৩ দিন বন্ধ ছিল। ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পরিচালন ব্যয় এবং প্লান্ট সংরক্ষণের খরচ অব্যাহত ছিল।

বিসিআইসির জানিয়েছে, ২০২২ সালে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের শর্তে সার কারখানার গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও প্রত্যাশিত মাত্রায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে আবারও দাম বাড়ানো হয়।