Image description

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই হত্যাকারী বলে আবারও দাবি করেছে মহানগর পুলিশ। দুই আসামির জবানবন্দি তুলে ধরে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিলেও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেছেন রাজশাহী সিটি পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। এতে উপস্থিত সাংবাদিকরা ক্ষোভ জানান।

বৃহস্পতিবার সকালে মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানাতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পুলিশ। সেখানে মহানগর পুলিশ কমিশনার গ্রেপ্তার আসামি সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি পড়ে শোনান। তিনি বলেন, ‘সিদ্ধার্থ বলেছেন, আগে মাঝেমধ্যে উৎসবে ইয়াবা সেবন করলেও গত এক মাসে প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে ইয়াবা সেবন করতেন। বড় ভাইয়ের বিয়ের পর প্রাইভেসির কারণে ছয়-সাত মাস বিজয় কাকুর বাসায় ঘুমাতেন এবং গত এক মাস সীমান্তদের বাসায় থাকতেন। সীমান্ত নেশা করেন না এবং হত্যাকাণ্ড সম্পর্কেও কিছু জানেন না বলে জবানবন্দিতে দাবি করেন সিদ্ধার্থ।’

পুলিশ কমিশনার জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ইয়াবা নিয়ে সীমান্তের বাসায় যান। সেখানে তিনটি ইয়াবা সেবনের পর রাত ৩টায় কামাল কাছনা এলাকার ইয়াবা কারবারি শান্তর কাছ থেকে আরও চারটি ইয়াবা কেনেন। ইয়াবার জন্য সিদ্ধার্থ মোবাইল ফোন বন্ধক রাখেন। পরে সীমান্তের বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় কুকুর থাকায় প্রাচীর টপকে দেবুদের বাড়িতে যান। সেখানকার ছাদ দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে উঠে পানির ট্যাংকের আড়ালে আবার ইয়াবা সেবন করেন। আসামিদের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করলেও ওই রাতে তারা মোট ৮টি ইয়াবা সেবন করেন।

পুলিশের ভাষ্য, ভোরে ছাদে হাঁটতে এসে গণপতি তাদের দেখে ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’ মানসম্মান বাঁচাতে তারা গণপতিকে গলায় থাকা গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে ছাদে এসে চিৎকার করলে একই গামছা দিয়ে স্ত্রীকে হত্যা করেন। একই সঙ্গে গামছা ও কবুতরের খাবারের বাক্স থেকে নেওয়া রশি দিয়ে মেয়েকে হত্যা করা হয়। এরপর ঘরে গিয়ে ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

পুলিশ জানায়, সিসি ক্যামেরা থাকার আশঙ্কায় পুরোনো প্লাস দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেয় খুনিরা। গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে এবং স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে রাখা হয়। এরপর তারা গোসল করে আরও একটি ইয়াবা সেবন করেন। হত্যাকাণ্ডকে চুরি বা ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ড্রয়ার ও জিনিসপত্র এলোমেলো করে স্বর্ণালংকার ও ১৫ হাজার টাকা নেন। জুমার নামাজের সময় দেবুদের বাড়ির ছাদ দিয়ে বেরিয়ে মুগ্ধ টাকা ও সিদ্ধার্থ স্বর্ণালংকার নিয়ে সেগুলো গোপনের চেষ্টা করেন। পরে মুগ্ধর কাছ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা নিয়ে বন্ধক রাখা ফোন ছাড়িয়ে নেন সিদ্ধার্থ। মুগ্ধও জবানবন্দিতে একই বর্ণনা দিয়েছেন। এ ছাড়া সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ অদিত কর ও নিহত আগামী চক্রবর্তী সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছে।

 

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, আগামীর সঙ্গে যার বিয়ের কথা ছিল অদিত করের। অদিত পেশায় শিক্ষার্থী। আগামীর ফোন বন্ধ পাওয়ার পর শুক্র ও শনিবার তিনি আগামীদের বাড়ির সামনে ঘোরাফেরা করেন। বাড়িতে কাউকে না পেয়ে কয়েকজন নারী প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলেন অদিত। প্রতিবেশী নারীদের কেউ কেউ অদিতকে বলেছেন, ওই পরিবারের সদস্যদের শুক্রবার থেকে তারা দেখছেন না। তারা হয়তো কোথাও চলে গেছেন। এসব কথাবার্তায় অদিত কর বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তদন্তের ধারাবাহিকতায় অদিত করের সঙ্গে পুলিশ কথা বলেছে এবং যোগাযোগ রাখছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা।

পুলিশ কমিশনার জানান, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ নমুনা পরীক্ষায় আদালতের অনুমতি নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে। হত্যার সময় চিৎকার শুনে প্রতিবেশী এক নারী পুলিশকে জানালে তার স্বামী তাকে মারধর করেন। সীমান্ত দাস ও দখিগঞ্জ শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের জবানবন্দিও আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। এসব জবানবন্দি, আলামত ও অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে তদন্ত চলছে।

ময়নাতদন্তের বরাত দিয়ে কমিশনার বলেন, চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। নিহত আগামী চক্রবর্তী ও প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ভ্যাজাইনাল সোয়াবে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, শ্বাসরোধে মৃতদেহ থেকে বীর্য ও মলমূত্র বের হতে পারে এবং চোখ কিছুটা বেরিয়ে আসতে পারে। পাওয়া বীর্য বাইরের নয়, মৃতদেহেরই বীর্য।

রংপুর মেডিকেল কলেজ মর্গে শহীদ আবু সাঈদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছিল। সে কারণে বর্তমান মামলায় সিআইডির প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত প্রাথমিক কোনো তথ্যকে কীভাবে নিশ্চিত হিসেবে বিবেচনা করা হবে? আর নিহতদের শরীরে পাওয়া বলে বীর্য যা ‘ডেড স্পার্ম’, সেটি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানোর আবেদন করা হয়েছে কি না—এ বিষয়ে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেও কোনো উত্তর দেননি পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ। তা ছাড়া মৃতদেহ থেকে বীর্য বের হওয়া এবং পাওয়া বীর্য মৃতদেহেরই—এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়ার সুযোগ না দিয়ে চলে যান তিনি।

এদিকে এ হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রংপুরের পীরগঞ্জ প্রেস ক্লাব চত্বরে বৃহস্পতিবার দুপুরে মানববন্ধন হয়েছে। এতে পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, হাজী বয়েন উদ্দিন পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় ও পীরগঞ্জ পৌর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। তারা বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।