Image description

ক্ষমতার হাতবদল হয়। বদলায় রাজনীতির রং। কিন্তু চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমীকরণ থাকে একেবারেই অপরিবর্তিত। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে পুরোনো গডফাদাররাই ভোল পাল্টে নতুন রূপে ফিরেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণেই সেখানে এখন রাজত্ব করছে ১৬৪টি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনী। বিদেশে বসেও চলছে দেশে চাঁদাবাজি। খোদ প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব গ্যাং চাঁদাবাজিকে নিয়ে গেছে এক ভয়ংকর ‘শৈল্পিক’ পর্যায়ে। সীমানা ভাগ করে চলছে দখল আর পাল্টা দখল। ইট-বালুর পাহাড় থেকে শুরু করে গার্মেন্টসের ঝুট, এমনকি ক্যাবল ব্যবসাও এখন জিম্মি এই অদৃশ্য সিন্ডিকেটের হাতে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভয়ংকর সব তথ্য।

সিএমপি কমিশনার হাসান মো শওকত আলী বলেন, ‘চাঁদাবাজিসহ সব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সিএমপির বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে তাদের গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হচ্ছে। সব অপরাধ নিয়ে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।’

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘মানুষের ঘুম হারাম করে অপরাধীরা আরামে থাকবে এ সুযোগ নেই। অপরাধপ্রবণ এলাকা এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করার কাজ শেষ। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। এরই মধ্যে কয়েকজন দুর্ধর্ষ অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বাকিদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে। সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন ব্যক্তির প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন কিছু নয়। এজন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পাল্টে গেছে অপরাধের চিত্র ও ধরন। শহর থেকে গ্রাম এখন যেন অপরাধীদের অঘোষিত অভয়ারণ্য। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অন্তত ১৬৪টি ছোটবড় সন্ত্রাসী বাহিনী। চাঁদাবাজি, মাদক কারবার থেকে শুরু করে খুন-সবকিছুতেই এসব গ্যাং প্রতিষ্ঠা করেছে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। এ বাহিনীর আয়ের মূল উৎস হলো বেপরোয়া চাঁদাবাজি। নির্দিষ্ট হারে চাঁদা না দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চলছে কথায় কথায় গুলি ও ভাঙচুর।

ভবন নির্মাণ প্রকল্প শুরু হলেই এই বাহিনীর সদস্যরা হাজির হয়ে যায়। পোশাক কারখানাগুলোর কোটি টাকার ঝুট ব্যবসা এখন পুরোপুরি এই গ্যাংগুলোর দখলে। নদী-খালের বালুমহাল ইজারা নেওয়া থেকে শুরু করে পাহাড় কাটা বা মাটি ভরাটের বিশাল বাণিজ্য চলছে এসব বাহিনীর ইশারায়। বাস, ট্রাক ও সিএনজি স্ট্যান্ডগুলো থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করছে গ্যাং সদস্যরা। এলাকাভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) এবং ক্যাবল বা ডিশ ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট সীমানা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে গ্যাং লিডারদের দিতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। 

চাঁদাবাজির পাশাপাশি এই সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর আয়ের আরেকটি বড় উৎস হলো মাদক কারবার ও ছিনতাই। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠেছে মাদকের ভয়ংকর সব স্পট, যেখানে হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা থেকে শুরু করে ভয়ংকর সব মাদকদ্রব্য। উঠতি বয়সি তরুণদের এই পথে টেনে এনে তৈরি করা হচ্ছে গ্যাংয়ের নতুন সদস্য। রাতের বেলা এমনকি দিনের আলোতেও পথচারীদের অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে এসব বাহিনীর সদস্যরা। ভয়ে সাধারণ মানুষ থানায় অভিযোগ করতেও সাহস পাচ্ছে না।

শৈল্পিক রূপে চাঁদাবাজি : চট্টগ্রামে চাঁদাবাজিকে শৈল্পিক রূপ দিয়েছে বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে শিবির সাজ্জাদ। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করে চট্টগ্রামজুড়ে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ করছেন। দুই বছর আগে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের মাধ্যমে এ বাহিনী অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করলেও সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর এ দায়িত্বভার ওঠে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন ও রায়হান আলমের কাঁধে। এর মধ্যে ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে রায়হান আলম। দুর্ধর্ষ এ বাহিনীর পুরো চট্টগ্রামজুড়েই রয়েছে প্রতাপ। এ বাহিনী তিন স্তরের অপরাধ সংঘটিত করে।

মাঠপর্যায় থেকে ব্যবসায়ী, প্রবাসী এবং সম্পদশালী ব্যক্তিদের তথ্য ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে একটি গ্রুপ। পরে বাহিনীর প্রধান সাজ্জাদ বিদেশে বসে টার্গেটকে চাঁদা দাবি করে ফোন করে। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে স্ট্রাইকিং গ্রুপ বাড়ি, অফিস কিংবা গাড়িকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ এবং ভাঙচুর করে আরেকটা গ্রুপ। মাঠ নিয়ন্ত্রণ রাখতে প্রতিপক্ষকে খুন করতে পিছপা হয় না এ বাহিনী। এরই মধ্যে এ বাহিনীর টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা, ঢাকাই আকবরসহ ছোটবড় আরও কয়েকজন সন্ত্রাসী। সাজ্জাদ বাহিনী ছাড়াও নগরজুড়ে বিচরণ রয়েছে আরও কয়েকটি সন্ত্রাসী বাহিনীর। 

এর মধ্যেও রয়েছে বিদেশে পলাতক হাবিব খান বাহিনী, শহীদুল ইসলাম বুইস্যা বাহিনী, ইসমাইল হোসেন টেম্পু বাহিনী, সাদ্দাম হোসেন ওরফে গলাকাটা বাঁচা বাহিনী, সাইফুল আলম ওরফে বার্মা সাইফুল বাহিনী। এ বাহিনীগুলো ছাড়াও এলাকাভিত্তিক দাপট রয়েছে আরও অন্তত ৬০টি সন্ত্রাসী বাহিনীর। এর মধ্যে নগরীর বায়েজিদ এলাকায় সক্রিয় রয়েছে ১০টির মতো সন্ত্রাসী বাহিনী। এ বাহিনীগুলোর মধ্যে রয়েছে শামীম আজাদ ওরফে ব্ল্যাক শামীম, মো. সবুজ ওরফে বার্মা সবুজ, লাল বাদশা, সৈয়দুল করিম, আবু বক্কর, খোরশেদ আলম, বোরহান উদ্দিন, মোহাম্মদ হাসান, মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন, বাদশা ওরফে ছোট বাদশা, মো. আলাউদ্দিন, মো. হেলাল ওরফে মাছ হেলাল, মো. নজরুল ইসলাম সোহেল, নুরে আলম সোহাগ। 

নগরীর ডবলমুরিং থানায় রয়েছে ৬টি সন্ত্রাসী বাহিনী। এ বাহিনীগুলোর নেতৃত্বে রয়েছে জিয়াউর রহমান জিয়া, বোমা বাবু ,আবদুর রহমান, রাজিবুল হাসান রানা, মেহেদী হাসান রায়হান এবং আক্তার হোসেন পলাশ। সদরঘাট থানায় রয়েছে সালাউদ্দিন বাহিনী, জয়নাল আবেদীন জিয়া বাহিনী, তানভীর উদ্দিন বাহিনী এবং নূরউদ্দিন নূর বাহিনী। চকবাজার এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাহাতউল্লাহ রবিন, এইচ আলী সুমন এবং গফুর। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকায় আবদুল্লাহ আল মামুন, জাহাঙ্গীর এবং ডলার মামুন। পাঁচলাইশ এলাকায় মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, পানি শফি, পিলখানা জাবেদ, আলাউদ্দিন আলো, মোহাম্মদ জাবেদ, সাকি এবং বড় রাসেল। 

চান্দগাঁও এলাকায় আবদুর রহমান আলফাজ, রাশেদ, নসু, আমিন এবং খোরা রুবেল। বাকলিয়া এলাকায় নবাব খান, আতুরি জাকির, মোরশেদ খান, সোবহান,  মোহাম্মদ হারুন, জাবেদুল হক, নজরুল ইসলাম সোহেল, মিজানুর রহমান মিজান এবং হাসান লিটন। বন্দর থানা এলাকায় জাহেদুল হাসান, তানভির, ইমরান, সাজ্জাদ হোসেন সাজু, মোহাম্মদ মিলন, মো. বাবু  ও আলমগীর। কোতোয়ালি এলাকায় আলী মুরতুজা, আল মামুন। হালিশহর এলাকায় কিং আলী। খুলশী এলাকায় ওয়াকিল হোসেন বগা, হেলাল হোসেন, মো. মূসা, আখতারুজ্জামান বাবু ওরফে বোম বাবু, আমির হোসেন এবং বোমা সোহাগ। পাহাড়তলি ও আকবর শাহ থানার কান কাটা পলাশ, জামাল উদ্দিন এবং আরিফুল ইসলাম আরিফ।

রাউজানে রক্তবন্যা : ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা পরিণত হয়েছে সন্ত্রাসের জনপদে। গত দুই বছরে রাউজানে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক হানাহানি কিংবা হত্যার প্রতিশোধে হত্যা হিসেবে অন্তত ২৭টি খুন হয়েছে। উপজেলাজুড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে দুই শতাধিক। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত চার শতাধিক লোক। রাউজান ছাড়াও জেলার বাকি উপজেলাগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ছোটবড় অন্তত ৬০টি সন্ত্রাসী বাহিনী।