বর্ষা এলেই যেন বদলে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা ধর্মনগর কালীবাড়ী পদ্মবিল। বিস্তীর্ণ জলরাশিজুড়ে ফুটে থাকা অসংখ্য পদ্মফুলে রঙিন হয়ে ওঠে চারপাশ। পদ্মের সুবাস, বিলের জল আর নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা। ছোট ডিঙি নৌকায় বিলের মাঝখানে গিয়ে পদ্মের রাজ্যে হারিয়ে যাচ্ছেন তারা।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত হলেও প্রতি বছর পদ্মফুল ফোটার মৌসুমে এই বিলকে ঘিরে বাড়ে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও নেই পর্যাপ্ত পর্যটনসুবিধা। বিশেষ করে শৌচাগার ও পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা না থাকায় বিড়ম্বনায় পড়ছেন অনেকে। পাশাপাশি নির্বিচারে পদ্মফুল ছিঁড়ে নেওয়ায় সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রশাসনও বলছে, পদ্মবিলের সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
যেভাবে যাবেন পদ্মবিলে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরে এই পদ্মবিল। আখাউড়া-কসবা সড়ক ধরে মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দিয়ে টনকি কর্মমঠ এলাকায় যেতে হয়। সেখান থেকে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করলেই ধর্মনগর কালীবাড়ী পদ্মবিলে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেবেন তারা।
বিস্তীর্ণ জলরাশিজুড়ে ফুটে থাকা অসংখ্য পদ্মফুলে রঙিন হয়ে ওঠে চারপাশ
ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা এই বিশাল বিলটি আখাউড়া ও কসবা উপজেলার মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে এটি ধর্মনগর কালীবাড়ী পদ্মবিল নামে পরিচিত। আবার বিলের অপর প্রান্তটি কসবা উপজেলার গোসাইস্থল পদ্মবিল নামেও পরিচিত।
বিলের পশ্চিম পাড়ে বাংলাদেশের আখাউড়া-কসবা এবং পূর্ব প্রান্তে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মাধবপুর থানা। যাওয়ার পথ আঁকাবাঁকা হওয়ায় ছোট যানবাহনে যাওয়া সুবিধাজনক। বিশেষ করে আখাউড়া কিংবা কসবা উপজেলা থেকে সিএনজি অটোরিকশায় সহজেই যাওয়া যায়।
শ্রাবণে বদলে যায় বিলের রূপ
প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে প্রতিবছর বর্ষাকালে এই বিলে পদ্মফুল ফুটতে শুরু করে। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসে বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে পদ্মের রঙে অপরূপ হয়ে ওঠে চারপাশ। পদ্মের সুবাস আর নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে তখন এখানে ভিড় করেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
প্রতি বছর আষাঢ় মাস থেকে পদ্মফুল ফোটা শুরু হয় এবং কার্তিক মাস পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস বিলটি পদ্মফুলে রঙিন থাকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার অন্যতম উপকরণ পদ্ম হওয়ায় পূজার আগের সময়ে এখানে পদ্মের চাহিদাও থাকে বেশি। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মবিলটির মোট আয়তন প্রায় ১২০ একর।
পদ্মের সৌন্দর্যে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা
ঢাকা থেকে আখাউড়ায় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে এসে পদ্মবিল দেখতে যান পর্যটক জোনায়েদ হোসেন। তিনি বলেন, “আমার নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। পরে স্বজনদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, এখানে একটি পদ্মবিল আছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে পদ্মবিলটি দেখার জন্য বের হয়ে আসি। তবে পদ্মবিলের পাড়ে এসে পদ্মের সুবাস পেয়ে আমি অনেকটাই মুগ্ধ।”
তিনি বলেন, “আসলে এখানে না আসলে প্রকৃতি যে তার নিজস্ব রূপে ডানা মেলেছে, তা মিস করতাম। আমাদের প্রকৃতি যে কত সুন্দর, তা মনের ভাষায় প্রকাশ করলে হয়তো শেষ হবে না। আমি চাই, আমাদের সৌন্দর্যমণ্ডিত প্রকৃতি যেন কোনোভাবেই বিবর্ণ না হয়। স্থানীয় সরকার যেন সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।”
স্থানীয় পর্যটক কবীর আহম্মেদ জানান, প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে পদ্মপ্রেমীরা এখানে ছুটে আসেন। পদ্মের সুবাস নেওয়ার পাশাপাশি তারা উপভোগ করেন বিলের নয়নাভিরাম দৃশ্য।
তিনি বলেন, “পর্যটকেরা এসে ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে বিলের মাঝখানে গিয়ে যেন এক অপার্থিব লোকে হারিয়ে যান। অনেকেই পদ্মের সুবাস নিয়ে ফিরে এসে পোশাক পরিবর্তন কিংবা শৌচাগারের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। তবে সেই পরিবেশ না থাকায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। পদ্মবিলের পাশে পর্যটকবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য এগুলো করা জরুরি।”
তবে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও দাবি, পর্যটনসুবিধা তৈরির নামে যেন বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট না হয়।
পদ্ম শুধু সৌন্দর্য নয়, জীববৈচিত্র্যেরও আশ্রয়
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদ্মের বিস্তার বিভিন্নভাবে হতে পারে। পাখির মাধ্যমে পদ্মের বীজ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একইভাবে প্রাকৃতিক জলধারার মাধ্যমেও এর বিস্তার ঘটে।’
ছোট ডিঙি নৌকায় বিলের মাঝখানে গিয়ে পদ্মের রাজ্যে হারিয়ে যাচ্ছেন তারা
তিনি বলেন, ‘পদ্মের ফলের বীজ নদ-নদীর প্রবাহের মাধ্যমে বিভিন্ন বিল-ঝিলে গিয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া পদ্মের কাণ্ডের নিচে থাকা কন্দ বা রাইজম মাটির গভীরে দীর্ঘদিন জীবিত থাকতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে গেলেও সেই কন্দ মাটির নিচে টিকে থাকে। পরে আবার পানি এলে সেখান থেকে নতুন পদ্মগাছ জন্ম নেয় এবং ফুল ফোটে।’
পদ্মবিলের পরিবেশগত গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পদ্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাছের আশ্রয়ের জন্যও এটি উপকারী। বিল-ঝিলে এ ধরনের উদ্ভিদ না থাকলে মাছের আশ্রয় কমে যায়। একই সঙ্গে পদ্মের বীজ পাখির গুরুত্বপূর্ণ খাবার। ফলে পদ্ম বিলুপ্ত হলে পাখির প্রাকৃতিক খাবারের ওপরও প্রভাব পড়বে এবং সামগ্রিকভাবে ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রাকৃতিক জলাশয় হিসেবে পদ্মবিলকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ফুল ছেঁড়া ঠেকাতে গ্রাম পুলিশ
মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম দীপক বলেন, প্রতিদিন সকাল ও বিকালে বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত দর্শনার্থী পদ্মবিলে আসেন। তাদের নিরাপত্তা ও বিলের সৌন্দর্য রক্ষায় স্থানীয়ভাবে একটি কমিটি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যসহ এলাকার কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একজন গ্রাম পুলিশও নিয়োগ করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা পদ্মফুল ছিঁড়ে না নেন।
তিনি বলেন, “যদি ফুলগুলো না ছিঁড়ে দর্শনার্থীরা, তাহলে দেখা যাবে যে সুন্দর একটা মনোরম পরিবেশ। যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। যারা যাবে, প্রত্যেকেই অন্তত মানসিকভাবে একটা শান্তি পাবে এবং আনন্দ পাবে।”
পর্যটকদের সুবিধার জন্য শৌচাগারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, গত বছর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কাছে পদ্মবিলের পাশে একটি সরকারি শৌচাগার নির্মাণের দাবি জানিয়েছিলেন।
ওয়াশ ব্লক-চেঞ্জিং রুম তৈরির উদ্যোগ
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়া জানান, বর্তমানে পদ্মবিলে প্রচুর পদ্ম ফুটেছে এবং তিনি নিজেও সেখানে গেছেন। দর্শনার্থীরা যাতে ফুল না ছেঁড়েন, সে জন্য সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙানো হয়েছিল। কিন্তু সচেতনতার অভাবে কেউ কেউ সেগুলো তুলে নিয়ে যাচ্ছে এবং পদ্মফুল ছিঁড়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা ওখানে একজন গ্রাম পুলিশকে দায়িত্ব দিয়েছি, যেন সে নিয়মিত থাকে এবং আগত মানুষদের বলে—দয়া করে আপনারা কেউ ফুল ছিঁড়বেন না। কারণ হাজার মানুষ যদি প্রতিদিন পদ্মবিলে আসে এবং একটা করে ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যায়, তাহলে দশম দিনে যে আসবে, সে আর কোনো ফুলেরই দেখা পাবে না।”
পদ্মবিলকে আরও সুরক্ষিত রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ইউএনও বলেন, পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হচ্ছে।
দর্শনার্থীদের সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পদ্মবিলে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য ওয়াশ ব্লক ও চেঞ্জিং রুম নেই। এসব সুবিধা তৈরির জন্য ইতোমধ্যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এবং টেন্ডারও পাস হয়েছে। খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
একদিকে পদ্মের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে বাড়ছে দর্শনার্থীদের ভিড়, অন্যদিকে নির্বিচারে ফুল ছেঁড়া ও পর্যটনসুবিধার ঘাটতি এই প্রাকৃতিক সম্পদকে ঝুঁকিতে ফেলছে। স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিতভাবে পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে পদ্মবিলটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হবে।

