জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার কথা বলে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়া আনা হয়েছে। খসড়ার ধারা ৩(২)-এ কমিশনকে ‘একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান’ বলা হয়েছে; মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নে কমিশনের ‘সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে’ কাজ করার কথাও সেখানে রয়েছে।
কিন্তু খসড়ার অন্য কয়েকটি ধারা সেই স্বাধীনতার প্রশ্নেই নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ, শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ এবং অর্থ ব্যবস্থাপনার বিধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের আশঙ্কা, আইনের কিছু ধারা সংশোধন না হলে কমিশনকে স্বাধীন বলা কাগজে। বাস্তবে সরকার থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হবে।
এরই মধ্যে আইনের খসড়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আইনটি পাস হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি স্বাধীন কমিশন নয়, বরং এটি সরকারের কর্তৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং যথাযথভাবে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন করা হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে তাতে কিছু সংশোধন আনা হয়। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ওই আইন রহিত করে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ৭৪ নম্বর অধ্যাদেশ দিয়ে সেই অধ্যাদেশেও সংশোধন আনা হয়।
গত এপ্রিল মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের ওই অধ্যাদেশ সংসদ অনুমোদন না করে বাতিল করে। আইনটি নতুন করে করতে গত ১০ আগস্ট খসড়ায় অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।
কী বলছে খসড়ার মূল উদ্দেশ্য?
২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে এই খসড়ায়। আইনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
নতুন আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী, কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হবে এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নে কাজ করবে। একই ধারায় কমিশনকে স্থায়ী ধারাবাহিকতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার এই ঘোষণার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খসড়ার পরের কয়েকটি ধারায়।
ধারা ৭: কমিশনের নিয়োগে সরকারের প্রভাব থাকবে?
খসড়ার ধারা ৫ অনুযায়ী, একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনার নিয়ে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠিত হবে। পাঁচ সদস্যের মধ্যে অন্তত একজন নারী থাকবেন।
আর ধারা ৭ অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য সুপারিশ দিতে একটি বাছাই কমিটি থাকবে।
এই কমিটির সদস্য হবেন-জাতীয় সংসদের স্পিকার, (যিনি কমিটির সভাপতিও থাকবেন), আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য, বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, একজন নাগরিক প্রতিনিধি।
এই কমিটিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। তাদের মতে, স্পিকার, দুই মন্ত্রী, সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব থাকায় কমিশনের নেতৃত্ব বাছাইয়ে সরকারি প্রভাবের সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
মানবাধিকার কমিশনকে প্রায়ই সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে কাজ করতে হয়। ফলে কমিশনের নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়াই যদি সরকারের প্রভাবমুক্ত না হয়, তাহলে শুরুতেই তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
ধারা ২০: বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগে কমিশনের হাত কতটা খোলা?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি হয়েছে খসড়া আইনের ২০ ধারা নিয়ে। এই ধারায় শৃঙ্খলা বাহিনী বা তাদের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কমিশন এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীপ্রধান বা সরকারের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাইতে পারবে এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ দিতে পারবে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগে কমিশনকে স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তদন্ত শেষে শাস্তি, ক্ষতিপূরণ বা দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করতে পারত কমিশন।
নতুন খসড়ায় সেই ক্ষমতা বাদ দিয়ে কমিশনের ভূমিকা আবার সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা সরকারের কাছ থেকে প্রতিবেদন নেওয়ার মধ্যে সীমিত করা হয়েছে। টিআইবির মতে, এটি মূলত ২০০৯ সালের আইনের পুরোনো বিধানে ফিরে যাওয়া এবং প্যারিস নীতিমালার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
একটি গণমাধ্যমকে মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান বলেছেন, “এ আইনে আমাদের প্রত্যাশা পূরণে ঘাটতি থেকে যাবে। শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের এখতিয়ার না রাখায় মানবাধিকারের মৌলিক চেতনাই অগ্রাহ্য হবে।”
মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখনই, যখন অভিযোগ ওঠে রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশন যদি সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে তার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ধারা ৩০: নিজের জনবল নিয়োগেও পুরোপুরি স্বাধীন নয় কমিশন
খসড়ার ধারা ৩০-এ কমিশনকে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে কমিশন নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি যেকোনো জনবল কাঠামো তৈরি করতে পারবে না। ধারায় বলা হয়েছে, সরকার অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী কমিশন প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে। মানবাধিকার সংরক্ষণমূলক কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন বা মানবাধিকার বিষয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, কমিশনকে জনবল নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হলেও তার সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণে সরকারের ভূমিকা থেকে যাচ্ছে। স্বাধীন একটি সাংবিধানিক বা আইনগত প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার জন্য নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল নিয়োগের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সাংগঠনিক কাঠামোর জন্য সরকারের অনুমোদনের ওপর নির্ভরতা কমিশনের প্রশাসনিক স্বাধীনতার প্রশ্ন তৈরি করে।
ধারা ৩৬: অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ কার?
কমিশনের স্বাধীনতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তার আর্থিক ব্যবস্থাপনা। খসড়ার ধারা ৩৬(১) নিয়ে টিআইবি বলেছে, কমিশনের বাজেট সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল রাখা হয়েছে। আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংস্থাটি কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ এবং অনুমোদিত খাতে সেই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন না নেওয়ার বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছে।
একটি প্রতিষ্ঠান আইনি ও প্রশাসনিকভাবে স্বাধীন হলেও তার প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য যদি তাকে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে সেই স্বাধীনতা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
ধারা ৪: কার্যালয় সম্প্রসারণেও সরকারের অনুমোদন
খসড়ার ধারা ৪ অনুযায়ী, কমিশনের প্রধান কার্যালয় থাকবে ঢাকায়। ঢাকার বাইরে বা অন্য কোনো স্থানে কমিশনের কার্যালয় স্থাপন করতে হলে সরকারের পূর্বানুমোদন লাগবে।
এই বিধান প্রশাসনিকভাবে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু কমিশনকে যদি দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তদন্তের জন্য কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হয়, তখন প্রতিটি নতুন কার্যালয়ের জন্য সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন প্রশাসনিক স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলতে পারে।
ধারা ৫: প্রতিনিধিত্ব কতটা নিশ্চিত?
ধারা ৫(১)-এ পাঁচ সদস্যের কমিশনে অন্তত একজন নারী থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বাধ্যতামূলক কোনো বিধান খসড়ায় নেই। মানবাধিকার কমিশন মূলত প্রান্তিক ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের অভিযোগ নিয়েও কাজ করবে। ফলে কমিশনের গঠনেই বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
তাহলে স্বাধীনতা কোথায়?
নতুন খসড়ায় কমিশনকে কিছু বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের সুযোগ, তদন্ত কার্যক্রমে ক্ষমতা এবং বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কমিশনের স্বাধীনতা শুধু তাকে দেওয়া ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সেই ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতার ওপরও।
ধারা ৩(২) কমিশনকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান বলছে। কিন্তু ধারা ৭-এ কমিশনের নেতৃত্ব বাছাইয়ের কমিটিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরা রয়েছেন, ধারা ২০-এ শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়েছে, ধারা ৩০-এ কমিশনের জনবল কাঠামো সরকারের অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত, ধারা ৩৬-এ কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, ধারা ৪-এ কার্যালয় সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও সরকারের পূর্বানুমোদনের বিধান রাখা হয়েছে।
এই ধারাগুলো একসঙ্গে দেখলে প্রশ্ন ওঠে, একটি প্রতিষ্ঠানকে আইনে স্বাধীন বলা হলেও তার নেতৃত্ব নিয়োগ, তদন্ত, প্রশাসন ও অর্থের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর নির্ভরতা থাকলে সেই স্বাধীনতার বাস্তব অর্থ কী?
নতুন আইনের মাধ্যমে কমিশনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—এটি ইতিবাচক। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনের শক্তি শুধু আইনে লেখা ক্ষমতায় নয়, সেই ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতায়। বিশেষ করে রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারবে, সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে এমন সুপারিশ কতটা স্বাধীনভাবে করতে পারবে এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কি না—সেই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা। খসড়ার বর্তমান ধারাগুলো সংশোধন না হলে কমিশন আইনের ভাষায় ‘স্বাধীন প্রতিষ্ঠান’ হলেও, বাস্তবে তার স্বাধীনতা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার শঙ্কা থেকেই যায়।
খসড়া এই আইনটি সংসদে কণ্ঠভোটে পাস না করে আরও আলোচনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। সংস্থাটির মতে, খসড়ায় কমিশনের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার বদলে সরকারি ‘নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে’।