Image description

আড়াই শতাধিক পরিবারের কান্না আর হাহাকারের মধ্যে বছর ঘুরে আবারও এসেছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ২৫১ হতভাগ্য নাগরিক। তাদের অনেকেরই ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মতপ্রকাশ করেছে কমিশন। তবে তারা বলেছে, এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।

এই আড়াই শতাধিক মানুষের স্বজন-পরিজনের কান্না কবে থামবে, কীভাবে থামবে বা আদৌ থামবে কিনা কেউ জানে না। যাদের প্রিয় স্বজনরা কেবলই নিখোঁজ সংখ্যা হয়ে গেছেন, তাদের জীবনটা যে কেমন কাটছে, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। এমন পরিবারগুলোর অপেক্ষার যেন শেষ নেই। না পারছে শোক পালন করতে, না পারছে আশায় বুক বেঁধে প্রবোধ মানতে।

গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে গুম হিম আতঙ্ক ছড়ায়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সমালোচক কিংবা ভিন্ন মতের মানুষকে বিভিন্ন সময়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল। তাদের কারো কারো লাশ পাওয়া গেলেও অনেকের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে আজ তৃতীয়বার দিবসটি পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রোটেকশন অব অল পারসনস অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ সম্মেলনে যে আন্তর্জাতিক সনদ কার্যকর হয়, তাতে ৩০ আগস্টকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে গুম ও এর ভয়াবহ অমানবিক পরিণতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী কনভেনশনে যোগ দেয়। এটি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার। তার দুদিন আগে ২৭ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুমের ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠন করে।

দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুমকে বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এটি মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন। বাংলাদেশে গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। দিনটি পালন উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠন পৃথক পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলগুলোর নেতাকর্মী অথবা বিরোধী মতের মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে গুম করার প্রবণতা শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে ব্যাপকভাবে গুমের ঘটনা ঘটতে থাকে। তবে শুরু থেকেই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই ঘটনাগুলো অস্বীকার করে আসছিল। উল্টো ভুক্তভোগীরা ‘পাওনাদারের ভয়ে পালিয়েছেন’ বা আত্মগোপনে আছেনÑ এমন তাচ্ছিল্য ও অমর্যাদাকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের মতে, আওয়ামী লীগের আমলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের সম্ভাব্য চার ধরনের পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল। প্রথম পরিণতি ছিল ভুক্তভোগীকে তুলে নিয়ে হত্যা এবং লাশ গুম করে দেওয়া। অন্যদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো, সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে গ্রেপ্তার করানো এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অল্পসংখ্যক মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো হতো। হাসিনার পতন ও পলায়নের পর গোপন বন্দিশালাগুলো থেকে অনেকেই মুক্তি পেয়েছেন। সেই বন্দিশালাগুলো পরিদর্শন করেছেন ড. ইউনূস ও ট্রাইব্যুনালের বিচারক-প্রসিকিউটররা। এজন্য এখনো যারা ফেরেননি, তারা আর বন্দি নেইÑ এটা নিশ্চিত। তাদের বড় অংশই হত্যার শিকার হয়েছেন।

গুমকে ‘মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ’ মানবতাবিরোধী ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন গুমসংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী। গতকাল রাজধানীতে এক সিম্পোজিয়ামে তিনি বলেন, মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা শোক প্রকাশ করতে পারেন এবং দাফন-কাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু কেউ গুমের শিকার হলে পরিবার জানতেই পারে না, সে কোথায় আছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে। আশা ও হতাশার মাঝামাঝি এক অবস্থায় তারা সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক সংকট ও একঘরে হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।

তিনি আরো বলেন, আগের (আওয়ামী লীগের) সরকারের আমলে গুম ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। সে সময় চরম নৃশংসতা বিদ্যমান ছিল এবং যেখানে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কেন্দ্রে ছিল গুম। শেষ পর্যন্ত চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটে। রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায়ই ভুক্তভোগীদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করত, যাতে এসব কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ‘মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন ও দানবায়িত’ করা হয়েছিল, যাতে এসব কাজ সহজে সম্পন্ন হয়।

গুমের ঘটনায় হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবিতে বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো দাবিও অব্যাহত রয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচার সীমিত আকারে শুরু হলেও তার গতি খুবই শ্লথ। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালে গুম সংক্রান্ত তিনটি মামলা রুজু হয়েছে। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে মামলার চাপ এতটাই বেশি যে, দীর্ঘ বিরতিতে শুনানির তারিখ পড়ায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছে।

গুমের বিচারে স্থায়ী আইন নিয়েও চলছে বিতর্ক। অন্তর্বর্তী সরকার গুমের বিচারে আইন করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। বর্তমান সরকার সেটি সংসদে অনুমোদন করেনি। তবে সরকার নিজেদের মতো করে এ সংক্রান্ত একটি আইন গত বৃহস্পতিবার সংসদে উত্থাপন করেছে। মানবাধিকার ও গুমসংক্রান্ত দুই বিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্যরা। তাদের দাবি, স্বাধীন তদন্তের সুযোগ নিশ্চিত না করে বিল দুটি পাস করা হলে গুমের ঘটনায় বিচার ও জবাবদিহির পথ আরো কঠিন হবে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস গতকাল আমার দেশকে বলেছেন, সংসদে উত্থাপিত আইনে গুমের ঘটনায় স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। এর ফলে গুমের মামলাগুলো অত্যন্ত সংকটময় অবস্থায় পড়বে। আইনের এ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সংশোধন করতে হবে।

এদিকে সংসদে উত্থাপিত গুমসংক্রান্ত আইনে অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর দেওয়ার দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’। গতকাল এক অনুষ্ঠানে সংগঠনটি গুমের শিকার যেসব ব্যক্তি এখনো ফিরে আসেনি, তাদের স্ত্রী-সন্তানরা যাতে গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনাসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে যেব ব্যক্তি গুমের পর ফেরত এসেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে যেসব মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ও নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রস্তাবিত গুমসংক্রান্ত আইন সম্পর্কে বলেন, যিনি গুমের অভিযোগ করবেন, তিনি যদি সেটি প্রমাণ করতে না পারেন, তবে তার পাঁচ বছরের জেলের বিধান রাখা হয়েছে আইনে। আমাদের ইলিয়াস আলীকে এখনো পাওয়া যায়নি। যদি ইলিয়াস আলীর স্ত্রী কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে থাকেন আর তা যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাকে কি পাঁচ বছর জেলে থাকতে হবে? তাহলে প্রশ্ন হলো, তা প্রমাণ করার সুযোগ আসলে কতটুকু আছে? পুলিশ তদন্ত করে তা প্রমাণ করতে পারে না আর একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষেও তা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা যৌক্তিক (রিজনেবল) বলে মনে হয় না।

পরিবার জানে না ভাগ্যে কী ঘটেছে

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার বনানী থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়। মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান এ গুমের হোতা বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর (লুনা) তার স্বামীর ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখন পর্যন্ত জানতে পারেননি বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘গুমসংক্রান্ত কমিশন অনুসন্ধান করেছে। ট্রাইব্যুনালেও তদন্ত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, তার (ইলিয়াস আলীর) অপহরণে র‌্যাব জড়িত ছিল। র‌্যাবের যেসব সদস্য তখন দায়িত্বে ছিলেন, তারা প্রভাবশালী বাহিনীর সদস্য। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। প্রকৃত ঘটনা জানতে চাই।’

এক যুগেরও বেশি সময় আগে ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর গুম হন লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম (হিরু) এবং লাকসাম পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির (পারভেজ)। এ দুই নেতার পরিবার জানে না, তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে। তারা এখনো প্রতীক্ষায় রয়েছেন, যদি আকস্মিকভাবে বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে বা বাইরে তাদের সন্ধান মেলে। অন্ততপক্ষে বেঁচে নেই, এটা নিশ্চিত হতে পারলেও সেভাবে দোয়া করে মাগফিরাত কামনা করতে চান এলাকার জনপ্রিয় ও দক্ষ সংগঠক দুই নেতার পরিবারের সদস্যরা।

দীর্ঘ ১৪ বছর আগে ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী হানিফ এন্টারপ্রাইজের (৩৭৫০ নম্বর) গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবির নেতা ওয়ালিউল্লাহ ও আল-মোকাদ্দাস। পথে আশুলিয়ার নবীনগর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করে পুলিশ। ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের গুম করা হয়েছে বলে দাবি পরিবার ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। চব্বিশের বিপ্লবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনের পর কেটে গেছে আরো দুই বছর। কিন্তু আজও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি। এখনো তাদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার।

মোকাদ্দাসের ছোটভাই মুকাররম জারির আমার দেশকে বলেন, চব্বিশের ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর আব্দুল্লাহিল আমান আল-আযমী ও ব্যারিস্টার আরমান ফিরে আসার পর আমরাও আশা করেছিলাম, আমার ভাই ফিরে আসবেন। কিন্তু সে আশা আজও পূরণ হয়নি।

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও গুম কমিশনে অভিযোগ দিই। আমরা জানতে চেয়েছিলাম, আমার ভাই মোকাদ্দাস বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেনÑসুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য দেওয়া হোক এবং এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার করা হোক। কিন্তু দুই বছর কেটে গেলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার ফেরার অপেক্ষায় এখনো আমার বাবা-মা জায়নামাজে বসে চোখের পানি ফেলেন।

নিখোঁজ ইবি শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ ও মোকাদ্দাসের পরিবারের আইনজীবী আসাদুল্লাহ আমার দেশকে জানান, তাদের সন্ধানের জন্য গুম কমিশনে আবেদন করার পর আমাদের ডেকে বক্তব্য নেওয়া হয়। সেখান থেকে বলা হয়েছিল, আমরা আইজিপিকে থানায় মামলা নেওয়ার জন্য বলে দিচ্ছি, আপনারা মামলা করুন। সে অনুযায়ী আশুলিয়া থানায় এফআইআর নিয়ে তদন্তের জন্য উত্তরা থানায় পাঠায়। তারা আমাদের বক্তব্য শুনে স্পটে ভিজিট করে ট্রাইব্যুনালের ইনভেস্টিগেশন টিমকে জানানোর আশ্বাস দেন। সর্বশেষ দেড়-দুই মাস আগে এ কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো ভিজিট করেনি পুলিশ। কিন্তু সময়ক্ষেপণ ছাড়া তেমন কিছুই হয়নি, তারা ভিজিটও করেনি।

কমিশনের চার উদ্যোগ

নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফেরাতে চার ধরনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। এক. পুলিশকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা দিয়ে তাদের খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে। দুই. কমিশন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজতে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছে। তিন. ভারতের কারাগারে বাংলাদেশি বন্দিদের তালিকার সঙ্গে নিখোঁজ তালিকা মেলানোর চেষ্টা করেছে। চার. সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে যাদের ‘পুশইন’ করা হচ্ছে, সেখানে নিখোঁজ কেউ আছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুম হওয়া অনেকের পরিবার তখন কোনো মামলা করতে পারেনি। গণঅভ্যুত্থানের পর এ ধরনের ১৬০টি ঘটনার তালিকা পুলিশের কাছে তদন্তের জন্যে পাঠিয়েছে গুম কমিশন। সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। কিন্তু এসব অভিযোগের তদন্তে অগ্রগতি নেই বললেই চলে।

ভারতের কারাগারে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সম্পর্কে কমিশন সূত্র জানিয়েছে, ৯৯৬ জনের একটি তালিকা তারা পেয়েছেন। সেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের কারো নাম নেই। আরো তালিকার অপেক্ষায় ছিল তদন্ত কমিশন।

১৫৬৯ গুমের তদন্ত প্রতিবেদন

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের কাছে ১৮৫০টি অভিযোগ জমা হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু অভিযোগ একাধিকবার জমা হয়েছে। দ্বৈত অভিযোগ বাদ দিয়ে ১৫৬৯টির বেশি অভিযোগ আমলে নেয় কমিশন। আবার তদন্ত করতে গিয়ে নতুন অনেক ঘটনাও তাদের সামনে আসে, যেগুলোতে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত শেষ করে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে কমিশন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গুম কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়পর্বে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততায় পরিচালিত একটি কাঠামোগত অপরাধ। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়, রাজনৈতিক দমন, ভিন্নমত দমন এবং তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের আড়ালে গুমকে নিয়মিত পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়। এসব ঘটনায় আটক বা গ্রেপ্তারের কোনো আইনগত রেকর্ড রাখা হয়নি এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে তথ্য গোপন করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুমের ঘটনাগুলো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়পর্বে—বিশেষ করে নির্বাচন, সরকারবিরোধী আন্দোলন ও ছাত্র সক্রিয়তার সময় বেশি সংঘটিত হয়েছে। কমিশন এসব ঘটনাকে প্যাটার্ন বেজড এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

রিপোর্টে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অথবা কোনো মামলায় ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ হয়েছে। কমিশনের মতে, গুমের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত ফৌজদারি আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। বিশেষ করে ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, জীবনের অধিকার, ন্যায়বিচারের অধিকার পুনঃপুনঃ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ কার্যকরভাবে তদন্ত না হওয়ায় একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানো, মামলা গ্রহণে অনীহা এবং স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার অভাব বিচারহীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, গুমের ফলে শুধু ব্যক্তি নয়, পরিবার ও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। বহু পরিবার বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারিয়েছে।

প্রধান সুপারিশ

গুম বন্ধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশন সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছেÑগুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা; জাতিসংঘের এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স কনভেনশন জাতিসংঘের অনুসমর্থন; স্বাধীন ও শক্তিশালী তদন্ত ব্যবস্থা গঠন; দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করা; ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত না হলে তা আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

গুম-খুনের মামলায় বিচারের হালচাল

আওয়ামী লীগের দেড় দশকের দুঃশাসনের সময় জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন ও হত্যা সংক্রান্ত তিনটি মামলার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এর মধ্যে র‌্যাবের টিএফআই ও জিডিএফআইয়ের গোপন বন্দিশালা আয়নাঘরে গুমের দুটি মামলায় ২৩ সেনা কর্মকর্তার বিচার শুরু হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারিতে।

ডিজিএফআইয়ের কুখ্যাত বন্দিশালা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় জুলাই বিপ্লবে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তার বিচার শুরু হয় গত ১৯ জানুয়ারি। প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। এ পর্যন্ত সাতজন সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

এ মামলায় মোট ১৩ আসামির মধ্যে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিনজন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী গ্রেপ্তার রয়েছেন।

এছাড়া ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচজন মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক। ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক পলাতক রয়েছেন।

অন্যদিকে র‌্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের মামলায় সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার শুরু হয় এ বছরের ২১ জানুয়ারি। এই মামলায় ঢাকা-১৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।

এ পর্যন্ত তিনিসহ মাত্র ছয়জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। এই মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিক ও পুলিশের সাবেক বিতর্কিত আইজিপি বেনজীর আহমেদ। মামলায় ১৭ আসামির মধ্যে ১০ জন সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন—ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, কামরুল হাসান, মাহাবুব আলম ও কেএম আজাদ; কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর-প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে); লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম সুমন ও সারওয়ার বিন কাশেম।

এছাড়া সাতজন পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন—সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, এম খুরশীদ হোসেন, হারুন অর রশিদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খায়রুল ইসলাম।

এদিকে শতাধিক মানুষকে গুম-খুন ও নির্যাতনের মামলায় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছে এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি। তার বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। এই পর্যন্ত ৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। পরে এই মামলায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানকে গত ২৩ আগস্ট গ্রেপ্তার দেখায় ট্রাইব্যুনাল।

এছাড়া গুমসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত চলমান। এর মধ্যে আওয়ামী শাসনামলে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি এখনো তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। অপর আসামিরা হলেন—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম।

এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’-এর পক্ষ থেকে আওয়ামী আমলে ২৫০ জনকে গুমের অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। এই অভিযোগের তদন্তও চলমান।