জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত গলছে হিমালয়ের হিমবাহ। গত কয়েক দশকে হিমালয়ের বিভিন্ন হিমবাহে বরফের ক্ষয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে বাড়ছে হিমবাহ ধস, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও পাথর-বরফের প্রবাহের ঝুঁকি। সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ঘটনাও হিমালয়ের পরিবর্তিত জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট নেপালের রাসুয়া জেলায় প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এর ফলে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল প্রবাহ তৈরি হয়ে নিচের দিকে ধেয়ে যায়। এতে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীতে দ্রুত পানির উচ্চতা বেড়ে যায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্বাভাবিক উষ্ণতা ও দ্রুত তুষার গলার বিষয়টিও এই ধরনের ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
চার দশকে হিমালয়ের এক-চতুর্থাংশ হিমবাহ গলেছে
হিমালয়ের হিমবাহ গলার প্রবণতা নতুন নয়। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণেও বরফের ক্ষয় দ্রুততর হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত জার্নাল অব গ্লেসিওলজি এর একটি গবেষণায় ১৯৭৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত হিমালয়ের ৩৮টি হিমবাহের ভর পরিবর্তনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ওই সময়ের মধ্যে এসব হিমবাহে গড়ে প্রায় ২৩ দশমিক ৯৫ মিটার ওয়াটার ইকুইভ্যালেন্ট সমপরিমাণ বরফ ক্ষয় হয়েছে। ২০০০ সালের পর গলার গড় হার ২০০০ সালের আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর আগে স্যাটেলাইট তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এক গবেষণায়ও দেখা যায়, হিমালয়জুড়ে ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সালের তুলনায় ২০০০ থেকে ২০১৬ সময়ে হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের গড় হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গবেষকেরা এই প্রবণতার সঙ্গে আঞ্চলিক উষ্ণায়নের দৃঢ় সম্পর্ক পেয়েছেন।
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা আইসিআইএমওডি ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো ২০০০ সালের পর আগের তুলনায় দ্বিগুণ হারে বরফ হারাচ্ছে। ১৯৭৫ সালের পর কোনো কোনো এলাকায় হিমবাহের পুরুত্বে ২৭ মিটার পর্যন্ত ক্ষয় হয়েছে। এই অঞ্চলের হিমবাহের পানি এশিয়ার প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু বরফ গলছে না, অস্থিতিশীল হচ্ছে পাহাড়ও
হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রভাব শুধু পানির সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে হিমবাহের পাশাপাশি পারমাফ্রস্ট অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে জমাট থাকা মাটি ও শিলাস্তরের বরফ গলে যেতে পারে। এতে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে ভূমিধস, পাথরধস ও বরফধসের ঝুঁকি বাড়ে।
ভূতত্ত্ববিদ সিমন কক্স বলেন, ‘পারমাফ্রস্ট গলে গেলে শিলাস্তর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বড় ধরনের ধসের ক্ষেত্রে প্রবাহের গতি ঘণ্টায় ১০০ থেকে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এমন প্রবাহের পথে থাকা ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ঘটনায়ও হিমবাহের বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ নিচে নেমে এসে নদীতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ যুক্ত করে। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাড়ছে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা
হিমবাহ দ্রুত গলে গেলে হিমবাহের সামনে বা আশপাশে থাকা হ্রদগুলোতে পানির পরিমাণ বাড়তে পারে। এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে সৃষ্টি হতে পারে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (জিএলওএফ) অর্থাৎ হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বন্যা।
গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয়ের কিছু হিমবাহের সঙ্গে যুক্ত হ্রদ দ্রুত বড় হচ্ছে এবং হ্রদ-সংলগ্ন হিমবাহগুলো তুলনামূলক বেশি বরফ হারাচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যা ও অন্যান্য পাহাড়ি দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
উন্নয়নের চাপও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
হিমালয় অঞ্চলে সড়ক নির্মাণ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সুড়ঙ্গ খনন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ দ্রুত বাড়ছে। এসব কাজের ক্ষেত্রে পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনা না করা হলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হিমবাহ গলনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নির্মাণ ও বনভূমি ধ্বংসের মতো মানবিক কর্মকাণ্ডও পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি, দুর্বল পাহাড়ি ঢাল এবং গলিত বরফের পানি একসঙ্গে বড় ধরনের বন্যা ও ভূমিধস তৈরি করতে পারে।
তৃতীয় মেরু সংকটে পড়লে প্রভাব পড়বে কোটি মানুষের ওপর
হিমালয় ও হিন্দুকুশ অঞ্চলকে অনেক সময় এশিয়ার ওয়াটার টাওয়ার বলা হয়। এখানকার হিমবাহ থেকে উৎপন্ন পানি এশিয়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ নদী ব্যবস্থাকে পানি সরবরাহ করে। কৃষি, পানীয় জল, জলবিদ্যুৎ ও প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য এসব হিমবাহ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে হিমবাহের দ্রুত ক্ষয়ের প্রভাব দুই ধাপে দেখা দিতে পারে। প্রথমদিকে অতিরিক্ত বরফ গলার কারণে নদীতে পানির প্রবাহ বাড়তে পারে এবং বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের বরফের মজুত কমে গেলে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
ফলে হিমালয়ের হিমবাহ রক্ষার পাশাপাশি হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্তপারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, হিমালয়ের বরফ শুধু একটি পরিবেশগত সম্পদ নয় এটি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার পানি, কৃষি, অর্থনীতি ও মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। তথ্যসূত্র: রয়টার্স।