Image description

লোডশেডিংয়ে দেশের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। প্রচণ্ড গরম ও গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশ জুড়ে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত। রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ ঘাটতি এর মূল কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংকট কাটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা। বিদ্যুতের যখন এই দশা, তখন ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বৈদ্যুতিক বাস কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে সরকারের এমন সিদ্ধান্তে আশ্চর্য হয়েছেন অনেকে; প্রশ্ন তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। শুধু তা-ই নয়, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া এসব বাস কেনার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়েও হচ্ছে সমালোচনা।

এ মুহূর্তে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎ খাতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘সরকার বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করতে পারবে কি না আমি সন্দিহান। এটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদার সঙ্গে জোগান ঠিক রাখাই কঠিন। বিদ্যুৎ-চালিত বাসে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নাজুক হবে। তবে সরকার যদি মনে করে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করে বাস চালাতে পারবে, তাহলে ঠিক আছে।’

জানা গেছে, জরুরি প্রয়োজনের যুক্তিতে প্রথম ধাপে ১০০টি ই-বাস সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কেনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে (বিএমটিএফ)। দুটি প্রতিষ্ঠান ৫০টি করে বাস সরবরাহ করবে। কিন্তু তারা নিজেরা বাস তৈরি করবে না; বিদেশ, বিশেষ করে চীন থেকে কিনে এনে সরবরাহ করার সম্ভাবনাই বেশি।

সরকার বলছে, উন্মুক্ত দরপত্রে গেলে বাস কিনতে প্রায় এক বছর লাগতে পারে, আর সরাসরি ক্রয়ে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আনা সম্ভব। দ্রুত ই-বাস চালুর এই তাগিদই তাই প্রকল্পটির মূল যুক্তি। কিন্তু বাসের দাম কত, কোন নির্মাতার প্রযুক্তি নেওয়া হবে, কীভাবে মূল্য ও মান যাচাই করা হবে এবং বাস আসার আগেই চার্জিং, ডিপো ও রক্ষণাবেক্ষণের অবকাঠামো প্রস্তুত হবে কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আইনি বৈধতা এবং ৮০০ কোটি টাকার অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (আরবান ট্রান্সপোর্ট অনুবিভাগ) মো. আনিসুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, উন্মুক্ত দরপত্রে গেলে বাস কিনতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আনার আশা করা হচ্ছে।

তবে প্রতিটি বাসের দাম কত হবে— সে তথ্য তার জানা নেই বলে জানালেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বললেন, অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও নিজেদের বাস চীনে তৈরি করে এবং ই-বাস প্রযুক্তিতে চীন এগিয়ে রয়েছে। চার্জিং ও অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে বিআরটিসি কাজ করছে।

কিন্তু বাস দ্রুত চলে এলেও সেগুলো চালানোর অবকাঠামো সময়মতো তৈরি হবে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে। বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা আগামীর সময়কে বলেছেন, বাস কবে আসবে, সেটি দেখতে হবে। এখন পর্যন্ত ডিপোসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত হয়নি। ডিসেম্বরের মধ্যে প্রস্তুতি শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

বাস কেনার চেয়ে বড় প্রশ্ন চার্জিং ই-বাস কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুরু হবে রাস্তায় নামানোর সময়। ডিজেল বাসের জন্য যেমন ফিলিং স্টেশন প্রয়োজন, ই-বাসের জন্য দরকার উচ্চক্ষমতার চার্জিং ব্যবস্থা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ।

ঢাকা শহরের বাস্তবতায় একটি বাস দিনে গড়ে ১০০ কিলোমিটার চলবে ধরে হিসাব করলে বিদ্যুতের চাহিদার একটি ধারণা পাওয়া যায়। ঢাকার গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় প্রতি কিলোমিটারে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ হলে একটি বাসে দৈনিক প্রয়োজন হবে ১৫০-২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ।

গড়ে ১৭৫ ইউনিট ধরলে ১০০ বাসে প্রতিদিন লাগবে প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ ইউনিট এবং মাসে প্রায় ৫ লাখ ২৫ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ।

তবে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেয়েও বড় বিষয় হলো, এই বিদ্যুৎ কখন এবং কোথায় লাগবে। দিনশেষে যদি অধিকাংশ বাস একই সময়ে একই ডিপোতে ফিরে চার্জে বসে, তাহলে স্থানীয় বিতরণব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

এজন্য ডিপোতে উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎ-সংযোগ, সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার, উচ্চক্ষমতার ডিসি চার্জার এবং স্মার্ট চার্জিং ব্যবস্থা দরকার হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন বিশেষায়িত ওয়ার্কশপ, প্রশিক্ষিত কারিগরি জনবল এবং বৈদ্যুতিক ও অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা।

দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গ্রীষ্মে চাহিদা গড়ে ১৬ থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে সবসময় চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করা যায় না। বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ফলে ই-বাসের চার্জিংকে শুধু অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার হিসেবে না দেখে নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট এলাকায় বাড়তি চাহিদা হিসেবে পরিকল্পনা করতে হবে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে ১০০টি বাস জাতীয় পর্যায়ে বড় চাপ সৃষ্টি করবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করা না গেলে সমস্যা হতে পারে। তার মতে, চার্জিং স্টেশনগুলোর সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।

২০০ বাসব্যয় ৮০০ কোটি টাকাদেশের বিভিন্ন শহরে পর্যায়ক্রমে মোট ১ হাজার ৪১২টি ই-বাস চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এজন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) আলাদা প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

প্রথম ধাপে দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০টি বাস কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর একটি প্রকল্পে ৪৫ আসনের ১০০টি ই-বাস, চার্জিং স্টেশন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর জন্য ৪০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়। অন্য প্রকল্পে নারীদের জন্য ২৮ থেকে ৩২ আসনের ১০০টি ই-মিনিবাস বা কোস্টার, চার্জিং স্টেশন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর জন্য আরও ৪০০ কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

প্রথমে অনুদান হিসাবে অর্থ চাওয়া হলেও অর্থ বিভাগ পরে ৮০০ কোটি টাকা ঋণ হিসাবে দিতে সম্মতি দেয়। এই অর্থেই ২০০টি ইলেকট্রিক বাস এবং প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা। এর মধ্যে প্রথম ১০০ বাস কেনার দায়িত্ব এখন প্রগতি ও বিএমটিএফের হাতে।

দামি বাসের পুরনো ব্যর্থতার ছায়ানতুন ই-বাসের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় প্রশ্ন, বাসগুলো কতদিন সচল রাখা যাবে? এ প্রশ্নের কারণ বিআরটিসির অতীত অভিজ্ঞতা। সংস্থাটির বহরে বিভিন্ন সময় যুক্ত হওয়া অনেক দামি বাস নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পূর্ণ হওয়ার আগেই অচল হয়ে গেছে।

ই-বাসের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব বাসে শুধু প্রচলিত যান্ত্রিক ত্রুটি সামলালেই হবে না। ব্যাটারি, ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, বৈদ্যুতিক মোটর, ইনভার্টার এবং উচ্চ ভোল্টেজ সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ দক্ষতা ও আধুনিক সরঞ্জাম দরকার।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামসুল হক মনে করছেন, অতীতে আমদানি করা অধিকাংশ বাস নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পর্যন্ত টেকেনি। নতুন করে বড় বহর যুক্ত করার আগে পুরনো প্রকল্পগুলো কেন ব্যর্থ হয়েছে, তা নিরীক্ষা করা জরুরি। বিআরটিসির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা রয়েছে কি না, তা আগে যাচাই করা উচিত। প্রয়োজনে বাসগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দিয়েও গণপরিবহন সেবায় যুক্ত করার সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে এবার ভিন্নভাবে প্রস্তুতির কথা বলছে বিআরটিসি। সংস্থাটির দাবি, ই-বাসের ডিপো, চার্জিং স্টেশন এবং রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা নিয়ে বুয়েটের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে।