মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিদেশে হোটেল ভাড়া ও পকেটের নগদ ভাতা ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। সরকারি সফরে গেলেই তারা এ সুবিধা ভোগ করবেন। এ ব্যাপারে একটি রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে সরকারের এ-সংক্রান্ত কমিটি। এটি অনুমোদনের জন্য শিগগিরই অর্থমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র আগামীর সময়ের কাছে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এক যুগের বেশি সময়ের ব্যবধানে সরকারি কাজে বিদেশ সফরকালে প্রধান বিচারপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের হোটেল ভাড়া ও ভাতা বাড়েনি। ফলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের ব্যাপক পরিবর্তনের বিষয় বিবেচনা করে ভাড়া ও নগদ ভাতার হার পুনরায় পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে সর্বশেষ ২০১২ এবং ২০০১ ও ১৯৯৫ সালে ভ্রমণসংক্রান্ত দৈনন্দিন ভাতা ও সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সূত্রমতে, রাষ্ট্রীয় কাজে সম্প্রতি লন্ডন সফরকালে একজন মন্ত্রীর জন্য একটি পাঁচতারকা হোটেলে সাধারণ রুম দৈনিক ৮৫০ মার্কিন ডলারে ভাড়া বুকিং করা হয়, যা নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণেরও বেশি। পরে অর্থ বিভাগ থেকে এতে সম্মতি দেওয়া হয়। অথচ একই হোটেলে মডারেট সুইট বুকিং করা হলে তা সিলিংয়ের চেয়ে পাঁচ-ছয় গুণ বেশি হতো। এমন বাস্তবতার নিরিখে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সরকারি বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে হোটেল ভাড়ার সিলিং প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে গত ১৮ এপ্রিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয় অর্থ মন্ত্রণালয়কে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগ সাত সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটি পর্যালোচনা করে একটি সুপারিশ চূড়ান্ত করে। সেখানে উচ্চ, মধ্যম এবং কম খরচের হিসাবে সারা বিশ্বের দেশগুলোকে ভাগ করা হয়। হোটেল ভাড়া ও দৈনিক ভাতা সবচেয়ে বেশি বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে উচ্চ খরচের দেশগুলোতে অবস্থান করলে। পর্যায়ক্রমে মধ্যম ও নিম্ন খরচের দেশগুলোর হোটেল ভাড়া ও দৈনিক ভাতা কমিয়ে সিলিং নির্ধারণ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, রাশিয়াকে উচ্চ খরচের দেশের তালিকায় যুক্ত করা হয়। এ ছাড়া জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চীন, হংকংও এ তালিকায় আছে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই), কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, ওমানকে অানা হয় এ তালিকায়।
এ ছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান, মালে (মালদ্বীপ), তুরস্ক, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক, রোমানিয়া, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান রয়েছে মধ্যম খরচের দেশে। পাশাপাশি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, চিলি, কলম্বিয়া এবং মিসর, জর্ডান, মরক্কো, লেবাননও আছে এ তালিকায়। আর কম খরচের তালিকায় আছে নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান, মিয়ানমার, কেনিয়া, উগান্ডা, তানজানিয়া, নাইজেরিয়া, সুদান, ইথিওপিয়া, জিম্বাবুয়ে, লাওস, কম্বোডিয়া ও পাপুয়া নিউগিনি।
‘সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণকালে বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্য ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পুনর্নির্ধারণ’ সংক্রান্ত কমিটি জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির জন্য উচ্চ খরচের দেশগুলোতে ভ্রমণের জন্য প্রতি রাতে হোটেল ভাড়া ৫৬০ থেকে বাড়িয়ে ৮২৩ ডলার করার সুপারিশ করেছে। তবে মধ্যম খরচের দেশগুলোর ক্ষেত্রে ৪৫৯ থেকে বাড়িয়ে ৬৭৫ এবং কম ব্যয়ের দেশগুলোর জন্য ৩৯৩ থেকে বাড়িয়ে ৫৭৮ ডলারের সুপারিশ করা হয়। এ বাড়তি হার বর্তমানের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি।
উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিদেশ থাকাকালে দৈনিক নগদ ভাতা উচ্চ ব্যয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে ১২৭ থেকে বাড়িয়ে ১৮৭ ডলারের প্রস্তাব করা হয়েছে। মধ্যম ও কম খরচের দেশের ক্ষেত্রে একই সিলিং রাখা হয়। বর্তমান প্রতিদিনের জন্য ভাতা ১০১ থেকে বাড়িয়ে ১৪৯ ডলারের সুপারিশ করা হয়। নতুন প্রস্তাবে বাড়বে ৪৭ শতাংশ।
অন্যদিকে মন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার ও মন্ত্রী পদপর্যাদার ব্যক্তির জন্য উচ্চ খরচের দেশগুলোতে অবস্থানকালে প্রতি রাতে হোটেল ভাড়া ৪২০ থেকে বাড়িয়ে ৬১৭ ডলারের প্রস্তাব করা হয়েছে। মধ্যম খরচের দেশগুলোর ক্ষেত্রে ৩৪৬ থেকে বাড়িয়ে ৫০৯ এবং কম ব্যয়ের ক্ষেত্রে ২৯৫ থেকে বাড়িয়ে ৪৩৪ ডলার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। এটি বর্তমােনর তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া উল্লিখিত ব্যক্তিদের দৈনিক নগদ ভাতা উচ্চ ব্যয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে ১২৭ থেকে বাড়িয়ে ১৮৭ ডলার নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি মধ্যম ও স্বল্প খরচের দেশের ক্ষেত্রে একই সিলিং রেখে ১০১ থেকে বাড়িয়ে ১৪৯ ডলারের সুপারিশ করা হয়, যা আগের তুলনায় বাড়বে ৪৭ শতাংশ।
প্রতিমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার ব্যক্তির জন্য উচ্চ খরচের দেশগুলোর জন্য হোটেল ভাড়া ৩১২ থেকে বাড়িয়ে ৪৫৯ ডলার, মধ্যম খরচের দেশগুলোর জন্য ২৬২ থেকে বাড়িয়ে ৩৮৫ এবং কম ব্যয়ের দেশগুলোর জন্য ২৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৩৮ ডলারের সুপারিশ করা হয়েছে, যা বর্তমানের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি। উল্লিখিত ব্যক্তিদের নগদ ভাতা প্রতিদিনের জন্য উচ্চ ব্যয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে ১০১ থেকে বাড়িয়ে ১৪৯ ডলার নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি মধ্যম ও স্বল্প খরচের দেশের ক্ষেত্রে একই সিলিং রাখা হয়। সেক্ষেত্রে ভাতা ৮৭ থেকে বাড়িয়ে ১২৮ ডলারের সুপারিশ করা হয়। এক্ষেত্রে বাড়বে ৪৭ শতাংশ।
জানতে চাইলে হোটেল ভাড়া ও ভাতা পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত সরকারের গঠিত কমিটির প্রধান অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আজাদ ছাল্লাল গতকাল মঙ্গলবার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের ব্যাপক পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিদেশে থাকার হোটেল ভাড়া ও নগদ ভাতার হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে তা প্রকাশ করা হবে।’
জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে প্রস্তাব দিয়েছে— সেখােন বলা হয়, বর্তমান সরকারের বৈদেশিক নীতি (সবার আগে বাংলাদেশ) বাস্তবায়নে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের বিদেশ সফর এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে ২০১২ সালের সিলিং অনুযায়ী বিদেশ ভ্রমণের ভাতা ও সুবিধা পাচ্ছেন। সে হিসেবে ১ নম্বর গুচ্ছভুক্ত দেশগুলোতে প্রতিদিনের সর্বোচ্চ হোটেল ভাড়া নির্ধারণ করা আছে মন্ত্রীদের জন্য ৪২০ এবং প্রতিমন্ত্রীর জন্য ৩১২ মার্কিন ডলার। কিন্তু বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও খরচ বৃদ্ধির কারণে বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া শহরগুলোতে এ নির্ধারিত সিলিং বা সীমার মধ্যে কূটনৈতিক প্রটোকল ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষা করে উপযুক্ত আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, অনেক দেশেই মন্ত্রিপর্যায়ের প্রতিনিধিদের জন্য হোটেল ভাড়ার নির্দিষ্ট কোনো ঊর্ধ্বসীমা থাকে না। মূলত প্রকৃত খরচের ওপর ভিত্তি করে তা পরিশোধ করা হয়। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সময় কূটনৈতিক প্রটোকল, নিরাপত্তা এবং নির্ধারিত হোটেলে অবস্থানের বাধ্যবাধকতা থাকে। ফলে দেশের ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক প্রটোকল ও আবাসন সুবিধা অক্ষুণ্ণ রাখতে ২০১২ সালের নির্ধারিত হোটেল ভাড়ার সিলিং বাড়িয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সরকারি সফরের হোটেল ভাড়া প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ধারণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।