সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রধান কৌসুলির একটি মন্তব্যের জেরে ফের আলোচনায় এসেছে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ড। যদিও তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই সংবেদনশীল মামলা হিসেবে আলোচনায় আসা 'সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু বলতে অপারগতা জানিয়েছে।
গত রোববার (৩০ আগস্ট) আইসিটির প্রধান কৌসুলি মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ‘কানেকশন’ (সংশ্লিষ্টতা) থাকার তথ্য পেয়েছেন তারা। অন্য একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ‘কল ডিটেইল রেকর্ড’ (সিডিআর) পর্যালোচনায় এই সূত্র পাওয়া গেছে। তবে ওই ব্যক্তির নাম-পরিচয় প্রকাশ করেননি তিনি। আরও জানিয়েছিলেন, ট্রাইব্যুনালের পাওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য তদন্তকারীদের দেওয়া হবে।
৩০ আগস্টে করা মন্তব্যের বিষয়ে আইসিটির প্রধান কৌসুলি মো. আমিনুল ইসলামকে বারবার কল ও ম্যাসেজ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
হাইকোর্টের আদেশে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি টাস্কফোর্স সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত করছে। চার সদস্যের এই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান।
আইসিটির প্রধান কৌসুলির ওই মন্তব্যের ৩ দিন পরও পিবিআই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।
এ বিষয়ে পিবিআই প্রধান ও পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল স্ট্রিমকে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের যার কথা বলছেন তিনি দেশের বাইরে আছেন। আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে এখনও কথা বলতে পারে নাই।’
পিবিআই সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে কোনো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডটি তদন্তাধীন, আমাদের যেটা বলার আদালতকে বলবো। এখনই কোনো মন্তব্য করলে তদন্তে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এটি অত্যন্ত সেনসিটিভ মামলা। এখানে আগাম কথা বলা যাবে না।’
এদিকে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোনও সাংস্কৃতিক কর্মীর নাম নিয়ে অনুমান নির্ভর কিছু প্রকাশ না করার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কিছু প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা বলেছেন। এ নিয়ে গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে অনুমান করে কারও নাম বলা ঠিক হবে না।’
অন্যদিকে এই ঘটনাকে এখন পর্যন্ত ‘চটকদার বক্তব্য’ হিসেবে দেখছেন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক বক্তব্যই আসে আবার কিছুদিন পর হারিয়ে যায়। এগুলোকে এক ধরনের চটকদার বক্তব্য বলা যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী এমন অনেক ফৌজদারি অপরাধ আছে, যা ডিটেক্ট করা যায় না। বাংলাদেশে যে দুই-একটা ঘটনা ডিটেক্ট করা যায় নাই, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম সাগর-রুনি কেস।
যতটুকু জানি, চিফ প্রসিকিউটর কোনো নাম বলেন নাই, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বলেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় কারও কারও নাম আসতে দেখছি। বর্তমানে যারা তদন্ত করছেন, তাদের কাছ থেকে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এর অথেনটিকেশন নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে।’
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে মামলাটি তদন্ত করে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। চার দিন পর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। দুই মাসেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি না হলে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টের আদেশে তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে তাতেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় র্যাবকে সরিয়ে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। বর্তমানে এই টাস্কফোর্সের অধীনেই মামলার তদন্ত চলছে।
এ মামলায় বিভিন্ন সময়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তারা হলেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাসার দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তানভীর রহমান খান। এর মধ্যে তানভীর রহমান খান জামিনে রয়েছেন। পলাশ রুদ্র পালও জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর পলাতক রয়েছেন। অন্য আসামিরা কারাগারে আছেন।