Image description

একটা সময় আমরা প্রায়ই শকুন দেখতে পেতাম। কোথাও কোনো মরা প্রাণী পড়ে থাকলেই কোথা থেকে যেন শকুন উড়ে আসত। ছোটবেলায় এমন দৃশ্য অনেকেই দেখেছেন। কিন্তু এখন আর শকুন দেখা যায় না বললেই চলে। আমাদের আকাশ থেকে প্রায় ৯৯ ভাগ শকুন হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ এরা আজ মহাবিপন্ন বা প্রায় বিলুপ্ত। কেন এমন হলো জানেন?

 

এক সময় গবাদি পশুর চিকিৎসায় এক ধরনের ব্যথা নাশক ওষুধ ডাইক্লোফেনাফ এবং কেটোপ্রফেন ব্যবহার করা হত। এই ওষুধ দেওয়া মৃত পশুর মাংস খেলে শকুনের কিডনি নষ্ট হয়ে যেত। ফলে বিষক্রিয়ায় তারা মারা পড়ত। গবাদি পশুর একটি সাধারণ ওষুধের কারণে যদি শকুন বিলুপ্ত হতে পারে, তাহলে জমিতে আগাছানাশক বা কীটনাশক ব্যবহারের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে?

 

সম্প্রতি আগাছানাশক নিয়ে বেশ কিছু পত্রিকার প্রকাশিত খবরের দিকে নজর দেয়া যাক। ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে একটি পত্রিকার প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কীটনাশকের দোকান থেকে ওষুধ কিনে ধানক্ষেতে প্রয়োগের পর মো. কামরুজ্জামান নামের এক কৃষকের ১৫ শতক জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি ইউএনও ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তিনি কীটনাশক বিক্রেতা মাহবুব মিয়ার কাছ থেকে এরাক্সন ২০০ এসএল নামক কীটনাশক ক্রয় করে যেদিন ধান ক্ষেতে প্রয়োগ করেন, তারপরদিনই ধানের চারা মরতে শুরু করে। ১১ মে ২০২৬ তারিখে একটি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, রাজবাড়ির বালিয়াকান্দিতে ফসলি জমির আগাছা পরিষ্কার করতে ছিটানো ওষুধের প্রভাবে ৩২ জন কৃষকের ৮.৮৩ একর পাটক্ষেত নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

 

রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে মাটি, পানি, বাতাস দূষিত হয়। পোকামাকড় মেরে ফেলার কারণে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়। মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এর ফলে ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগ দেখা যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে এর অতিমাত্রিক ব্যবহারে।

 

 

ভুক্তভোগী কৃষকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে বহরপুর ইউনিয়নের ধুলাঘাট বিলে পেঁয়াজ ওঠানোর পর পরিত্যক্ত জমির আগাছা পরিষ্কার করতে ওষুধ স্প্রে করেন। এতে হাতিমোহন এলাকার কৃষকদের জমির পাট নষ্ট হয়ে যায়। তাদের অভিযোগ চাঁন মিয়া যখন তার জমিতে বিষ স্প্রে করছিলেন তখন তাকে নিচু করে স্প্রে করার কথা বলা হয়েছিল যাতে করে বাতাসে উড়ে না আসে। কিন্তু সে কথা শুনেনি।

 

৭৭টি দেশে নিষিদ্ধ আগাছানাশক প্যারাকোয়েটের ব্যবহার বাংলাদেশে অনেক বাড়ছে বলে একটি পত্রিকা খবর প্রকাশ করেছে। এখানে বলা হয় ২০১৩ সালে বাংলাদেশে এই আগাছানাশক আমদানি হত ৫৩ টন। ২০২৩ সালে এর ব্যবহার বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৬৯৫ টন। রিপোর্টের তথ্য মতে, প্যারাকোয়েট পানে আত্মহত্যার ঘটনা বাংলাদেশে বেড়েছে। ২০১৩ সালে প্যারাকোয়েট পানে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে একটি। ২০২৪ সালে এই ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে হয়েছে ২১২ টি। যে কৃষকেরা প্যারাকোয়েট ব্যবহার করছে তাদের মধ্যেও নানারকম রোগ দেখা যাচ্ছে। পারিকনসনসহ নানারকম ক্যান্সারের বিস্তার হচ্ছে।

 

আগাছানাশক হল এমন এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান যা দিয়ে ফসলের বা জমিতে অবাঞ্ছিত আগাছা ধ্বংস করা হয়। মূলত দুই ধরনের আগাছানাশক আছে। এক ধরনের আগাছানাশক হল স্পর্শক আগাছানাশক। এটি কেবল উদ্ভিদের যে অংশে স্প্রে করা হয় সেই অংশ নষ্ট করে। আরেক ধরনের আগাছানাশক আছে যা উদ্ভিদের পাতা বা শিকড়ের মাধ্যমে সমস্ত উদ্ভিদে ছড়িয়ে পড়বে। এতে সম্পূর্ণ গাছ মারা যাবে।

 

আমাদের দেশে পাঁচ ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এগুলো হলো কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক, পতঙ্গনাশক ও ইঁদুরনাশক। এখানে ৩৭৭টি কীটনাশক বাজারজাতকরণের জন্য নিবন্ধনকৃত। এসব কীটনাশকের সবই কম বেশি বিপদজনক। এর মধ্যে বেশি বিপদজনক রিনকর্ড, সিমবুন, সুমিসাইডিন, হেপ্টাকোর, থায়াডিন, ডিডিটি ইত্যাদি। কীটনাশক স্প্রে করে দেয়া হলে তার ৯৮ ভাগেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুর বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু প্রয়োগের ক্ষেত্রেই নয়, দূরবর্তী জলজ পরিবেশ, চারণ এলাকা ও মানব বসতি স্থানেও বাহিত হয়।

 

 

৭৭টি দেশে নিষিদ্ধ আগাছানাশক প্যারাকোয়েটের ব্যবহার বাংলাদেশে অনেক বাড়ছে বলে একটি পত্রিকা খবর প্রকাশ করেছে। এখানে বলা হয় ২০১৩ সালে বাংলাদেশে এই আগাছানাশক আমদানি হত ৫৩ টন। ২০২৩ সালে এর ব্যবহার বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৬৯৫ টন।

 

 

একটি তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর ৬০ ভাগেরও বেশি কৃষি জমি কীটনাশক দূষণের ঝুঁকিতে এবং ৩০ ভাগেরও বেশি জমি উচ্চ ঝুঁকিতে। এইসব কীটনাশক ব্যবহারের নীতিমালা থাকলেও অধিকাংশ কৃষক তা জানে না এবং মানে না। যেমন নীতিমালায় বলা আছে কীটনাশক ব্যবহারের সময় মুখে মাস্ক পড়তে হবে। বাতাসের উল্টা দিকে প্রয়োগ করা যাবে না। শরীরের কোন অংশে যেন কীটনাশক না পড়ে সে জন্য প্রতিরোধক ব্যবস্থা রাখতে হবে প্রভৃতি।

 

রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে মাটি, পানি, বাতাস দূষিত হয়। পোকামাকড় মেরে ফেলার কারণে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়। মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এর ফলে ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগ দেখা যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে এর অতিমাত্রিক ব্যবহারে। কীটনাশক পরিমিত ব্যবহার না করার কারণে এটি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ ও পরিবেশের জন্য। রাসায়নিক কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। জলাশয় ও জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে।

 

এসব কীটনাশক বৃষ্টি হলে পুকুর, নদী, নালা,খাল, বিলে জমা হয়। পানিতে ভাসমান বিভিন্ন ফাইটোপ্লাংকটন ও জুওপ্লাংকটন মেরে ফেলে। মাছের খাদ্য ঘাটতি দেখা যায়। একটি তথ্য অনুযায়ী কীটনাশকের সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ফলন নষ্ট হয়ে যেতে পারে ৭০% পর্যন্ত। এই ৭০% এর ৩০-৩৫% ফলন নষ্ট হয় আগাছার কারণে, ২০-২৫% ফলন নষ্ট হয় পোকামাকড়ের কারণে, ১৫-২০% ফলন নষ্ট হয় রোগবালাইয়ের কারণে।

 

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. গোপাল দাসের নেতৃত্বে দেশে প্রথমবারের মতো বেশি বিপজ্জনক বালাইনাশক চিহ্ণিত করেছেন একদল গবেষক। তারা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর আটটি মানদণ্ড অনুযায়ী ২৫টি বিপজ্জনক বালাইনাশক শনাক্ত করেছেন। এই ২৫টি বালাইনাশকের ১১টি কীটনাশক, ৭টি ছত্রাকনাশক, ৫টি আগাছানাশক, ২টি ইঁদুর নাশক। এই ২৫টি বালাইনাশকের মধ্যে ৯টি বিপজ্জনক কীটনাশক বেশি ব্যবহৃত হয়। এগুলো হলো- এবামেকটিন, ক্লোরপাইরিফস, প্যারাকুয়াট, গ্লাইফসেট, গ্লুফোসিনেট অ্যামোনিয়াম, কার্বেন্ডাজিম, প্রোপিকোনাজোল, জিঙ্ক ফসফাইড ও ব্রোমাডিওলন।

 

একটি তথ্য মতে কীটনাশক আমদানিকারকের সংখ্যা ছিল ২০০। এটি এখন বেড়ে ৭০০ হয়েছে। দেশে বালাইনাশক কোম্পানির সংখ্যাও খুব বেশি একটা বাড়েনি। বৈধ কীটনাশকের দাম বেড়েছে ২০ ভাগেরও বেশি। অথচ কীটনাশক নিবন্ধনের শর্ত রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে একটি শর্ত হলো সরকার অনুমোদিত কোম্পানি ছাড়া ডিলাররা বিক্রি করতে পারবেন না কোন ওষুধ। অথচ দেখা গেছে ঠিক এর উল্টো চিত্র। কে শুনে কার কথা। ডিলাররা অধিক কমিশনের লোভে এইসব নকল ওষুধ বিক্রি করে যাচ্ছে। এইসব নকল ওষুধ ব্যবহার করেও কৃষকেরা নিঃস্ব হচ্ছেন। কৃষি ও কৃষক উভয়েই মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।

 

 

কীটনাশকের সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ফলন নষ্ট হয়ে যেতে পারে ৭০% পর্যন্ত। এই ৭০% এর ৩০-৩৫% ফলন নষ্ট হয় আগাছার কারণে, ২০-২৫% ফলন নষ্ট হয় পোকামাকড়ের কারণে, ১৫-২০% ফলন নষ্ট হয় রোগবালাইয়ের কারণে।

 

 

ফসলে ক্ষতিকর জীবাণু বাড়ার কারণে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে কীটনাশকের দাম। ভেজাল কীটনাশকেও সয়লাব বাজার। পৃথিবীর ৬০ ভাগেরও বেশি কৃষি জমি কীটনাশক দূষণের ঝুঁকিতে এবং ৩০ ভাগেরও বেশি জমি উচ্চ ঝুঁকিতে। বাংলাদেশে কীটনাশকের ব্যবহার আজকের নয়। সাত দশক ধরেই এর ব্যবহার চলছে। বাংলাদেশে ২০২৩ সালে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল ৩৯ হাজার টন। ১৯৭২ সালে আমাদের দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল চার হাজার টন। ২০০৮ সালে কীটনাশকের ব্যবহার হয় ৪৯ হাজার টন। ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কীটনাশকের ব্যবহার ছিল ৩৭-৩৮ হাজার টন। ২০২৩ সালে আটটি বহুজাতিক কোম্পানি দুই হাজার সাতশ পঞ্চাশ কোটি টাকার কীটনাশক আমদানি করেছে।

 

আগাছানাশক বা কীটনাশক ব্যবহারের ফলে শুধু আগাছাই নাশ হচ্ছে না। এর ফলে মৌমাছিসহ অন্যান্য কীটপতঙ্গ যারা ফুলে ফুলে ঘুরে ঘুরে মধু আহরণ করে আর পরাগায়নে সহায়তা করে সেসবকে হুমকির মুখে ফেলছে। আগাছানাশক ধুয়ে পানিতে মিশছে। এতে জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ছে। পুঁটি, টাকিসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ কমে যাচ্ছে। ব্যাঙ ফসলের ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে আমাদের উপকার করত, এসব বিলুপ্ত হচ্ছে। কীটনাশকের বিষক্রিয়া পোকামাকড়ে থাকার কারণে শামুকখোল, বকসহ নানা পাখিও হুমকিতে পড়ছে।

 

বালাইনাশক অর্থ এমন কোনো দ্রব্য বা দ্রব্যের মিশ্রণ যা কোনো পোকা, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, কৃমি(নেমাটোড), ভাইরাস, আগাছা, ইঁদুরজাতীয় প্রাণী বা অন্যান্য উদ্ভিদ বা কীটপতঙ্গের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভবে প্রতিরোধ, ধ্বংস, প্রশমন, বিতাড়ন বা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন ২০১৮ নামের একটি আইন আছে। এই আইনের ২ ধারায় বালাইনাশকের সংজ্ঞা দেওয়া আছে। এতে ৮ ধারায় বলা আছে বালাইনাশকটি আগাছা ব্যতীত অন্যান্য উদ্ভিদ, মানুষ বা প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলে এর নিবন্ধন বাতিল হবে। এই অবস্থায় সরকারের আশু নজরদারি কাম্য।

 

  • ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশ বিষয়ক লেখক