সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডকে ‘স্টেট স্পনসরড মার্ডার’ বা রাষ্ট্রীয় মদদে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা।
তিনি বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আগে থেকেই র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইং অবগত ছিল। ওই সময় ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে কর্মরত এক কর্মকর্তাকেও শনাক্ত করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জোহা জানিয়েছেন, ওই কর্মকর্তা তাকে বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে তাকে বলা হয়েছিল, ‘একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে’। তবে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা তাকে নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। পরদিন সকালে তিনি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের খবর জানতে পারেন।
আগামীর সময়কে জোহা জানিয়েছেন, বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত এখনো চলছে। তদন্ত শেষ হলে এসব তথ্য ও আলামত ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হবে।
জোহা বলেছেন, জিয়াউল আহসানের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করতে গিয়ে কিছু সন্দেহজনক আলামত পাওয়া গেছে। এসব আলামত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আগে থেকেই অবগত ছিলেন।
জিয়াউল আহসানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আগে থেকে জানতেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জোহা বলেন, ‘হ্যাঁ।’
ঘটনার আগের রাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি জানিয়েছেন, শনাক্ত ওই কর্মকর্তাকে বলা হয়েছিল, ‘কিছু একটা হতে যাচ্ছে, আগামীকাল সকালে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’ তবে সেটি যে সাগর-রুনির সঙ্গে সম্পর্কিত, তা তাকে জানানো হয়নি। পরদিন সকালে তিনি জানতে পারেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাই ঘটেছে।
তদন্তে দুটি অশনাক্ত ডিএনএ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন জোহা। তার ভাষ্য, এসব ডিএনএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত। তবে এখনো সেগুলো কার, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ডিএনএগুলো বাংলাদেশি নাকি বিদেশি কোনো ব্যক্তির, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তদন্তের জটিলতা তুলে ধরে জোহা বলেছেন, ‘স্টেট স্পনসরড মার্ডারগুলো যখন হয়, সেগুলোর কোনো কূলকিনারা থাকে না। বাংলাদেশ পুলিশ এতটা অক্ষম নয় যে তারা একটা হত্যার কূলকিনারা করতে পারবে না।’
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় মদদে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড মনে করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডেফিনেটলি।’ তার ধারণা, সাগর-রুনির কাছে এমন কোনো স্পর্শকাতর তথ্য থাকতে পারে, যা তাদের হত্যার কারণ হয়ে থাকতে পারে। পরিকল্পিতভাবে তাদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
জোহা আরও জানিয়েছেন, শনাক্ত করা ওই কর্মকর্তা প্রাথমিকভাবে তাকে বলেছিলেন, হত্যাকাণ্ডটি বিডিআর বা অন্য কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে তিনি সাক্ষ্য দিতে রাজি নন। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনি কখনো এ ঘটনায় সাক্ষ্য দেবেন না।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সময় জিয়াউল আহসান র্যাবের ইন্টেলিজেন্স প্রধান ছিলেন উল্লেখ করে জোহা বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে যাওয়া তদন্ত দলের কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তারা শুধু তদন্ত করতে যায়নি, বরং আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যেও সেখানে গিয়ে থাকতে পারে। ওই দলের একজন সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক এবং রুনি এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ছিলেন।
এ ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে থানা-পুলিশ মামলাটি তদন্ত শুরু করে। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরপর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব যায় র্যাবের কাছে।
এক যুগ পর মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। গত বছরের নভেম্বরে র্যাবের কাছ থেকে মামলার নথিপত্র বুঝে নেয় পিবিআই।
এদিকে, সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১২৯তমবারের মতো পিছিয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।
গত বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মাজহারুল ইসলাম।