গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্ভরতা বাড়ছে কয়লার ওপর। তবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও এখন পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও কারিগরি ত্রুটি, কোথাও কয়লা সরবরাহের ঘাটতিতে উৎপাদন কমেছে। এতে গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে পুরোদমে কয়লাকে কাজে লাগানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
এর মধ্যে প্রচণ্ড গরমে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। গতকাল বৃহস্পতিবার দিনের বিভিন্ন সময়ে জাতীয় গ্রিডে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা গেছে। বিকেল ৩টায় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট। ওই সময়ে লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট।
সন্ধ্যা ৬টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট। সরবরাহ পাওয়া যায় ১৩ হাজার ৩৩৯ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ৪৭৬ মেগাওয়াট। দিনরাতের এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার জনজীবনে।
জুলাইয়ের গ্যাস সংকট এখনও কাটেনি
চলমান প্রচণ্ড জ্বালানি সংকটের শুরুটা গত ২০ জুলাই একটা এলএনজি টার্মিনালের আগুন লাগার পর থেকে। এর পর গ্যাস সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুট কমে যায়। আগস্টের মাঝামাঝি টার্মিনালটি মেরামত হলেও কার্গো নিয়ে জটিলতায় এলএনজি সরবরাহ এখনও স্বাভাবিক হয়নি।
বর্তমানে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৩২ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং আরএলএনজি থেকে ৭১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গ্রীষ্মের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে অন্তত ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। এবার পেট্রোবাংলা ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৭০ থেকে ৮০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে থাকছে গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় একটি অংশকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
ভরসার কয়লাতেও স্বস্তি নেই
গ্যাসের ঘাটতি পূরণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পিডিবির হিসাবে, দেশের সাতটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ছয় হাজার ১৩৩ মেগাওয়াট। এর সঙ্গে ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ ধরলে কয়লাভিত্তিক মোট সক্ষমতা সাত হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি।
কিন্তু সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগছে না। বর্তমানে কয়লা থেকে গড়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্র থেকে এক হাজার ২৪৪ মেগাওয়াটের জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৯৩০ মেগাওয়াট। পায়রা কেন্দ্রেও এক হাজার ২৪৪ মেগাওয়াটের পরিবর্তে প্রায় ৫৮০ মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কারিগরি ত্রুটিতে প্রায় দুই মাস ধরে পায়রায় এ পরিস্থিতি চলছে।
রামপালের দুটি ইউনিটের মোট সক্ষমতা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। গতকাল কেন্দ্রটি প্রায় এক হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তবে কয়েক দিন আগেও কয়লা সরবরাহের ঘাটতির কারণে সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল।
বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। ফলে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কয়লা থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগও কমে গেছে। মাতারবাড়ী এবং এস আলমের বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি থেকে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যুৎ মিলছে। মাতারবাড়ী থেকে আসছে এক হাজার ১৫০ মেগাওয়াট আর এসএস পাওয়ার থেকে গ্রিডে যাচ্ছে এক হাজার ২২৪ মেগাওয়াট।
আদানির উৎপাদনেও ওঠানামা
ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের কেন্দ্রটির সক্ষমতা প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট। কয়লা সরবরাহে সমস্যা হওয়ায় ৭ আগস্ট থেকে কেন্দ্রটি উৎপাদন কমিয়েছে।
দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিলেও সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী প্রায় এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সরবরাহ করছে তারা। ৯ সেপ্টেম্বর (বুধবার) রাতে এক পর্যায়ে সরবরাহ এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি হলেও রাত ১২টার পর একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে উৎপাদন ৭৩২ মেগাওয়াটে নেমে আসে।
গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় আদানি থেকে পাওয়া গেছে ৭৩২ মেগাওয়াট।
গ্যাসের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সরাসরি মানুষের জীবনেও আঘাত করছে গ্যাস সংকট। অনেক বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রান্নার চুলা জ্বলছে না। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ লাইন।
কোথাও গাড়ির সারি এক থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা রাস্তায় নামতে পারছে না।
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মঙ্গলবার নগরীর ষোলশহরের একটি ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, গ্যাস নেওয়ার জন্য গাড়ির লাইন ফিলিং স্টেশন ছাড়িয়ে ২ নম্বর গেট পর্যন্ত চলে গেছে।
একজন অটোরিকশাচালক জানান, সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়েও কয়েক ঘণ্টা পর গ্যাস নেওয়ার সুযোগ মেলেনি। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা শুধু গ্যাসের লাইনে কাটছে। এতে গাড়ি চালানোর সময় কমে যাওয়ায় আয়ও কমছে।
ঢাকার সাতরাস্তায় সিএনজি পাম্পের লাইন মূল সড়কে যানজটের সৃষ্টি করেছে। গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনে। বিভিন্ন রুটে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করছেন যাত্রীরা।
গরমে নাকাল মানুষ
গ্যাস ও বিদ্যুতের এই সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দিনে ও রাতে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
বাসাবাড়িতে সিলিং ফ্যান ও এসি বন্ধ থাকছে, পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাজেও বিঘ্ন ঘটছে। বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবায়ও সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
হাসপাতাল ও জরুরি সেবার ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাড়াচ্ছে উদ্বেগ। ব্যাকআপ জেনারেটর দিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান সেবা চালু রাখলেও তাতে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়।
সবচেয়ে বেশি কষ্টে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঘরে থাকা যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে, তেমনি বাইরে বের হলেও পরিবহন ও জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে।
শিল্পেও বাড়ছে উৎপাদন ক্ষতি
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদনে। উদ্যোক্তাদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল, সিরামিক, ইস্পাত-রড এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন কমেছে। কোথাও কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে, কোথাও শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। টেক্সটাইল মিলগুলোতে সুতা উৎপাদন ও ডাইংয়ের মতো প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটছে। সিরামিক কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় কিলন চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ইস্পাত ও রড কারখানাগুলোও গ্যাসনির্ভর ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে না পারায় জাতীয় গ্রিডের অনিয়মিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট সামাল দিতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও শিপমেন্টে বিলম্বের কারণে রপ্তানি আদেশ হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। ছোট ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও আয়ও কমছে।