গণতন্ত্রের প্রাণ হলো মতের বৈচিত্র্য। এমন মন্তব্য করেছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির (পাস্ট ডিবেটিং সোসাইটি) আয়োজিত ৩য় জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
তিনি বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিতর্ক সংস্কৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সবাই একই কথা বলবে,এটি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নয়। বরং ভিন্নমত থাকবে, মতবিরোধ থাকবে, বিতর্ক থাকবে; কিন্তু সেই মতবিরোধ প্রকাশের ভাষা হবে যুক্তি, তথ্য, শালীনতা ও পারস্পরিক সম্মান। আমরা এমন একটি সময়ে বসবাস করছি, যখন তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের আধিক্য রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য, মতামত, মন্তব্য ও দাবি আমাদের সামনে আসে। কিন্তু সব তথ্য সত্য নয়, সব মতামত যুক্তিনির্ভর নয় এবং সবচেয়ে জোরে বলা কথাটিই সবচেয়ে সত্য এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই বাস্তবতায় বিতর্কের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।’
তরুণদের মধ্যে বিতর্কের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে তারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দিতে পারবে উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম বলেন, ‘আমাদের তরুণদের মধ্যে যদি এই সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে তারা শুধু বিতর্কের মঞ্চেই নয়,আগামী দিনের প্রশাসন, রাজনীতি, গবেষণা, শিক্ষা, ব্যবসা, সাংবাদিকতা ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দিতে পারবে।’
জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শুধু জেতার জন্য বিতর্ক করো না। শেখার জন্য বিতর্ক করো। প্রতিপক্ষকে হারানোর জন্য নয়, নিজের চিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য বিতর্ক করো। বিতর্কের মাধ্যমে অর্জিত যুক্তিবোধ, আত্মবিশ্বাস, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে সারাজীবন থাকে। আজকের বিতর্কের মঞ্চই আগামী দিনের নেতৃত্ব তৈরির অনুশীলন ক্ষেত্র বলেও মন্তব্য করেন তিনি।’
বিচারকদের উদ্দেশে উপাচার্য বলেন, ‘বিতার্কিকদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু তারা কী বলেছে তা নয়, কীভাবে চিন্তা করেছে, কীভাবে প্রমাণ ব্যবহার করেছে এবং প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে কীভাবে বিশ্লেষণ করেছে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। আমরা এমন বিতার্কিক চাই, যারা মঞ্চে শক্তিশালী কিন্তু আচরণে বিনয়ী; যুক্তিতে দৃঢ় কিন্তু ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’
পাবিপ্রবি উপাচার্য বলেন, ‘বিজ্ঞানমনস্কতা ও বিতর্ক সংস্কৃতির মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞান আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রমাণ খুঁজতে শেখায় এবং প্রচলিত ধারণাকেও যাচাই করতে শেখায়। আর বিতর্কও আমাদের ঠিক একই শিক্ষা দেয়। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা শুধু প্রযুক্তিবিদ বা পেশাজীবী তৈরি করতে চাই না; আমরা যুক্তিবাদী, মানবিক, দায়িত্বশীল এবং নেতৃত্বদানে সক্ষম মানুষ তৈরি করতে চাই। আজকের এই উৎসব সেই বৃহত্তর লক্ষ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
দেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো দিয়ে হবে না; বরং এমন মানুষের মাধ্যমে হবে, যারা প্রশ্ন করতে জানে, সত্য অনুসন্ধান করতে জানে, ভিন্নমতকে সম্মান করতে জানে এবং নিজের বিবেক ও যুক্তির কাছে সৎ থাকতে জানে।’
শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব ও উত্তেজনার পরিবর্তে যুক্তি ও তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গুজবকে নয়, তথ্যকে গুরুত্ব দেবে। ব্যক্তিগত আক্রমণকে নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতাকে গ্রহণ করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা তোমরা কখনো ভিন্নমতকে ভয় পাবে না। কারণ ভিন্নমত আমাদের দুর্বল করে না; বরং সঠিক যুক্তির মাধ্যমে ভিন্নমতের সঙ্গে সংলাপ আমাদের আরও শক্তিশালী করে।’
দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিতর্কের সুস্থ ও শক্তিশালী সংস্কৃতি বিস্তারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে উপাচার্য বলেন, ‘ক্যাম্পাসগুলোতে মতের সংঘাত যেন যুক্তির মাধ্যমে হয়, প্রতিযোগিতা যেন মেধার মাধ্যমে হয় এবং নেতৃত্বের বিকাশ যেন জ্ঞান ও মানবিকতার ভিত্তিতে ঘটে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান খান। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন পাস্ট ডিবেটিং সোসাইটির উপদেষ্টা ও ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুল্লাহ, মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মীর হুমায়ুন কবির। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পাস্ট ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি আবদুর রউফ। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোবাশ্বিরা গালিবা তন্বী। এ সময় আয়োজক কমিটির সদস্য, শিক্ষক, বিচারকমণ্ডলীর সদস্য, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল থেকে আগত বিতার্কিক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।