Image description

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনায় আটকের দিন পুলিশের ধাওয়ায় বাড়ি থেকে পালিয়ে শ্মশানে আশ্রয় নেন মুগ্ধ দাস। এসময় ওই শ্মশানের গার্ড বিদ্যুৎ দাসের কাছে চারজনকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কনফারেন্স রুমে মামলার তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‌‌‌‘বিদ্যুৎ দাস শ্মশানের গার্ড। তিনি একাই থাকেন শ্মশানে। বিদ্যুৎ দাসের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তিনিও কোর্টে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দিয়েছেন।’

পুলিশ জানায়, রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরের দিকে পুলিশ যখন মুগ্ধ দাসের বাড়িতে অভিযানে যায়, তখন পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান মুগ্ধ। পরে তাকে ধাওয়া করলে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে মাহিগঞ্জ-দখীগঞ্জ শ্মশানে গিয়ে তিনি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এসময় তিনি বিদ্যুৎ দাসকে বলেন, ‘দাদা, আমাকে একটু পানি দাও, আমাকে একটু আশ্রয় দাও‌। আমিতো গণপতি স্যারসহ চারজনকে খুন করে চলে আসছি।’

 

 

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আরও কোনো কারণ থাকতে পারে কি-না—এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘সিদ্ধার্থ দাসের বক্তব্যে, কোর্টের জবানবন্দিতে একটা কথা উঠে এসেছে—তার পূর্বপুরুষদের জমি এরা (গণপতি চক্রবর্তী) কিনেছিলেন। পূর্বপুরুষদের জমি-সম্ভবত একটু বেশি দামে কেনা হয়েছে বলে শোনা গেছে। ওই জমি কেনাটা হয়তো তারা বা তাদের বংশের শরিকরা ভালোভাবে নেননি। শরিকরা যারা আছেন তারা সবাই যে টাকা পাওয়ার কথা, সেট পাননি। আনুপাতিক হারে তাদের যে শরিকানা ছিল, এটা তারা না পাওয়ায় মনের মধ্যে একটা ক্ষোভ থাকতে পারে। সেদিকটাও আমরা দেখছি।’

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হলো, ওই মাছুয়াপাড়ার বেশিরভাগ লোক হলো দাস বংশের। আর গণপতি স্যাররা হলেন ব্রাহ্মণের জাত। তো সেখানে একটু ব্যবধান ছিল। অর্থাৎ মেলামেশা বা রাস্তাঘাটে দেখা হতো কিন্তু বাসায় যাওয়া আসাটা তেমন একটা ছিল না। এ নিয়েও তাদের মনের মধ্যে কোনো ক্ষোভ থাকতে পারে।’

 

তিনি বলেন, ‘এ বিষয়গুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। এছাড়া আরও কোনো বিষয় যদি থাকে সেটাও আমরা দেখবো। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে।’

jagonews24

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবেশী সীমান্তের বাড়িতে গিয়ে তিন পিস ইয়াবা সেবন করেন তারা। তবে সীমান্ত এসব সেবন করতেন না। এরপর মধ্যরাতে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছে জাগলে শান্ত নামের এক মাদক কারবারিকে ফোন করে আরও কয়েক পিস ইয়াবা কেনেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।

 

পরে প্রতিবেশী দেবুদের তিনতলা বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে নির্মাণাধীন দোতলার ছাদ দিয়ে পাশের গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে যান তারা। দেবুর বাড়ি ঢোকার সময় গেটে কুকুর থাকায় দেওয়াল টপকে পার হন। এরপর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতে থাকেন।

এর আগে সিদ্ধার্থ দাস গণপতি চক্রবর্তীর ওই ছাদে এক দুদিন ইয়াবা সেবন করলেও মুগ্ধ সেদিন প্রথমবারের মতো সেখানে যান বলে পুলিশকে জানিয়েছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, টিনের শব্দ পেয়ে বা যে কোনোভাবে ছাদে ওঠেন গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী। এসময় মুগ্ধ সেই গামছা দিয়ে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলা পেঁচিয়ে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর গলা ও মুখ চেপে ধরেন। প্রীতিলতাকে মারার পর দুজনে মিলে পাশে থাকা রশি ও গামছা পেঁচিয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীকেও শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

পাশের ছাদ থেকে যেন মরদেহ দেখা না যায়, সেজন্য সেখান থেকে মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির কাছে এনে রেখে দেন তারা। এরপর নিচে নেমে আসেন। এসময় ঘুম থেকে জেগে ওঠে বিছানায় বসে থাকতে দেখেন আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে। তখন প্রিয়ম সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।

বাড়িতে সিসি ক্যামেরা রয়েছে সন্দেহে নিচতলায় নেমে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন সিদ্ধার্থ। এসব করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে দুজনে সেখানে গোসল করেন। সেখানে বসে আরও এক পিস ইয়াবা সেবন করেন। খেজুর ও শসাও খান তারা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তারা ডাকাতির ঘটনা সাজান। ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করেন। পরে বাড়িতে থাকা কিছু সোনা এবং ১৫ হাজার টাকা নিয়ে জুমার নামাজের সময় ছাদ দিয়ে বেরিয়ে যান দুজন। ১৫ হাজার টাকা নেন মুগ্ধ। সন্ধ্যার দিকে প্রতিবেশী পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পাশে ওই সোনা মাটিতে পুঁতে রাখেন সিদ্ধার্থ, যা পূর্ণিমা জানতেন না। পেশায় স্বর্ণ কারিগর সিদ্ধার্থ দাস ওই বাসায় গহনা বের করে আগুন ধরিয়ে তা পরীক্ষাও করে দেখেন।

এসবের আলামত হিসেবে খেজুরের বিচি, আগুনে পোড়ানো চুরি, ইয়াবা সেবনের উপকরণ জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

এ ঘটনায় রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে দুজনকে আটক করে পুলিশ। পরে বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন। ওইদিন রাতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন ছিল। ঘটনার পর তিনি একটি ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসাও নেন।

স্থানীয়দের দেওয়া এমন তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে সিদ্ধার্থকে আটক করা হয়। পরে একটু অদূরে মুগ্ধর বাড়িতে গেলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান মুগ্ধ। এসময় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ধাওয়া করে তুতফার্ম এলাকা থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্বীকার করেন।

আলোচিত এ ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ঘটনার তদন্ত কোনো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী করছেন না; তদন্ত করছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফরেনসিক রিপোর্ট আসতে দেরি হবে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে এলেই আমরা এ বিষয়ে চূড়ান্ত একটি রূপরেখা দাঁড় করাতে পারবো বলে আশা করছি।’