কাতার থেকে দীর্ঘ আট বছর পর দেশে ফিরেছেন মাদারীপুরের সোলেমান মিয়া। কিন্তু ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বেল্টে নিজের লাগেজটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। সামনেই চোখে পড়ে ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক’। সেখানে গিয়ে নিজের সমস্যার কথা বলতেই দায়িত্বরত কর্মীরা লাগেজের ট্র্যাকিং নম্বর নিয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সাথে যোগাযোগ করেন এবং কীভাবে লাগেজটি পরে বুঝে নিতে হবে তার পুরো প্রক্রিয়া জানিয়ে দেন।
সোলেমান মিয়ার মতো প্রতিদিন শত শত প্রবাসী বিমানবন্দরের এই ডেস্ক থেকে নানা ধরনের সেবা নিচ্ছেন। তবে শুধু লাগেজ হারানো নয়, বিদেশগামী ও প্রবাস ফেরত কর্মীদের জন্য এটি এখন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডেস্কের বহুমুখী কার্যক্রম
প্রবাসীদের সেবায় এই প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের পথচলা শুরু হয় তিন দশক আগে। ১৯৯২ সালের ১ জুলাই ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিলের প্রথম বোর্ড সভায় বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সহায়তার জন্য একটি স্থায়ী ডেস্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রথম প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ‘ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড আইন-২০১৮’ অনুযায়ী এই ডেস্কগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ছাড়াও, জনশক্তি, ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সাথে কাজ করে। ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ছয়টি ডেস্কের মাধ্যমে তিনটি শিফটে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রতি শিফটে ৩০-৩৫ জন কাজ করে। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও বিএমইটির মোট ৪৬ জন কর্মকর্তা কাজ করেন প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে। এছাড়াও ১৭৪ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরেও আছে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক।
বিমানবন্দরের এই ডেস্কগুলো মূলত প্রবাসীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস হিসেবে কাজ করে। প্রবাসে কোনো কর্মী মারা গেলে তার মরদেহ গ্রহণ করা এবং পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার পুরো দায়িত্ব পালন করে এই ডেস্ক। এছাড়া মরদেহ পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ তাৎক্ষণিকভাবে ৩৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়। শুধু মৃতদেহ নয়, অসুস্থ বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যারা দেশে ফেরেন, তাদের অ্যাম্বুলেন্সযোগে হাসপাতালে ভর্তি এবং আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।
বিদেশে যাওয়ার সময় অনেকের ভিসা বা আকামার মেয়াদ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে যারা ছুটিতে আসেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। এই বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের অফিস প্রধান শরিফুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “অনেক সময় মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরা কর্মীরা ছুটিতে দেশে আসার পর ফেরার সময় দেখা যায় তাদের ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। হয়তো একদিনের জন্য তারা ফ্লাইট ধরতে পারছেন না। আমরা তখন সরাসরি তাদের এমপ্লয়্যারের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিই এবং এমপ্লয়্যার মেয়াদ বাড়িয়ে দিলে আমরা এখান থেকে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে তাদের বোর্ডিং কার্ড পেতে সহায়তা করি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আগে প্রবাসীদের মরদেহ কার্গোর ভেতর দিয়ে মালামালের সাথে বের করা হতো, যা ছিল খুবই বিশৃঙ্খল এবং অমর্যাদাকর। এখন আমরা সম্মিলিত উদ্যোগে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছি। এখন এক জায়গা থেকেই স্বজনরা মরদেহ বুঝে নিতে পারেন, তাদের আর হয়রানি হতে হয় না।”
এছাড়াও বিদেশগামী কর্মীদের জন্য তারা বোর্ডিং কার্ড সংগ্রহ ও পূরণে সরাসরি সহায়তা করে। কোনো কর্মী বিদেশে অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরলে বা বিমানবন্দরে এসে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। এই যাতায়াতের জন্য ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকে এবং প্রয়োজনে ভাড়ায় চালিত অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও করা হয়।
প্রত্যাগত, জেলফেরত বা আউটপাস নিয়ে আসা অসহায় কর্মীদের জন্য এই ডেস্ক জরুরি খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করে থাকে। অন্যদিকে, যুদ্ধাবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে আসা-যাওয়ার পথে কোনো কর্মী মৃত্যুবরণ করলে তার মরদেহ বাড়িতে পাঠানো এবং পরিবারের জন্য আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থাও এই ডেস্ক করে থাকে। মালপত্র হারিয়ে গেলে ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ বিভাগের সাথে সমন্বয় করে তা উদ্ধারে সহায়তা এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে কর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন দেশ থেকে নির্যাতিত, নিপীড়িত বা প্রতারিত হয়ে ফেরা কর্মীদের অভিযোগ গ্রহণ করে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অসুস্থ কর্মীর সাথে আসা বিদেশি চিকিৎসক বা নার্সদের সাময়িক আবাসনের দায়িত্বও পালন করে এই দপ্তর।
সেবামূলক কাজের পাশাপাশি তারা প্রবাসীদের মাঝে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করে এবং আর্থিক সংশ্লেষ আছে এমন প্রতিটি সেবার তথ্য যেমন: সেবাগ্রহীতার নাম, পাসপোর্ট নম্বর ও বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নম্বর সুনির্দিষ্ট রেজিস্ট্রারে সংরক্ষণ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
আছে কিছু অভিযোগও
প্রবাসীদের সার্বিকভাবে সেবা দিলেও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লাও একেবারে হালকা নয়। অনেক প্রবাসী অভিযোগ করেন, ইমিগ্রেশন সংলগ্ন ডেস্কগুলোতে স্মার্ট কার্ড বা বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স যাচাই করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। সৌদি প্রবাসী আব্দুল মান্নান চরচাকে বলেন, “রক্ত পানি করা রেমিট্যান্স আমরা পাঠাই, কিন্তু এয়ারপোর্টে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এখানে লোকবল আরও বাড়ানো উচিত।”
এছাড়া একটি বড় অভিযোগ হলো প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা। ২০১৮ সালের আইন অনুযায়ী ডেস্কটি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অধীনে থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে এটি বোর্ড ও বিএমইটি উভয় দপ্তরের সমন্বয়ে চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুই দপ্তরের এই ‘দ্বৈত শাসনের’ কারণে অনেক সময় সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, যার ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ প্রবাসীদের। আবার প্রচারণার অভাবে অনেকেই জানেন না যে বিমানবন্দরের ভেতরে ফ্রি টেলিফোন বা ৩০% ডিসকাউন্টে প্রবাসীদের জন্য খাবারের সুবিধা আছে।