শিঙারা-চায়ের আপ্যায়ন কিংবা দিনশেষে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার হাজিরা—এই লোভে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিলে অংশ নিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মূল নেতারা আত্মগোপনে থেকে মিছিলের লোক মেলাতে দিনমজুর ও পথশিশুদের ভাড়া করছেন। ক্যামেরা ধরে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ নেওয়া শেষ হতেই সটকে পড়েন আয়োজকরা। আর মিছিল সফলভাবে শেষ করতে পারলে মেলে অতিরিক্ত বকশিশ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত তিন মাসে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন নির্জন স্থানে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ব্যানারে একাধিক ঝটিকা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব মিছিলে ২০ থেকে ২৫ জনের বেশি মানুষের উপস্থিতি দেখা যায় না। প্রথম বা দ্বিতীয় সারির দু-তিনজন নেতাকে সামনে রেখে বাকিদের ভাড়ায় এনে দাঁড় করানো হয়। এদের মধ্যে দিনমজুর, পথশিশু, ইটভাটা শ্রমিক ও পরিবহন খাতের কর্মীরা রয়েছেন।
সম্প্রতি তথ্য সংগ্রহের সময় ডেকোরেটর ব্যবসায়ী ও রাজমিস্ত্রি পরিচয়ের তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে অনুসন্ধানে গ্রেপ্তারকৃত দুই ভাই—আপন ও দুলাল এবং তাদের সহযোগী ইমরানের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। তাদের মুঠোফোনে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি ও মিছিল আয়োজনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। একই সাথে আওয়ামী লীগ নেতাদের পাঠানো অর্থের বিবরণ মিলেছে, যা মূলত মিছিলের পেছনে খরচ করা হতো।
বিভিন্ন সূত্র ও অনুসন্ধান নিশ্চিত করেছে, ভারতের মাটিতে অবস্থান নিয়ে সাভার উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব এসব মিছিলের দিকনির্দেশনা ও সময়সূচি ঠিক করে দেন। রাজীবের পরামর্শে ভারতে অবস্থানরত পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা তানভীর আহম্মেদ তনু যোগাযোগ করেন ঢাকা জেলা উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সায়েম মোল্লা এবং সাভার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম রুবেলের সাথে। পরে সায়েম ও রুবেল সাভারের মাঠপর্যায়ে মিছিলের দায়িত্ব দেন সাভার পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনের কাছে।
আলমগীর হোসেন লোক জোগাড়ের মূল দায়িত্ব সোপর্দ করেন তার ঘনিষ্ঠ রাজমিস্ত্রি আপনের ওপর। আপনকে প্রতি মিছিলে অন্তত ১০০ জন লোক উপস্থিত করার লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হতো এবং এজন্য আলমগীর তার কাছে পাঠাতেন ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, সায়েম মোল্লা সরাসরি ইমরান হোসেনের কাছে মিছিলপ্রতি ৩০ হাজার টাকা অনুদান পাঠাতেন। ইমরানের প্রাপ্ত সেই অর্থের ভাগ পেতেন আপনের ভাই দুলাল। এরপর দুলাল মাঠপর্যায় থেকে দিনমজুর ও গলির পথশিশুদের ৫০০ টাকার লোভ দেখিয়ে ডেকে আনতেন। তবে মাথাপিছু নির্ধারিত ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার বদলে তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকা; বাকি টাকা মধ্যস্বত্বভোগীরা নিজেদের পকেটে পুরত।
টাকার লোভে আনা এসব অনভিজ্ঞ দিনমজুর ও পথশিশুদের হাতে তাড়াহুড়ো করে ব্যানার তুলে দেওয়া হতো। ব্যানার ধরে ১ থেকে ৩ মিনিট ধরে ছবি ও ভিডিও ধারণ শেষে তা দ্রুত টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের গোপন গ্রুপে বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। কাজ শেষ হওয়া মাত্রই মূল সমন্বয়ক ও সামনের সারির নেতারা স্থান ত্যাগ করতেন।
একই কায়দায় বিরুলিয়া এলাকায় মিছিলের প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ দারুসসালাম থানা আওয়ামী লীগের সদস্য সৌরভকে। তার কাছ থেকেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। লোক সরবরাহের দোহাই দিয়ে তিনি প্রথম সারির নেতাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করেছেন। কখনো কখনো নিজেও মিছিলে অংশ নিয়েছেন, যার একাধিক ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। মূলত লোক ভাড়া দেওয়াই ছিল বর্তমানে তার প্রধান ব্যবসা।
সম্প্রতি মিছিলে অংশ নেওয়া সোহাগ নামে এক কিশোর জানায়, ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা বলে তাকে মিছিলে নিয়ে যাওয়া হয়। তার মাধ্যমে আরও ১০-১২ জন কিশোর এসেছিল। পরে ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ তাকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে।
ভাড়ায় লোক এনে ঝটিকা মিছিলের বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার সদর ইউনিয়নের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল রানা মুঠোফোনে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় কিছু কিশোর ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে কারণ ছাড়াই আটক ও হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের রাজনীতিতে জড়ানো বা টাকা দিয়ে মিছিলে নেওয়ার যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও সাজানো।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পরিবারই চাইবে না তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হোক। অথচ নিরীহ ছেলেদের নির্যাতন চালিয়ে মিথ্যা অভিযোগ স্বীকার করানোর চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে বিরুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আল আমিন জানান, সৌরভ নিজেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ দারুসসালাম থানা আওয়ামী লীগের সদস্য পরিচয়ে আমিনবাজার, হেমায়েতপুর ও গাবতলী এলাকায় প্রকাশ্যে মিছিলের আয়োজক ও অর্থায়নকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি নিজে সরাসরি অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে লোক ভাড়া করতেন। বিরুলিয়া এলাকায় নতুন করে মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সংবাদের ভিত্তিতে বোট ক্লাবের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডেকোরেটর ও রাজমিস্ত্রি চক্রের মতোই সৌরভ প্রবাসে থাকা নেতাদের অর্থ ব্যবহার করে ঝটিকা মিছিলের নামে ভাড়াটেই বাণিজ্য চালাচ্ছিলেন বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইমতিয়াজ বলেন, সাম্প্রতিক মিছিলগুলোতে যারা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল এবং বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে দেশ-বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছিল, তাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা প্রত্যেকেই সাংগঠনিকভাবে নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত। তবে অনেকেই পথশিশু বা ছিন্নমূল মানুষকে টাকার লোভে মিছিলে নিয়ে আসত। নেপথ্যের মূল অর্থায়নকারীদের বিষয়ে তদন্ত চলছে; তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জাহাঙ্গীর আলম জানান, একটি গোষ্ঠী অর্থের জোগান দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে ভাড়া করে এসব কাজ করাচ্ছে। তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। মূল পরিকল্পনাকারীরা নিজেদের আড়াল করতে সহজ নিশানা হিসেবে দিনমজুর বা ছিন্নমূল মানুষকে অল্প টাকার লোভে ব্যবহার করছে। গ্রেপ্তার আসামিদের কাছ থেকে অর্থদাতাদের কিছু নাম পাওয়া গেলেও তদন্তের স্বার্থে ও অন্যদের গ্রেপ্তারের সুবিধার্থে এখন নামগুলো গোপন রাখা হচ্ছে। মূল আয়োজকদের হেফাজতে আনলেই এদের প্রকৃত উদ্দেশ্য উন্মোচিত হবে।