Image description

একটি সম্পূর্ণ কল্পিত গল্প বলে যাচ্ছেন ধারাভাষ্যকার। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে হরর মিউজিক। কল্পিত গল্পটিতে অভিযোগ আছে। সেই অভিযোগ একটি সংবাদমাধ্যম ও সেটির সম্পাদকের বিরুদ্ধে। নাম উল্লেখ না করলেও ইঙ্গিতগুলো স্পষ্ট। সংবাদের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট জানা প্রতিটি মানুষই বুঝতে পারবে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এখানে।

কিন্তু অভিযোগটি কিম্বা পুরো গল্পটিই তো কল্পিত! এবং এই কল্পিত গল্পটি প্রচার করেছে একটি সংবাদমাধ্যম; সংবাদ প্রতিবেদন আকারেই!

মজার ব্যাপারটি এখানেই শেষ হয়নি। এই গাঁজাখুরি গল্পটি এবং এর সাথে আরও মনের মাধুরী মেশানো ভাষায় নানান ধরনের বক্তব্য যুক্ত করে (সাম্প্রতিক কিছু তথ্যসহ) তৈরি প্রতিবেদনকে ‘সাহসী সাংবাদিকতা’, ‘অসাধারণ প্রতিবেদন’ ‘প্রশংসনীয় নিউজ’ বা ‘কলিজা ঠাণ্ডা করা প্রতিবেদন’ ইত্যাদি শব্দ দিয়ে প্রশংসা করছেন শত শত পাঠক!

যদিও সামাজিক মাধ্যমে কিছু মানুষজন এই ধরনের কল্পিত ঘটনাকে ‘সংবাদ’ আকারে পাঠকের সামনে উপস্থাপনের সমালোচনাও করেছেন।

আলোচ্য কল্পিত গল্পসহ প্রতিবেদনটি গতকাল ২৬ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভিতে। শিরোনাম, “জ্বালা জ্বালা অন্তর জ্বালা!”।

শুধু এই প্রতিবেদন নয়, দ্য ডিসেন্ট টিভি চ্যানেলটি বিভিন্ন ইস্যুতে সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখেছে একাধিক প্রতিবেদনে এই ধরনের কল্পিত গল্প তৈরি করে সেগুলোকে ‘সংবাদ প্রতিবেদন’ আকারে উপস্থাপন করেছে টিভি চ্যানেলটি।

 

কারওয়ান বাজারের একটি নিউজরুম নিয়ে কল্পনা

এনটিভির “জ্বালা জ্বালা অন্তর জ্বালা!” শিরোনামের প্রতিবেদনে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি সংবাদমাধ্যমের নিউজরুম ঘিরে একটি গল্প কল্পনা করা হয়েছে এভাবে: 

"সকাল ১১টা ঢাকার কারওয়ান বাজারে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে নিরপেক্ষ সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ এবং সবচেয়ে সুশীল সংবাদ মাধ্যমের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চকচকে নিউজরুম সম্পাদকের ডেস্কে সকালের কফিটা জুড়িয়ে যাচ্ছে তার কপালে গভীর চিন্তার ভাজ দেশে কোন মেগা দুর্নীতি হয়নি কোন ব্যাংক লুট হয়নি কিন্তু তার টেনশন অন্য জায়গায় টেলিফোনের ওপাশ থেকে হয়তো কোন এক ভিনদেশী দূতাবাস বা সাউথ ব্লকের এর কোন বাবু কড়া ধমক দিয়ে বলেছেন কি ব্যাপার আপনাদের ওই নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির তো আমাদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন। মক্কা চুক্তিতে যাওয়ার কথা বলছেন। আপনারা কি করছেন? একটা কিছু বের করুন।"

এরপর ভিডিওটিতে দাবি করা হয় যে, ওই সম্পাদক তার সাংবাদিকদের ডেকে হুমায়ুন কবিরের কোনো খুঁত বা কেলেঙ্কারি বের করতে বলেন এবং পরবর্তীতে তারা দ্বৈত নাগরিকত্বকে হাতিয়ার হিসেবে পান।

ধারাভাষ্যকার বলেন, "সম্পাদক তার দুঃখর সঙ্গে ইনভেস্টিগেটিভ সাংবাদিকদের ডাকলেন। যেকোনো মূল্যে হুমায়ুন কবিরের একটা খুঁত বের করো। সাংবাদিকরা দিন-রাত এক করে ফেললেন। কোন দুর্নীতি পাওয়া গেল না, কোন স্ক্যান্ডাল পাওয়া গেল না। অবশেষে তারা এমন একটি ব্রহ্মাস্ত্র আবিষ্কার করলেন যা দেখে তারা আনন্দে নেচে উঠলেন। পাসপোর্ট, হুমায়ুন কবিরের দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে।"

প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয় যে, এই খবরের পর নিউজরুমের কর্তাব্যক্তিরা আত্মতুষ্টির হাসিতে মেতে ওঠেন। এনটিভি তাদের এই কাল্পনিক বর্ণনায় বলে:

"পরদিন বিশাল হেডলাইন করে খবর ছাপা হলো। নিউজ রুমের কর্তা ব্যক্তিদের চোখে মুখে এক ধরনের আত্মতৃপ্তির হাসি। তারা ভাবলেন এবার ব্যাটা ফেঁসেছে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিলেন যে দেশের মানুষ এখন আর আগের মতো বোকা নেই।"

এনটিভি নিজেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে অনির্বাচিত ব্যক্তি বা টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টা হতে পারবেন কি না, তা একটি আইনি বিতর্কের বিষয়। কিন্তু এই আইনি প্রশ্নের বস্তুনিষ্ঠ উত্তর খোঁজার বদলে তারা পুরো ইস্যুটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

তাদের দাবি, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনায় ক্ষুব্ধ হয়ে দিল্লি দেশীয় অন্যান্য সংবাদমাধ্যমকে হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামিয়েছে। 

অথচ এমন দাবির পক্ষে এনটিভি তাদের প্রতিবেদনে কোন প্রমাণই দেখাতে পারেনি। উল্টো তারা প্রশ্ন তুলেছে, আগের সরকারের মন্ত্রীদেরও তো দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল, তখন অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো চুপ ছিল কেন? 

এই যুক্তির মাধ্যমে তারা বর্তমানের একটি সংবাদ অনুসন্ধানকে (পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে) ‘দালালি’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

অনেক দর্শক এই অনুমাননির্ভর প্রতিবেদনটিকে ‘সাহসী ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন। কয়েকজন দর্শকের মন্তব্য ছিল এমন:

“ভিডিও টা কতক্ষণ থাকে জানিনা, তবে, ২৪ পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো কোনো নিউজ চ্যানেলকে দেশের স্বার্থে স্বাধীন ভাবে চোখে চোখ রেখে প্রতিবেদন করতে দেখলাম, Big respect NTV.”

“NTV তো পুরা আগুন ধরাই দিছে, স্যালুট এমন সাংবাদিকদের.”

“NTV দেশের সেরা নিউজ চ্যানেল এবং সবচেয়ে সাহসী নিউজ করে। এভাবে যদি সব নিউজ চ্যানেল করত, তাহলে কারো বাপের ক্ষমতা থাকতো না দুর্নীতি করার।”

“অসাধারণ নিউজ, প্রানবন্ত উপস্থাপন। বাংলাদেশ সঠিক পথে।”

“অসাধারণ সাংবাদিকতার উদাহরণ”।

তবে কিছু দর্শক তথ্য-প্রমাণহীন এই প্রতিবেদনের সমালোচনা করেছেন। তাদের মন্তব্যগুলো ছিল এ রকম:

“কি খবর আর কি উপস্থাপনা! কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানার গল্পগুলো এভাবেই শুরু হতো, স্কিপ রাইটার সেখান থেকে মেরে কেটে... এখনকার পাব্লিক অবশ্য এগুলো বুঝবেনা!!!”

“এটা কি নিউজ নাকি কারো গুনোগান গাওয়া হচ্ছে, NTVও আজকে এমন তেল মর্দন শুরু করে দিল।”

“হাহা এটা নিউজ নাকি চাটাচাটি?”

“স্ক্রিপটাকে অনেকে প্রতিবেদন ভেবে ভুল করছেন। সাংবিধানিক বিষয়ের কাউন্টারেও গণমাধ্যম বলতে পারে, এটা তার উদাহরণ।”

“এনটিভি যে পরিমান চাটতেছে, বুঝাই যায়।”

“কতো কোটি টাকার বিনিময়ে এই ভিডিওটা আপলোড করছো গো NTV.”

 

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে মনগড়া গল্প

কূটনৈতিক খবরের ক্ষেত্রেও এনটিভির উপস্থাপনায় এই অতি-জাতীয়তাবাদী প্রবণতা (jingoism) দেখা যায়। ১৮ আগস্ট প্রকাশিত “কেন কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছে গদি সরকার?” শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে ভারত-বাংলাদেশের জটিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে চটকদার বর্ণনায় তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদনটির শুরুতেই একটি কাল্পনিক দৃশ্যপট তৈরি করা হয়। ভারতীয় হাই কমিশনের ভেতরের সেই দৃশ্যটি এভাবে বর্ণনা করা হয়:

"ঢাকার বাড়িধারায় অবস্থিত ভারতীয় হাই কমিশনের একটি করা নিরাপত্তা বেষ্টিত সাউন্ড প্রুফ কনফারেন্স রুম। ঘরের ভেতরে এসির মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছেন ভারতের নবনিযুক্ত হাই কমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। তার সামনে রাখা একটি নীল রঙের টকেট যার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা ঢাকা দিল্লি রিলেশনস দ্য নেক্সট ফেজ। ত্রিবেদীর কপালের ভাজে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। তিনি তার হাতের পেন্সিলটি দিয়ে ডকেটের উপর বারবার টোঁকা দিচ্ছেন।”

প্রতিবেদনে এসব দৃশ্যের কোনো প্রত্যক্ষ সূত্র, সাক্ষাৎকার, নথি বা কূটনৈতিক তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি।

ভিডিওটিতে দাবি করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে ভারত মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ জন্য তারা ‘অভাবনীয় উপহারের টোপ’ তৈরি করছে।

ভারতের রাজ্যসভায় দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিংয়ের আন্তঃসীমান্ত রেল ও সড়ক যোগাযোগ বাড়ানোর একটি বক্তব্যকে সরাসরি ‘ভারতের স্বার্থরক্ষা ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা তোলার মরিয়া চেষ্টা’ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনের শেষাংশে এসেও ঠিক একই রকম একটি কাল্পনিক দৃশ্য তৈরি করা হয়। 

"নয়া দিল্লির রায়সিনা হিলসের সাউথ ব্লকে তখন এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ। ভারতের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং নীতি নির্ধারকরা একটি ম্যাপের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। ম্যাপের মাঝখানে জলজল করছে বাংলাদেশের মানচিত্র। একসময় এই মানচিত্রটিকে তারা নিজেদের হাতের মুঠোয় থাকা একটি পুতুল মনে করতেন। কিন্তু আজ সেই মানচিত্রটি তাদের কাছে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বুঝতে পারছেন তাদের হাতে থাকা দাবার ঘুঁটিগুলো একে একে অকেজো হয়ে যাচ্ছে।"

ইউটিউবের কমেন্টবক্সে ভিডিওটি সম্পর্কে দর্শকরা বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

অনেকেই ভারতকে বয়কট করার দাবি তুলে সরকারকে হুশিয়ার করে লিখেছেন:

“এনটিভির অসাধারণ শিরোনাম গুলো সত্যিই খুব অদ্ভুত লাগে, ইন্ডিয়াকে একবারে ধুয়ে দিয়ে ছাড়লো”

“ভারতের বন্ধুত্বের মানে বাংলাদেশের সর্বনাশ!”

“এটা দিল্লির চাল। যারা বুঝবে না তারা দিল্লির ফাদে পড়ে যাবে। আমাদের সরকার যেনো ভারতের পাতা ফাঁদে পা না দেন।”
“বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যেন ভারতের মাটিতে না রাখে।”

কিছু দর্শক এই প্রতিবেদনের অতি-নাটকীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এ ধরনের কয়েকটি কমেন্ট :

“সাউন্ড প্রুফ রুমের আলোচনা তুমি জানলা কেমনে”

“কী থাম্বেল দিছে ভাবা যায়। এটাকেই বলে চোখে চোখ রেখে কথা বলা। ভারতকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে বাংলাদেশ ছাড়া ভারত অচল। তবে এসব কাব্যিক ভাবে নিউজ করে নিউজের মান নষ্ট করতেছে হেতি। হেতির এমন বহুত নিউজ আছে ছড়ার মত বলে স্বপ্নের মত লাগে। তবে ভিউয়ের জন্য করে এটা স্পষ্ট বুঝা যায়। পাবলিক যা খায় তাই খাওয়াচ্ছে। এই মিডিয়া গুলার তেলবাজিতেই দেশ ধংস করতেছে। তেলবাজির কারনে আসল নিউজ গুলা করে না।”

“এগুলো মিথ্যা সংবাদ শুনেই বোঝা যাচ্ছে। ভারত বাংলাদেশের কাছে কখনো এভাবে পা ধরবে না। আপনার এগুলো সাজা গোছানো মিথ্যা কথা বলেন এগুলো বলে ভিউ পাওয়া যায় কিন্তু সঠিক তথ্যটা জানান।”

দিল্লির চাণক্যপুরী নিয়ে কাল্পনিক গল্প

২০২৫ সালের ৫ আগস্ট “দিনক্ষণ চূড়ান্ত হচ্ছে গোপনে? । Sheikh Hasina |” শিরোনামের ভিডিওটির শুরুতেই শেখ হাসিনার অবস্থান ও মানসিক অবস্থা নিয়ে একটি নাটকীয় বর্ণনা দেওয়া হয়।

"ঘড়িতে তখন ভোর সাড়ে পাঁচটা। ঢাকার আকাশে তখনো আলো ফুটেনি ভালো করে। অন্যদিকে দিল্লি ঢাকা থেকে ১৮২২ কিলোমিটার দূরে হলেও সময়ের দূরত্ব কেবল আধ ঘন্টা পেছনে। সেখানেও ভোর হওয়ার অপেক্ষা। একটি পুরনো বাড়ির জানালায় বসে একজন বয়স্ক মানুষ তাকিয়ে ছিলেন দূরের আকাশে। তিনি কিছুক্ষণ পর পর চার আঙ্গা কাপ থেকে চুমুক দিচ্ছিলেন চোখে ভারী চশমা ঠোঁটে একরকম বিষন্ন তৃপ্তি এই মানুষটি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা।"

প্রতিবেদনে 'স্লিপার সেল' বা রাজনৈতিক সংকটের মতো বিষয়গুলো কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য দিয়ে যাচাই করা হয়নি। বরং আরো একটি কাল্পনিক দৃশ্য নিয়ে আসা হয়।

"দিল্লির চাণক্যপুরীতে এখন এক চুপচাপ প্রাসাদ তার ভেতরে বুলেটপ্রুফ ঘরে বসে আছেন শেখ হাসিনা মোদির উপহারের কাচের বাটি থেকে দুধকলা খেতে খেতে হাসছেন। ক্যামেরায় চোখ রাখছেন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যে সামরিক প্রশিক্ষণ চলছে সেটা দেখতে। শেখ হাসিনা জানেন তিনি আর ফিরে যেতে পারবেন না| কিন্তু তার হাত লম্বা। বুদ্ধি পুরনো যমুনার মত ধূর্ত। আর প্রতিশোধের আগুন এখনো জ্বলছে এই জাতিকে আমি দুর্নীতি গুম ক্রসফায়ার শিখিয়েছি এবার ধ্বংস শেখাবো তিনি ফিসফিস করেন তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা কিছু বলেন না।"

প্রতিদেনেটির সমালোচনা করে অনেকেই বিভিন্ন মন্তব্য করেনে। 

“ঢাকার আকাশ, বাতাস, রাতের আধার এগুলো ছাড়া প্রতিবেদন করতে পারেন না?”

“এনটিভি কে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম নাটকের স্ক্রিপ্ট তৈরি করার জন্য। এনটিভি এখন সাংবাদিকতা বাদ দিয়ে নাটক লিখলে অনেক উন্নতি করতে পারবে।”

 

যা বললেন এনটিভির অনলাইন প্রধান

এসব প্রতিবেদনের সত্যতা এবং তথ্যসূত্র নিয়ে কথা বলতে দ্য ডিসেন্টের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় এনটিভি অনলাইনের প্রধান খন্দকার ফকরউদ্দীন জুয়েল সাথে। 

উপরিউক্ত তিনটি প্রতিবেদনের বর্ণনা কাল্পনিক কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ফকরউদ্দীন বলেন, "না, ডেফিনেটলি ফিকশন না। এটা কিছুটা রূপক বলা যায়।"

তার দাবি, এগুলো কোনো ফিকশন নয়; বরং তারা বিভিন্ন রেফারেন্স ও সোর্সের ওপর ভিত্তি করে একটি ‘এনালাইসিস’ বা বিশ্লেষণ প্রকাশ করছেন। 

সাউথ ব্লকের ধমক বা ভারতীয় হাইকমিশনের ভেতরের কথোপকথনের মতো সুনির্দিষ্ট বর্ণনাগুলো কোথা থেকে পাওয়া গেল জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, "সবই আমাদের কাছে সোর্স আছে। রেফারেন্স, বর্ণনা সবকিছু আমাদের কাছে আছে।" 

তবে সুনির্দিষ্ট কোনো নথির কথা তিনি উল্লেখ করতে পারেননি।

নিজেদের প্রমাণের বিষয়ে কথা না বলে তিনি উল্টো প্রথম আলোর একটি খবরের উদাহরণ টানেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "শেখ হাসিনা পালানোর পরে প্রথম আলোতে একটা রিপোর্ট হয়েছে, এসএসএফ এবং সেনাবাহিনী মুখোমুখি গোলাগুলির অবস্থায় চলে গেছে। প্রথম আলো কি এর প্রুফ দিতে পারছে?" 

তার যুক্তি হলো, সব খবরেরই যে সরাসরি প্রমাণ বা ফুটেজ থাকবে, এমন কোনো কথা নেই।

দিল্লির চাণক্যপুরীতে শেখ হাসিনার 'দুধকলা' খাওয়ার বর্ণনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি এটিকে 'প্রতীকী' বা রূপক বলে দাবি করেন।

তিনি বলেন, "এটা কিছুটা প্রতীকী বলা হয়। এটা তো মানুষ জানে যে এগুলো প্রতীকী।"

আর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (র) কর্মকর্তাদের উপস্থিতির বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আপনার কি মনে হয় এটা কি হয় নাই? হয়েছে তো অবশ্যই। মিডিয়াতে আসতেছে, আমরা এটা জানতেছি।

কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেদনের মূল তথ্যের চেয়ে এর অন্তর্নিহিত 'মেসেজ' বা বার্তার ওপর বেশি জোর দেন। 

নিজেকে সাংবাদিকতার ছাত্র উল্লেখ করে তিনি প্রতিবেদকের কাছে পাল্টা জানতে চান, "আমি সাংবাদিকতার স্টুডেন্ট। আপনি বলেন যে, এই নিউজের বেসিক মেসেজটা কী? এখানে তথ্য কি আপনাকে একদম টু দ্য পয়েন্টে দেওয়া হচ্ছে?"

যখন তাকে জানানো হয় যে, সাংবাদিকতার শিক্ষক এনটিভির এসব কনটেন্টকে 'ফিকশন', 'ভিউ ব্যবসা' এবং 'পলিটিক্যাল পারপাস' বলে মন্তব্য করেছেন, তখন তিনি উল্টো প্রতিবেদককেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। 

তিনি বলেন, "আপনার কাছেও যদি যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ থাকে যে এরকম ঘটনা ঘটে নাই, তাহলে আপনি লেখেন। আপনি বলেন যে, ওইখানে ওই ঘটনাটা ঘটে নাই।"

কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া নাটকীয় আবহসংগীত ও দৃশ্যপটের ব্যবহার সাংবাদিকতার নিয়মে পড়ে কি না জানতে চাইলে তিনি এটিকে 'হার্ডকোর নিউজ'-এর বদলে 'এনালাইসিস' বলে অভিহিত করে।

ফকরউদ্দীন আহমেদ বলেন, "আমরা একটা এনালাইসিস করছি। এইটাতে একটা প্যাটার্ন তৈরি করছি। কিন্তু এটা তো উপস্থাপনাটা একটু ক্যাচি হতে পারে, আকর্ষণীয় হতে পারে। সেটা তো হতেই পারে।"

যা বললেন সাংবাদিকতার শিক্ষক

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আর রাজীর মতে, এনটিভির এ ধরনের প্রতিবেদনকে সাংবাদিকতা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

তিনি বলেন, এসব প্রতিবেদনে যাচাইযোগ্য প্রমাণ বা নথির বদলে কাল্পনিক দৃশ্য ও গল্প তৈরি করা হচ্ছে “এটা সাংবাদিকতা না। এটা ফিকশন, এটা স্টোরি।”

তিনি আরও বলেন, প্রতিবেদনে সংবাদ উপস্থাপনের একটি আবহ তৈরি করা হলেও এর পেছনে কোনো প্রমাণ বা যাচাইযোগ্য নথি নেই। বিশেষ করে ভারতীয় হাইকমিশন বা সাউথ ব্লকের ভেতরের কথোপকথন, কর্মকর্তাদের মানসিক অবস্থা কিংবা বৈঠকের দৃশ্য যেভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে, সেগুলো মূলত অনুমাননির্ভর গল্প।

আর রাজী বলেন, এ ধরনের কনটেন্টের পেছনে ভিউ নির্ভর ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনাও থাকতে পারে। তিনি বলেন, “পলিটিক্স আছে, ভিউ ব্যবসা আছে, সবই আছে।” 

“এ ধরনের গল্প সাধারণত বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে যায় না” উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতিবেদন দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও দর্শকের আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।