দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ওপর। অথচ সংস্থাটি নিজেই আর্থিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অডিট মেমোগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির অর্থ ব্যবস্থাপনা, বাজেট বাস্তবায়ন, ক্রয়প্রক্রিয়া, অগ্রিম প্রদান ও সমন্বয়, ভাতা প্রদান, ব্যাংক হিসাব সংরক্ষণ এবং সরকারি বিধিবিধান অনুসরণের ক্ষেত্রে একের পর এক গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। অডিট প্রতিবেদনের কোথাও বাজেট বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয়, কোথাও ক্রয় সীমা অতিক্রম করে অর্থ খরচ, আবার কোথাও প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ভাতা ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ক্যাশবুকে আয়-ব্যয়ের হিসাবে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে এক অর্থবছরে ইউজিসিতে ১৬৩ কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। এর মধ্যে বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত ২৮ কোটি টাকা ব্যয়, যথাযথ ব্যাংক হিসাব সংরক্ষণ না করে ৮৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা অনিয়মিত ব্যয়, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা ছাড়া ১৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে বিলম্ব জরিমানা আদায় না করে ২৩ কোটি ৪১ লাখ ৮৬ হাজার ৫৪১ টাকা সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করা হয়েছে।
এসব অনিয়মের ফলে ইউজিসির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। যে সংস্থার অন্যতম দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুশাসন, জবাবদিহি ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখা, সেই সংস্থার নিজের হিসাবেই যদি বছরের পর বছর বিধি লঙ্ঘন, অনিয়মিত ব্যয় ও সরকারি অর্থের ক্ষতির এমন চিত্র পাওয়া যায়, তাহলে ইউজিসির অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও তদারকি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর সেই প্রশ্ন উঠেছে।
ইউজিসির এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়গুলো আমার জানা নেই। অডিট শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলুন। তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউজিসির অডিট শাখার পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নাহিদ সুলতানার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে ক্ষতি ২৮ কোটি
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ইউজিসির সংশোধিত বাজেটে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৫ কোটি ২ লাখ ৫০ টাকা। ক্যাশবই অনুযায়ী ইউজিসি ব্যয় দেখিয়েছে ১১৩ কোটি ২৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৭১ টাকা। ফলে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে উক্ত খাতসমূহে বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে ২৮ কোটি ২৩ লাখ ৩৬৭১ টাকা। অতিরিক্ত এ অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা অনুবিভাগের আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ২০১৫ এর উক্ত নির্দেশনাসমূহ লঙ্ঘন করে বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ইউজিসি।
বিধি বহির্ভূতভাবে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ওভারটাইম ভাতা দিয়েছে ইউজিসি
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের বেতন বিল, ওভার টাইম বিল/ভাউচার যাচাই করে অডিট অধিদপ্তর দেখেছে, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ওভারটাইম ভাতা প্রদান দিয়েছে ইউজিসি। এর ফলে সরকারের ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬১ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কমিশনের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অফিস সময়ের আগে পরে এবং ছুটির দিনে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন হারে ভাতা প্রদান করা হয়েছে। মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সংস্থাপন বিভাগ, পরিবহন শাখার নির্দেশনা অনুযায়ী সকল সরকারি অফিসসমূহের ড্রাইভারদের ঘণ্টা প্রতি মূল বেতনের সমহারে রবিবার ও সরকারি ছুটির দিনসহ মাসিক সর্বোচ্চ ২৫০ ঘণ্টা হিসাবে অধিকাল ভাতা প্রদান করা যাবে। অর্থাৎ কেবলমাত্র সরকারি ড্রাইভারগণই অধিকাল ভাতা প্রাপ্য হবেন। তবে সেটি উপেক্ষ করেছে ইউজিসি।
ইউজিসির ক্যাফেটেরিয়া ভাড়ায় অনিয়ম
ইউজিসি ভবনে থাকা জনতা ব্যাংক পিএলসি এবং ক্যাফেটেরিয়া ইজারাদার মেসার্স এস.এ এন্টারপ্রাইজ চুক্তিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে নিচ তলায় ১৬০০ বর্গফুট সম আয়তনের ভবন ভাড়ার জন্য জনতা ব্যাংক পিএলসির সাথে মাসিক ১ লাখ টাকা এবং ক্যাফেটেরিয়া ইজারাদারের সাথে মাসিক ৫ হাজার টাকা দরে ভাড়ার চুক্তি করা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারীকৃত আদেশ অনুযায়ী আগারগাঁও এলাকায় মোজাইক/টাইলস মেঝে বিশিষ্ট ব্যবহার যোগ্য কক্ষ ও গোসলখানার নির্ধারিত ভাড়ার হার বর্গফুট প্রতি ৪১.৮ টাকা। সেই হিসেবে ১৬০০ বর্গফুট আয়তনের ভবনের সর্বনিম্ন মাসিক ভাড়া ৬৬ হাজার ৮৮০ টাকা। ফলে উক্ত আদেশ অনুসরণ না করে সম আয়তনের ভবন ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে ক্যাফেটেরিয়ার জন্য ইজারাদারের সাথে মাসিক ৫ হাজার টাকা দরে ভাড়া সংক্রান্ত চুক্তি করায় ৮ মাসে ইউজিসির ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
সিলিং সীমার অতিরিক্ত উত্তোলনে অনিয়ম ৬৪ লাখ
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে আর্থিক ক্ষমতা বহির্ভূত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিভিন্ন ব্যক্তি কর্তৃক সিলিং সীমার অতিরিক্ত অগ্রিম ৬৪ লাখ ২১৫৫ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ অনুযায়ী স্থায়ী অগ্রিমের ক্ষেত্রে ৭ লাখ টাকার অতিরিক্ত এককালীন অগ্রিম উত্তোলনের বিষয়টি বিবেচনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে প্রেরণ করতে হবে। তবে এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সিলিং সীমার অতিরিক্ত অগ্রিম অর্থ দেওয়ায় ৬৪ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
ক্রয় সীমার উর্ধে ব্যয়, ক্ষতি ৬৫ লাখ
ইউজিসির পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা ক্রয় সংক্রান্ত নথিপত্র ও বিল ভাউচার এবং ক্যাশ বহি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে আরএফকিউ পদ্ধতিতে পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা ক্রয় বাবদ ৩২ টি বিলের মাধ্যমে ৮০ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৮ টাকা ব্যয় করা হয়। এক্ষেত্রে বার্ষিক ক্রয় সীমার অতিরিক্ত ৬৫ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৮ টাকা অনিয়মিতভাবে ব্যয় করা হয়। পিপিআর-২০০৮ এর বিধি-৬৯(১) এবং আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ, ২০১৫ এর অনুচ্ছেদ-৪৫ (ক) এর বিধান অনুযায়ী আরএফকিউ পদ্ধতিতে পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক মূল্যসীমা রাজস্ব বাজেটের অধীন প্রতিটি ক্রয়ের জন্য অনধিক ৩ লাখ টাকা; তবে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করা যাবে। তবে ইউজিসি এ বিধান লঙ্ঘন করেছে।
প্রাপ্য না হওয়া সত্ত্বেও মোবাইল ভাতা দিয়েছে ইউজিসি
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ৫৭ জনের প্রাক্কলনের অধীনে বেতন বিলে ১০১০ টাকা হারে মোট ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়া হয়েছে। সরকারি টেলিফোন, সেলুলার, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট নীতিমালা, ২০১৮ এর ক্রমিক নম্বর ২৯(চ) মোতাবেক ৪র্থ গ্রেড নিচের প্রাক্কলন মোবাইল, টেলিফোন ভাতা প্রাপ্য নয়। কিন্তু উক্ত নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ৪র্থ গ্রেড নিচের প্রাক্কলনকে মোবাইল ভাতা প্রদান করা হয়েছে। ফলে প্রাপ্য না হওয়া সত্ত্বেও প্রাক্কলনের বিধি বহির্ভূতভাবে মোবাইল ভাতা প্রদান করায় ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
ব্যাংক হিসাব সংরক্ষণ না করেই ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়
শিক্ষা অডিট জানিয়েছে, ইউজিসির আয়-ব্যয় বিবরণী, সংশোধিত বাজেট বিবরণী, ক্যাশবুক, ব্যাংক বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে একাধিক চলতি এবং সঞ্চয়ী হিসাবের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত করেছে ইউজিসি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থবিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১, বাজেটশাখা-৩ জারীকৃত পরিপত্র অনুযায়ী আবশ্যিকভাবে সকল স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও এর অধীনে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প/স্কিমসমূহেন জন্য Personal Ledger (PL) অ্যাকাউন্ট-এর মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম সম্পাদনের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ কর্তৃক চালুকৃত iBAS++ Autonomous Body সাব মডিউলের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অর্থ ছাড়করণ ও ইএফটি পদ্ধতিতে বিল পরিশোধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। ইউজিসি সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া অগ্রিম সমন্বয় না করায় ৪০ লাখ টাকার অনিয়ম
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ক্যাশ বই, অগ্রিম রেজিস্টার ও বিল/ভাউচার যাচাইয়ে দেখা যায় যে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরীক্ষা সংক্রান্ত সভা, আনুষঙ্গিক ব্যয়, প্রশিক্ষণ, দাপ্তরিক ক্রয়, জ্বালানী, মেরামত, ও বিবিধ খরচ ইত্যাদির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের কর্মকর্তা এবং কর্মচারিগণকে এবং শাখা প্রধানকে অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এটি সমন্বয় করেনি ইউজিসি। এর ফলে ৪০ লাখ ৯২ হাজার ৫৭৯ টাকা আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।
ক্রয়নীতিমালা অনুসরণ না করে চুক্তি, ৭ লাখ
ইউজিসির ব্যয় বিবরণী ক্যাশবুক ও বিল ভাউচার পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি অনুষ্ঠানের নামে ৭ লাখ ৭৫ হাজার ৩৭৫ টাকা ব্যয় করেছে ইউজিসি। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ৩০০ জনের জন্য ২৩৫ টাকা দরে সকালের নাস্তা বাবদ ৭০ হাজার ৫০০ টাকা এবং দুপুরে খাবার বাবদ ৩৭৫ জনের জন্য ১১৮৫ টাকা দরে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭৫ টাকা ব্যয় করেছে। নিয়ম অনুযায়ী আপ্যায়নের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা এবং সর্বমোট (৫০ জন) ২ হাজার টাকার অধিক ব্যয় এবং অনুষ্ঠানে মধ্যাহ্ন ভোজ/নৈশ ভোজনের ক্ষেত্রে জনপ্রতি ৫০০ টাকা এবং সর্বমোট (১০০ জন) ৫০ হাজার টাকার অধিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থবিভাগের সম্মতি প্রয়োজন। বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৯ এর ক্রমিক নাম্বার ২ এর (৪) অনুযায়ী বার্ষিক বাজেটে যে উদ্দেশ্যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সে উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় অথবা ব্যবহার না করিয়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় বা ব্যবহার করা সরকারি অর্থ অপচয়ের সামিল। ফলে আলোচ্য অনুষ্ঠানের ব্যয় বাবদ ক্রয়নীতিমালা অনুসরণ না করায় বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির অনুষ্ঠানের নামে ৭ লাখ ৭৫ হাজার ৩৭৫ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ নির্দেশ উপেক্ষা করে ইউজিসি প্রফেসর খাতে ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ইউজিসি প্রফেসরদের ১২ মাসের সম্মানী বাবদ ৪৩ লাখ ৯ হাজার ১৭৬ টাকা কর্মকর্তাদের বেতন কোড নাম্বার ৩১১১১০১ থেকে পরিশোধ করেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান-৪, অধিশাখার স্মারক মোতাবেক জারীকৃত নির্দেশপত্র অনুযায়ী বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত/স্ব-শাসিত প্রতিষ্ঠান/সংবিধিবদ্ধ সংস্থা/কর্পোরেশনের প্রবিধানমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগবিধি পরীক্ষণ সংক্রান্ত উপকমিটিতে প্রস্তাব প্রেরণের পূর্বে ভবিষ্যত তহবিল/পেনশন/আনুষঙ্গিকসহ অন্যান্য আর্থিক সংশ্লেষ সংক্রান্ত বিষয়ে অর্থ বিভাগের মতামত গ্রহণের জন্য সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ-এর আওতাধীন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং বিভিন্ন কর্পোরেশনের সকল কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে ইউজিসির অর্গানোগ্রাম বহির্ভূত এই প্রফেসরদের সম্মানী দেওয়া হয়েছে। সম্মানী প্রদানে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশপত্র অনুসরণ করা হয়নি।
প্রাপ্যতা না থাকলেও সম্মানী দিয়েছে ইউজিসি, ক্ষতি ৩ লাখ ৮৬ হাজার
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ক্যাশ বই ও বিল/ভাউচার পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, পরিশিষ্টে বর্ণিত বিভিন্ন মালামাল সরবরাহে স্পেসিফিকেশন ও প্রাক্কলনসহ সিডিউল প্রস্তুতকরণ কমিটির সদস্যদের সম্মানী প্রাপ্য না হওয়া সত্ত্বেও প্রদান করা হয়েছে। পিপিআর-২০০৮ বিধি ৭(২), ৮(১৪) এবং তফসিল-২ মোতাবেক দরপত্র প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ কমিটি, মূল্যায়ন কমিটি ও কারিগরি সাব কমিটির সদস্যদের সম্মানী প্রদান করা যাবে না। এক্ষেত্রে পিপিআর-২০০৮ এর নির্দেশনা লঙ্ঘন করে স্পেসিফিকেশন ও প্রাক্কলনসহ সিডিউল প্রস্তুতকরণ কমিটির সদস্যগণ সম্মানী প্রাপ্য না হওয়া সত্ত্বেও প্রদান করায় প্রতিষ্ঠানের ৩,৮৬,৭০০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা ছাড়াই ১৬ কোটি টাকা ব্যয়
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১৬ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে। এই ব্যয়ের বিপরীতে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা চাহিদা দিলে তা নিরীক্ষায় উপস্থাপন করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী সরকারের রাজস্ব বাজেটের অধীন কোন ক্রয়কার্য পরিচালনাল ক্ষেত্রে, ক্রয়কারী একটি বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। পিপিএ ২০০৬ এর ধারা ১১ (৩) মোতাবেক তা ক্রয়কারী কার্যালগম প্রধান কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। পিপিআর ২০০৮ এর বিধি ১৬(১) অনুযায়ী ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন সফল ক্রয়কারীর জন্য বাধ্যতামূলক। ক্রয়কারী প্রত্যেক অর্থ-বছরের শুরুতে, অন্যান্য নিয়মের মধ্যে প্রত্যাশিত তহবিল প্রবাহের বিষয়টি বিবেচনাভ্রমে, কোন উন্নয়ন প্রকল্প বা কর্মসূচির সার্বিক ক্রয় পরিকল্পনা এবং প্রাক্কলিত ব্যয় বাৎসরিক ভিত্তিতে এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে হালনাগাদ করতে হবে। তবে এসব নিয়ম না মেনে ১৬ কোটি ৭২ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছে সংস্থাটি।
গাড়ি মেরামতে অতিরিক্ত ব্যয়, ক্ষতি ৬ লাখ
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের মেরামত পরিদর্শনের ফাইল যাচাই করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের প্রাধিকারপ্রাপ্ত গাড়িতে বাৎসরিক সিলিং সীমার অতিরিক্ত মেরামত/সংস্কারকাজ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী একটি গাড়িতে অনূর্ধ্ব ৭৫ হাজার টাকা ব্যয় করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু উক্ত নির্দেশনা লঙ্ঘন করে প্রাধিকারপ্রাপ্ত গাড়িতে বাৎসরিক সিলিং অতিরিক্ত ব্যয় করায় প্রতিষ্ঠানের ৬ লাখ ৪০ হাজার ২২৯ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
ইউজিসির আবাসিক কোয়ার্টারে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও পানির বিলে ভর্তুকি, ক্ষতি ১০ লাখ
আবাসিক বিদ্যুৎ ও পানির বিলের কপি, বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত নীতিমালা, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইউজিসির কোয়ার্টারে বসবাসরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও পানির বিলে ১০ লাখ ২৯ হাজার ৬০৫ টাকা ভর্তুকি প্রদান করা হয়েছে। আবাসিক কোয়ার্টারে বসবাসকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও পানির বিল সাধারণ তহবিল হতে প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের বাজেট অনুযায়ী কমিশনের আবাসে বসবাসরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিদ্যুৎ ও পানির বিলের উপর কমিশন হতে কোনরূপ ভর্তুকি প্রদান করা যাবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে উক্ত নির্দেশনা অমান্য করে কমিশনের আবাসিক কোয়ার্টারে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও পানির বিলে ভর্তুকি প্রদান করায় ১০ লাখ ২৯ হাজার ৬০৫ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
মেজারমেন্ট বুকে রেকর্ড না ৯৪ লাখ টাকা পরিশোধ
নিরীক্ষাকালে টেন্ডার ডকুমেন্টস, বিল-ভাউচার, ক্যাশবুক পর্যালোচনা করা হয় এতে দেখা যায়, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহ এবং প্রতিস্থাপন কাজের বিপরীতে মেসার্স বেঙ্গল এন্ড ব্রাদার্স, টু স্টার টাওয়ারের সাথে ৯৪ লাখ ৭৬ হাজার ২৩০ টাকার চুক্তি করে ইউজিসি। সিপিডব্লিউএ কোড এর সরবরাহকারী এবং ঠিকাদারদের অর্থ প্রদান করতে প্রযোজ্য বিধি এর কোড ৯২ অনুযায়ী (ক) প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়/সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কর্তৃক প্রণীত সহায়ক আদেশ সাপেক্ষে, বিস্তারিত পরিমাপ শুধুমাত্র নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী বা সহকারী প্রকৌশলীগণ, অথবা কাজের দায়িত্বে থাকা সেইসব নির্বাহী অধস্তন কর্মকর্তা কর্তৃক লিপিবদ্ধ করা হবে, যাদেরকে এই উদ্দেশ্যে পরিমাপের খাতা সরবরাহ করা হয়েছে। একটি প্রকল্পের সমস্ত কাজের আইটেম, তাদের ব্যয় নির্বিশেষে, কাজের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা কর্তৃক পরিমাপ ও লিপিবদ্ধ করা হবে। কোনো কাজের জন্য টেন্ডার গ্রহণকারী অফিসার, সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী/সহকারী প্রকৌশলীকে নিজে পরিমাপ লিপিবদ্ধ করার জন্য অথবা তাঁর অধস্তন কর্তৃক লিপিবদ্ধ পরিমাপের উপর ১০০% যাচাই করার নির্দেশ দিতে পারেন। সমস্ত পরিমাপ কাজের স্থানে একটি পরিমাপ খাতায় পরিচ্ছন্নভাবে এবং সরাসরি লিপিবদ্ধ করতে হবে, অন্য কোথাও নয়। প্রতিটি পরিমাপের সেট নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উল্লেখ করে এন্ট্রি দিয়ে শুরু করতে হবে। সম্পাদিত কাজের বিলের ক্ষেত্রে প্রাক্কলন/চুক্তিতে প্রদত্ত কাজের সম্পূর্ণ নাম, কাজের অবস্থান, ঠিকাদারের নাম, তার চুক্তির নম্বর এবং তারিখ, কাজ শুরু করার লিখিত আদেশের তারিখ, কাজ প্রকৃতপক্ষে সমাপ্তির তারিখ, পরিমাপের তারিখ এবং পূর্ববর্তী পরিমাপের উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু মেজারমেন্ট বুকে রেকর্ড না করে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহ এবং প্রতিস্থাপন কাজে বিল পরিশোধ করায় ৯৪ লাখ ৭৬ হাজার ২৩০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
কাজ না করলেও ঠিকাদারের কাছে জরিমানা নেই ইউজিসি, ক্ষতি ২৩ কোটি
চুক্তিপত্র, কার্যাদেশ, বিল ভাউচার, বাজেট লেজার যাচাই করা হয় এবং দেখা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত পূর্তকাজের বিভিন্ন প্যাকেজের বিপরীতে চুক্তি করা হয়েছে এবং চুক্তির বিপরীতে কাজ সমাপ্তির প্রকৃত মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও নিরীক্ষাকাল পর্যন্ত কাজ বাস্তবায়নে বিলম্বকাল ৪৮১ থেকে ১০২৮ দিন অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার কর্তৃক যথাসময়ে কাজ সমাপ্তির মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন ও যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যথা সময়ে কাজের মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়া হয়নি এবং বিলম্ব জরিমানা আদায় না করে ঠিকাদারদেরকে বিল পরিশোধ করা হচ্ছে।
চুক্তির জিসিসি ক্লজ ৭৩.১ অনুযায়ী প্রতিদিন বিলম্বের জন্য অসমাপ্ত কাজের ১% এর ন্যূনতম ০.০৫ এবং সর্বোচ্চ .১০ হারে বিলম্ব জরিমানা আদায় করতে হবে এবং বিলম্ব জরিমানা মোট মূল্যচুক্তির ১০% এর অধিক হইবেনা পিপিআর ২০০৮ এর বিধি ৩৯ এর উপবিধি ২৭ অনুযায়ী মূল চুক্তিতে প্রত্যাশিত বা সম্প্রসারিত সমাপ্তির তারিখ হইতে প্রতিদিন বিলম্বের জন্য ঠিকাদারকে চুক্তিতে নির্ধারিত দৈনিক বা সাপ্তাহিক হারে বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ প্রদান করিতে হইবে এবং ২৭(ক) অনুযায়ী বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রদেয় জরিমানার মোট পরিমাণ চুক্তিতে নির্ধারিত পরিমাণ অপেক্ষা বেশি হইবেনা। আলোচ্য ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক উপরোক্ত নির্দেশনা অনুসরণ না করে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাজ না করা সত্ত্বেও বিলম্ব জরিমানা আদায় না করে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করায় সরকারের ২৩ কোটি ৪১ লাখ ৮৬ হাজার ৫৪১ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
প্রাপ্যতার অতিরিক্ জ্বালানী ব্যবহার, ক্ষতি ৫ লাখ
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এর লগ বই, পেট্রোল ও ডিজেল জ্বালানী খাতের বিল ভাউচার পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ীর বিপরীতে সিলিং সীমার অতিরিক্ত জ্বালানী ব্যবহার করায় জ্বালানী বাবদ প্রতিষ্ঠানের ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৮০২ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সংস্থাপন/জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সার্বক্ষণিক গাড়ী ব্যবহারকারী প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ মাসিক ২০০ লিটার অকটেন/ডিজেল ও ৩০০ ঘনমিটার সিএনজি জ্বালানী প্রাপ্য হবেন। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত জ্বালানী ব্যবহার করে বিল পরিশোধ করায় প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।