খাতার হিসাবে সব ঠিকঠাক। নিয়মিত পাক্ষিক প্রতিবেদনেও বড় কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়েনি। কিন্তু সরেজমিনে গুদামের মজুত যাচাই করতে গিয়ে বেরিয়ে এলো ভয়াবহ গরমিল।
মানিকগঞ্জের ঘিওর সরকারি খাদ্যগুদামে হদিস মিলছে না ১০০ টন চাল ও ২০ টন গমের। অর্থাৎ মোট ১২০ টন খাদ্যশস্যের ঘাটতি পাওয়া গেছে। উলটো সরকারি হিসাবের তুলনায় ৪১ টন ধান বেশি পাওয়া গেছে। এছাড়া হিসাবের বাইরে রয়েছে ৬ হাজার ৫০০টি খালি বস্তা।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘিওর খাদ্যগুদামে চলতি মাসের ১৫ আগস্টের নিয়মিত পাক্ষিক প্রতিবেদনে মজুত ঠিকঠাক দেখানো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে খাদ্য অধিদপ্তরের বিশেষ অডিটে বেরিয়ে আসে ১২০ টন চাল-গমের ঘাটতি এবং ৬ হাজার ৫০০ খালি বস্তার হিসাব না থাকার তথ্য। একই সঙ্গে মজুদের চেয়ে ৪১ টন ধান বেশি পাওয়ার ঘটনাও সামনে আসে।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) খাদ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (সংস্থাপন) অনির্বাণ ভদ্র স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। ওই দিন রাত ১০টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন মানিকগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আইয়ুব রায়হান।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফারহানা আক্তার এবং খাদ্য পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) শ্রী বিপুল কুমার। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন সূত্রে জানা যায়, অধিদপ্তরের গত ২৫ আগস্টের ৪৯০ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে গঠিত কমিটি ঘিওর এলএসডিতে সরেজমিন পরিদর্শন করে খাদ্যশস্যের মজুত যাচাই করে। এ সময় ১০০ টন চাল ও ২০ টন গম কম, ৪১ টন ধান বেশি এবং ৬ হাজার ৫০০টি বস্তা কম পাওয়া যায়। পরে কমিটি বিষয়টি উপপরিচালক (সংস্থাপন), প্রশাসন বিভাগকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অবহিত করে।
এরপরই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিভাগীয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের স্বার্থে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ১২ অনুযায়ী তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে খাদ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের পরিদর্শনের পর ঘিওর উপজেলা খাদ্যগুদামটি সিলগালা করা হয়। খাদ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন জেলার সব খাদ্যগুদামে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশেষ অডিট কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঢাকা থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের একটি দল ঘিওরে আসে। তারা গুদামে থাকা খাদ্যশস্যের খাতাপত্রের হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত মজুত মিলিয়ে দেখেন। তখনই বড় ধরনের এই গরমিল ধরা পড়ে।
অডিট কার্যক্রম চলমান থাকায় হিসাবের গরমিল ও তথ্যের অসংগতি যাচাইয়ের জন্য গুদামটি সাময়িকভাবে সিলগালা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ১৫ আগস্টের পাক্ষিক প্রতিবেদন নিয়ে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক প্রতি মাসে দুবার পাক্ষিক প্রতিবেদন দেন। সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট তার কাছে যে প্রতিবেদন আসে, তাতে সবকিছু ঠিকঠাক দেখানো হয়েছিল।
ঘাটতির বিষয়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফারহানা আক্তারের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
একইভাবে খাদ্যগুদামের পরিদর্শক (অফিসার ইনচার্জ) শ্রী বিপুল কুমারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আইয়ুব রায়হান বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে প্রতিটি খাদ্যগুদামে বিশেষ অডিট পরিচালনা করা হচ্ছে। অডিট চলাকালে ঘিওরের খাদ্যগুদামে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে খাদ্যগুদামটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।