বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনে (জিপি) শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে ছয় মাসের সংলাপ শুরু করেছে নরওয়ে সরকারের প্রতিষ্ঠিত ও অর্থায়নে পরিচালিত স্বাধীন সংস্থা ন্যাশনাল কন্টাক্ট পয়েন্ট ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্ট (এনসিপি)। এই সংলাপে অংশ নেবে টেলিনর এএসএ এবং গ্রামীণফোনের সাবেক ২১ কর্মী ও ইউনিয়ন নেতা।
এনসিপির আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক মূল্যায়ন নথিতে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে একটি ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের চেষ্টা করা কর্মীদের বরখাস্ত, জোরপূর্বক চাকরিচ্যুত করা এবং দীর্ঘায়িত আইনি প্রক্রিয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত।
এনসিপি বলেছে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) নির্দেশিকার আওতায় অভিযোগগুলো আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তবে টেলিনর কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করেছে কি না, সে বিষয়ে তারা এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি বলেও স্পষ্ট করেছে সংস্থাটি।
নরওয়ের কোম্পানিগুলোর দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ তদারককারী সংস্থাটি দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা পরিচালনা করবে। সংলাপ ব্যর্থ হলে পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে এনসিপি।
ইউনিয়নের জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১২ সালের ২৩ জুলাই গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (জিপিইইউ) নিবন্ধনের আবেদন করার কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামীণফোন দুই শতাধিক কর্মীকে চাকরিচ্যুত করে।
অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরিচ্যুত ব্যক্তিদের মধ্যে ইউনিয়নের সভাপতি, সহসভাপতি ও যোগাযোগ সম্পাদকসহ কয়েকজন নেতা ছিলেন। এসব চাকরিচ্যুতি বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার লঙ্ঘন করেছে।
সাবেক কর্মীদের অভিযোগ, ইউনিয়নের সমর্থকদের সরিয়ে দিতে গ্রামীণফোন একটি পুনর্গঠন কর্মসূচি ব্যবহার করেছিল। পাশাপাশি এমন একটি মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করেছিল, যার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন জ্যেষ্ঠ কর্মী ও ইউনিয়নের কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তিরা।
তাদের আরও অভিযোগ, চাকরিচ্যুত কর্মীদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে প্যাকেজ সুবিধা মেনে নিতে চাপ দিয়েছিল কোম্পানিটি। যারা ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তাদের চাকরিচ্যুতি এবং সুযোগ-সুবিধা ও অভিজ্ঞতার সনদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হয়েছিল।
অভিযোগকারীরা আরও বলেছেন, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তারা যথাযথ প্রতিকার পাননি। ২০১২ সালে শ্রম আদালতে মামলাগুলো করা হয়। ২০২৩ সালে আপিল বিভাগ মামলাগুলো বিচারযোগ্য বলে ঘোষণা করলেও সেগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি এখনো।
টেলিনর গ্রামীণফোনের ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক। টেলিনরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি, একটি বহুজাতিক অভিভাবক কোম্পানি হিসেবে যথাযথ যাচাই-বাছাই করতে এবং শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো সুরাহা করতে টেলিনর ব্যর্থ হয়েছে।
ইউনিয়ন-সংশ্লিষ্ট চাকরিচ্যুতি, দীর্ঘ আদালত প্রক্রিয়া এবং প্রতিকার পাওয়ার সুযোগসংক্রান্ত অভিযোগগুলো আরও পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করেছে এনসিপি।
সংস্থাটি বলেছে, সংগঠনের স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং প্রতিকার থেকে কথিতভাবে বঞ্চিত করার বিষয়গুলো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণসংক্রান্ত ওইসিডির নির্দেশিকার আওতায় প্রাসঙ্গিক।
তবে শ্রমিকদের মুনাফায় অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ)–সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে এনসিপি। সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ বিষয়ের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রাথমিক মূল্যায়নে সংস্থাটি বলেছে, ‘এই নির্দিষ্ট ঘটনায় কোম্পানিটি নির্দেশিকার সুপারিশগুলো অনুসরণ করেছে কি না, সে বিষয়ে এনসিপি কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।’
অভিযোগ অস্বীকার টেলিনরের
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে টেলিনর। অভিযোগটি নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম চালানো উচিত নয় বলেও মত দিয়েছে কোম্পানিটি।
টেলিনর বলেছে, শিল্প খাতের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে নেওয়া ব্যবসায়িক রূপান্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০১২ সালে কর্মীদের চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এর সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রমের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
কোম্পানিটি বলেছে, কর্মীদের চাকরিচ্যুত করার আগে ইউনিয়ন নিবন্ধনের আবেদন সম্পর্কে গ্রামীণফোন আনুষ্ঠানিক কোনো নোটিশ পায়নি। লিখিত মূল্যায়ন ও সাক্ষাৎকার নিয়েই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মীদের বাছাই করা হয়েছিল।
আদালতের কার্যক্রম ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করার অভিযোগও অস্বীকার করেছে টেলিনর। কোম্পানিটি বলেছে, বিষয়টি এরই মধ্যে বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন। তাই এনসিপির প্রক্রিয়া শুরু হলে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
টেলিনর বলেছে, কর্মীদের চাকরিসংক্রান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে তারা যুক্ত ছিল না। গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদের আলোচনার মাধ্যমে তারা এ প্রক্রিয়ার বিষয়ে জানতে পেরেছিল।
গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন এবং ইউএনআই গ্লোবাল ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেছে টেলিনর। কোম্পানিটি বলেছে, শ্রমসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তারা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
কর্মীদের স্বাগত ইউনিয়নের, জিপি বলছে অনিয়ম প্রমাণিত হয়নি
গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের যোগাযোগ সম্পাদক আদিবা জেরিন চৌধুরী এনসিপির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, দেশের ভেতরে প্রতিকার পাওয়ার সব পথই শ্রমিকেরা অনুসরণ করেছেন।
আদিবা জেরিন চৌধুরী টাইমসকে বলেন, ‘বছরের পর বছর আমরা গ্রামীণফোনে একটি কথিত প্রবণতা দেখেছি। সেখানে শ্রম আইন লঙ্ঘন করা হয়, কর্মীদের চাপ দেওয়া হয় অথবা চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং বিরোধগুলো দীর্ঘসূত্রতায় ভরা বিচারব্যবস্থার ভেতরে ঠেলে দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে বিরোধের সমাধান করতে না পেরে কর্মীরা ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) শরণাপন্ন হন।
গ্রামীণফোন বলেছে, এনসিপির সিদ্ধান্তকে কোম্পানিটির কোনো অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
তাদের মতে, ‘এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি করা। কোনো ভুল বা অনিয়ম হয়েছে—এটি প্রতিষ্ঠা করা নয়।’
গ্রামীণফোন বলেছে, কর্মীদের চাকরিচ্যুতি–সংক্রান্ত মামলাগুলো এখনো বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন। এনসিপি ডব্লিউপিপিএফ–সংক্রান্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে বলেও উল্লেখ করেছে কোম্পানিটি।