অবসর জীবন কিংবা বার্ধক্যে সর্বস্তরের মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ঘটা করে চালু করা হয়েছিল সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা। শুরুর দিকে এ কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তিন বছর না পেরোতেই সেই আগ্রহে ভাটা পড়েছে। নতুন নিবন্ধনের গতি এখন এতটাই কম যে গত এক বছরে চারটি স্কিম মিলিয়ে নতুন গ্রাহক বেড়েছে মাত্র ৪ হাজার। চলতি বছরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তিন বছরে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থায় মোট নিবন্ধন করেছেন ৩ লাখ ৭৯ হাজার মানুষ।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সর্বজনীন পেনশনের চারটি স্কিম প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা মিলিয়ে নিবন্ধনকারী ৩ লাখ ৭৯ হাজারের কিছু বেশি। অথচ ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার ২৮০। অর্থাৎ প্রায় এক বছরে নতুন করে এতে যুক্ত হয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ব্যক্তি। এর আগে ২০২৫ সালের ২৯ জুন নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৩১২। সে হিসাবে ওই বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আড়াই মাসে প্রায় ২ হাজার নতুন গ্রাহক যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর নিবন্ধনের গতি আরও ধীর হয়ে পড়ে। ফলে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য চালু করা এ ব্যবস্থায় এখনো ৪ লাখ মানুষকেও যুক্ত করা
সম্ভব হয়নি। এ প্রসঙ্গে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সমস্যা তো রয়েছে অনেক। সেটা আপনারাও জানেন। বিশেষ করে গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সৃষ্টি হওয়া আস্থার সংকট কাটানোর চেষ্টা করছি আমরা। এজন্য অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগিরই এর বাস্তবায়ন আপনারা দেখতে পাবেন।’
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালুর পর প্রথম দিকে মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহ দেখা যায়। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, স্বকর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আলাদা স্কিম থাকায় কর্মসূচিটি নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে নিবন্ধনের গতি তুলনামূলক ভালো ছিল। একপর্যায়ে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই গতি আর ধরে রাখা যায়নি। ২০২৫ সালের জুনে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৩১২ এবং সেপ্টেম্বরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ২৮০ হলেও পরের প্রায় এক বছরে তা বেড়েছে মাত্র কয়েক হাজার। জানা গেছে, সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থার মূল লক্ষ্য দেশের বিপুল অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তিকে বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনা। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তি অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, স্বকর্মজীবীসহ এ শ্রেণির বড় একটি অংশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পেনশনব্যবস্থা নেই।
সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থার চারটি স্কিমের মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘সমতা’ স্কিমে তুলনামূলক বেশি অংশগ্রহণ রয়েছে।
এ স্কিমে মাসে ১ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। এর অর্ধেক অর্থাৎ ৫০০ টাকা দেন গ্রাহক এবং সমপরিমাণ অর্থ সরকার দেয়। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সুবিধাটি আকর্ষণীয় হলেও সামগ্রিক নিবন্ধনের গতি বাড়ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে শুধু চাঁদার পরিমাণ কম রাখাই যথেষ্ট নয়। মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ সুবিধা, তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থাও তৈরি করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানুষের হাতে বর্তমানে যে অর্থ থাকে তার বড় অংশই দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে চলে যায়। দ্রব্যমূল্যের চাপ, আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেকেই নিয়মিত পেনশন চাঁদা দিতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এজন্য নতুন করে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হতে আগ্রহ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এর পাশাপাশি রয়েছে আস্থার সংকট। একজন গ্রাহককে দীর্ঘ ১০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত নিয়মিত চাঁদা দিতে হবে। ফলে তহবিল কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, কী হারে মুনাফা পাওয়া যাবে, ভবিষ্যতে মাসিক পেনশনের পরিমাণ কত দাঁড়াবে এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সেই অর্থের প্রকৃত মূল্য কতটা থাকবে-এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহ তৈরি করা কঠিন।
এদিকে গ্রাহক বাড়াতে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু সুবিধাও চালু করেছে। চাঁদার ওপর আয়কর রেয়াত, পেনশন আয়করমুক্ত রাখা এবং ব্যাংক হিসাব না থাকলেও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে চাঁদা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট শর্তে ঋণ সুবিধার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ ছাড়া মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে চারটি স্কিমের ইসলামিক সংস্করণ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্কিমের সঙ্গে বিমাসুবিধা যুক্ত করার বিষয়েও কাজ চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবু এই পেনশনব্যবস্থায় মানুষের আস্থার সংকট কাটছে না।
জানা গেছে, সর্বজনীন পেনশনের আওতা বাড়াতে সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি (বিডিবিএল) চাঁদা সংগ্রহ শুরু করেছে। ব্যাংকটির শাখাগুলোর মাধ্যমে নিবন্ধন ও চাঁদা জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে কোনো না কোনো পেনশন স্কিমের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের। তবে বর্তমান নিবন্ধনের গতি অব্যাহত থাকলে এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।