‘রানার ছুটেছে তাই ঝুম্ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে, রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে’-কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই রানারের গতি ও কর্মপরিধি প্রযুক্তির প্রসারে অনেকটাই বদলে গেছে। মোবাইল, এসএমএস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থায় চিঠির প্রচলন প্রায় হারিয়ে গেছে। ব্যক্তিগত চিঠির সংখ্যা কমতে কমতে এখন তা শূন্যের কোঠায়। ফলে ঐতিহ্যবাহী ডাক বিভাগকে টিকে থাকতে নতুন সেবা ও আয়ের উৎস খুঁজতে হচ্ছে।
তবে ব্যক্তিগত চিঠি কমলেও বেড়েছে দাপ্তরিক ও আদালতের চিঠিপত্র। পাশাপাশি পার্সেল, লজিস্টিকস ও ই-কমার্স পণ্য পরিবহনে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডাক বিভাগকে আধুনিক লজিস্টিকস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জাকির হাসান নূর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডাক বিভাগ মূলত সরকারি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। তাই একে শুধু লাভ-লোকসানের মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। প্রযুক্তির কারণে ব্যক্তিগত চিঠি কমলেও দাপ্তরিক ও আদালতের চিঠিপত্রের পরিমাণ বেড়েছে। তিনি বলেন, সড়ক ও রেলপথের সমন্বয়ে আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ঢাকায় ২৪ ঘণ্টা এবং এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনলাইন বিক্রেতাদের সুবিধার্থে বাড়ি বা অফিস থেকে পণ্য সংগ্রহের জন্য ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস’ মডেলও চালু করা হয়েছে।
আয় বাড়লেও লোকসান : দেশে বর্তমানে পোস্ট অফিস রয়েছে ৯ হাজার ৮৮৬টি। এর মধ্যে ডাক বিভাগের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ১ হাজার ৬০০ এবং এজেন্ট পোস্ট অফিস ৮ হাজার ৩০০টি। একসময় ব্যক্তিগত চিঠি ছিল ডাক বিভাগের আয়ের অন্যতম উৎস। এখন এর ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। বিপরীতে দাপ্তরিক ডাক এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ডাকের পরিমাণ বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসব ডাকের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ কোটি ১০ লাখ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখে দাঁড়িয়েছে।
ডাক বিভাগের আয়ও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় ছিল প্রায় ২১৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ২৫৩ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিন বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা।
তবে বছরে ডাক বিভাগের ব্যয় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেতন-ভাতায় প্রায় ৫০০ কোটি এবং পেনশন ও আনুতোষিকে ২৬০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়। ফলে আয় বাড়লেও ব্যয়ের তুলনায় তা অনেক কম। ডাক বিভাগের তথ্যমতে, মোট বাজেটের ৯৩ শতাংশই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়।
চিঠির বদলে পার্সেল : ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের প্রসারকে সামনে রেখে ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে ডাক বিভাগ। এজন্য দেশব্যাপী ১৪টি ফুলফিলমেন্ট সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রসেসিং, বুকিং, বাছাই, পরিবহন ও বিলির ব্যবস্থা থাকবে।
ঢাকার তেজগাঁওয়ের পাশাপাশি গোপালগঞ্জ, ঈশ্বরদী, ময়মনসিংহ, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও যশোরে এসব কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের নিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি : ডাকসেবার পরিধি বাড়াতে উদ্যোক্তাদের যুক্ত করে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস’ চালু করা হয়েছে। এসব উদ্যোক্তা মূলত পণ্য সংগ্রহ ও বিলির কাজ করবেন। ডাক বিভাগের নিয়ম মেনে চুক্তির মাধ্যমে তাদের যুক্ত করা হবে এবং সরাসরি তত্ত্বাবধান করবে ডাক বিভাগ। অনিয়ম বা সেবার মান ক্ষুণ্ন হলে চুক্তি বাতিলের ব্যবস্থাও থাকবে।
ডাকযোগে ৩১২ টনের বেশি ফল : কৃষিপণ্য পরিবহনেও সম্ভাবনা দেখছে ডাক বিভাগ। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন উৎস জেলা থেকে ৩১২ টনের বেশি মৌসুমি ফল সংগ্রহ করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। রাজশাহীর আম ছাড়াও সাতক্ষীরা, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফল পরিবহন করা হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তারা উপকৃত হয়েছেন বলে দাবি ডাক বিভাগের।
প্রযুক্তিতে আধুনিকায়ন : ডাকসেবায় অনলাইন ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং সুবিধা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। স্পিডপোস্ট ও এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিসের পাশাপাশি দেশব্যাপী মেইল প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। ভূমির পর্চা ও খতিয়ান হোম ডেলিভারি, পাসপোর্টের বাল্ক ডেলিভারির পর এখন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক মামলা-সংক্রান্ত নথি প্রেরণও ডাক বিভাগের সেবায় যুক্ত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট, পুরোনো ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান নিয়ে অভিযোগ ডাক বিভাগের বড় চ্যালেঞ্জ। এসব মোকাবিলায় তিনটি মেইল মনিটরিং সফটওয়্যার তৈরির কাজ চলছে। এর মাধ্যমে ডাকের গতিপথ, বিলম্ব ও সরবরাহ কার্যক্রম নজরদারির আওতায় আনা হবে।
তবে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় অর্থ লেনদেন, পণ্য নিরাপত্তা ও গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করাই হবে বড় পরীক্ষা। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেবার মাধ্যমে লোকসানি প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানোর সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে এসব ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।