Image description

রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও মাদকের ভয়াবহ বিস্তার শিশুদের পড়াশোনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের একটি অংশ মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে, কেউ কেউ আবার অল্প বয়সেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না, কেউ কেউ ঝরে পড়ছে শিক্ষাজীবন থেকেই।

রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে ব্যক্তি উদ্যোগ ও বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও মাদকের বিস্তার শিক্ষার পরিবেশকে ক্রমেই সংকটাপন্ন করে তুলছে। কড়াইল বস্তিতে জাগো ফাউন্ডেশন স্কুলের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বস্তিতে শিশুদের শিক্ষার প্রধান প্রতিবন্ধকতা এখন মাদক। অভাবের সুযোগ নিয়ে একটি চক্র শিশুদের মাদক বহন ও বিক্রির কাজে ব্যবহার করছে।

শিশুদের সহজে কেউ সন্দেহ করে না আর এ কারণেই তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সমাজ বিজ্ঞানী সালমা আক্তার বলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। স্কুলে অনেক শিশু ঝরে পড়ার একটা বড় কারণ ছেলে বাচ্চাদের আয় উপার্জন, আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বাধা বাল্যবিবাহ। এর পেছনে রয়েছে- তাদের পরিবার আর্থিক কারণে তাদের ওপর নির্ভরশীল। আবার বাবা-মায়েরা অনেক ক্ষেত্রে মাদকসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকে আগে থেকেই। বস্তিতে সন্তানরা কাদের সঙ্গে মিশছে কি করছে এসব বিষয়ে ওয়াকিবহাল কম থাকায়ও শিশুরা ক্রাইমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। 

সরেজমিন কড়াইল বস্তির বউবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে মাদকের সহজলভ্যতার অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ছোট ছোট পোঁটলায় বিভিন্ন ধরনের মাদক হাতবদল হয়। গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইনের মতো মাদকদ্রব্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্যও বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু কড়াইল নয়, রায়েরবাজার থেকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বিভিন্ন বস্তি, মগবাজার, হাতিরঝিল ও মধুবাগসংলগ্ন বস্তি এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক জায়গায় চায়ের দোকান, রিকশার গ্যারেজ কিংবা নির্দিষ্ট কিছু আড্ডাস্থলকে কেন্দ্র করে মাদকের লেনদেন চলে।

টিটিপাড়া রেললাইনের আশপাশেও বাইরে থেকে আসা মাদক নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে যাওয়ার পর তা সংগ্রহ করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বস্তির নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের একটি অংশ অপরাধী চক্রের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। মাদক বহন কিংবা সরবরাহের কাজে শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রথমে সামান্য অর্থের বিনিময়ে কাজে যুক্ত করা হলেও পরবর্তী সময়ে অনেকেই মাদক গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণতাও বাড়ছে।

কড়াইল বস্তির চা বিক্রেতা আমেনা বেগম বলেন, একজনের পাল্লায় পড়ে আরেকজন নষ্ট হচ্ছে। আগে পুলিশ এসে ঘরে ঢুকে ধরে নিয়ে যেত। এখন তেমন দেখি না। আমরা চাই, আমাদের সন্তানরা পড়াশোনা করে বড় হোক। বস্তিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের আয়ের বড় একটি অংশ ঘরভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেই চলে যায়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক পরিবারের একজনের আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই কাজে বের হতে হচ্ছে। বাবা-মা দুজনই কর্মস্থলে থাকায় অনেক শিশুর ওপর পর্যাপ্ত নজরদারি থাকে না। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে মাদক ও অপরাধী চক্র। অল্প বয়সি শিশুদের সহজে প্রভাবিত করে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।