Image description

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজ থেকে তার তদন্ত করতে পারবে না। অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ওই তদন্তের দায়িত্ব অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা বিশেষ আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের হাতে অর্পণ করা হবে। গত রোববার জাতীয় সংসদে পাস করা বহুল আলোচিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে এমন বিধান করা হয়েছে। দুর্বল বিল আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলের ওয়াকআউট ও অনুপস্থিতির মধ্যেই বিলটি জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। আইনটিতে গুমের সংজ্ঞা নির্ধারণ, শাস্তি, ভুক্তভোগীদের অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষতিপূরণের মতো একাধিক ধারায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

জানতে চাওয়া হলে আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক কালবেলাকে বলেন, ‘কোনো অভিযোগের/অপরাধের তদন্ত সে-ই করতে পারে, যার তদন্ত সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ আছে। তদন্তের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর থাকে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে তদন্ত দেওয়ার দাবি অবাস্তব। আমি মনে করি, এক বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা অন্য বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করার যে বিধান করা হয়েছে, সেটা সঠিক সিদ্ধান্ত। এর কোনো বিকল্পও নেই। তবে বাস্তবতা না বুঝে অনেকেই সমালোচনা করছেন।’

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন পাসের মাধ্যমে গুমের ঘটনায় বিচার পাওয়ার সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তার মতে, নতুন আইনে গুমের স্পষ্ট সংজ্ঞা থাকায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচারের নতুন দ্বার খুলেছে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করে তার অবস্থান গোপন করলে, অজ্ঞাত স্থানে রাখলে কিংবা আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে। তবে কোনো গুমের ঘটনা ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হলে সেটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের অপরাধের বিচার হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

তিনি আরও বলেন, আগে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ে অধ্যাদেশ থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায়নি। কারণ, ওই আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তখন কমিশন কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেনি। নতুন আইনের ৩৩ ধারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গুমের কোনো মামলা এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালে চলমান থাকলে তার বিচার সেখানেই হবে। অন্যদিকে, সেশন কোর্ট বা

ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চলমান কোনো মামলায় ঘটনা ব্যাপক বা পদ্ধতিগত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে প্রতীয়মান হলে তা ট্রাইব্যুনালে পাঠানো যাবে। পুলিশি তদন্তের যে কোনো পর্যায়েও কোনো ঘটনাকে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে সেটি ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা বা চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ও অন্য আদালতে চলমান এমন মামলা ট্রাইব্যুনালে এনে বিচারের উদ্যোগ নিতে পারবে।

শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বিশেষ বিধান ও আইনি জবাবদিহি: প্রস্তাবিত আইনে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো বাহিনীর সদস্য বা সরকারি কর্মচারী পরিচয়ে যদি কাউকে আইনবহির্ভূতভাবে আটক, অপহরণ বা স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পর তা অস্বীকার করা হয় বা তার অবস্থান গোপন রাখা হয়, তবে তা ‘গুম’ হিসেবে গণ্য হবে। যদি কোনো গুমের ঘটনা ব্যাপক বা পরিকল্পিত পদ্ধতিতে সংঘটিত হয়, তবে তা সাধারণ ফৌজদারি আইনের অধীনে নয়, বরং ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন’-এর অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের বিচার শুধু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেই সম্পন্ন হবে।

আইনের ৩ নম্বর ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, বলবৎ অন্য যে কোনো আইনের ওপর এ আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে। ১৪(৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে, স্বার্থের সংঘাত এড়াতে সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজে সেই ঘটনার তদন্ত করতে পারবে না। কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে কিংবা সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা বিশেষ ‘আন্তঃবাহিনী তদন্ত দল’-এর ওপর তদন্তের দায়িত্ব অর্পণ করবে। এ ছাড়া, বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কমান্ডার বা দলনেতা যদি অধস্তনদের এমন অপরাধের আদেশ দেন, প্ররোচনা দেন বা অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে প্রতিরোধে ব্যর্থ হন, তবে তিনিও মূল অপরাধীর সমান দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন (ধারা ১০)। ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পালন করা হয়েছে’ বা ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা’-এমন কোনো অজুহাত আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না (ধারা ১৩)।

শাস্তি ও বিচার প্রক্রিয়: সাধারণ গুমের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বনিম্ন ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে (ধারা ৫)। গুমের ফলে ভুক্তভোগীর মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ উদ্ধার হলে কিংবা ৫ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও জীবিত বা মৃত অবস্থায় সন্ধান না পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করা যাবে (ধারা ৬)। সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করা বা গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ ও ব্যবহারের জন্য সর্বনিম্ন ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়েছে।

মামলা দায়েরের পর সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে এবং বিশেষ কারণে অতিরিক্ত ৩০ দিনের মধ্যে দায়রা জজ আদালতে বিচারকাজ শেষ করতে হবে। তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য ৯০ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও গুমের বিচার: আইনটিতে সুস্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, পদ্ধতিগত বা ব্যাপকভাবে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার্য হবে। যদি সাধারণ মামলা চলাকালে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, ঘটনাটি ব্যাপক বা পরিকল্পিত, তবে মামলা বা তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর স্থানান্তর করা হবে (ধারা ৩৩ ও ৩৪)।

ভুক্তভোগী ও পরিবারের সুরক্ষা ও অধিকার: গুমের শিকার ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের অধিকার রক্ষায় আইনটিতে একাধিক মানবিক ও বাস্তবসম্মত বিধান রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গুম হওয়া ব্যক্তির দায় শোধ ও পরিবারের ভরণপোষণের জন্য আদালত থেকে ‘গুম সনদ’ নিয়ে তার সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি পাবেন স্বামী, স্ত্রী বা নির্ভরশীলরা। গুমের ৫ বছর অতিক্রান্ত হলে আইনগত ওয়ারিশদের মাঝে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য আদালত ঘোষণা দিতে পারবে (ধারা ২৯)। দণ্ডিত অপরাধীর সম্পত্তি ক্রোক ও নিলামের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ প্রদানে বাধ্য থাকবে (ধারা ২৩)। এ ছাড়া ভুক্তভোগীদের জন্য সরকারি পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তা তহবিল গঠন করা হবে। গোপনীয়তা রক্ষায় ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ (ভিডিও, কল রেকর্ড) সাক্ষ্য হিসেবে আদালত গ্রহণ করবে। তথ্য প্রকাশকারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিধানে ‘জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১’-এর পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া হবে। গুম সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য, বাহিনীর নাম, ইউনিটের পরিচয় ও তদন্তের অগ্রগতি সংরক্ষণে সরকারের অধীনে একটি সুরক্ষিত লিঙ্গ ও শিশু-সংবেদনশীল কেন্দ্রীয় ‘ডাটাবেজ’ বা তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা হবে (ধারা ৩২)। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সুশাসন এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এই ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন আইনি বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা।