Image description

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে একটি জাহাজের মইয়ের দড়ি ছিঁড়ে এক পাইলট পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। আর এ ঘটনায় সৃষ্টি হয়েছে অনেকটা ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’ বের হওয়ার মতো পরিস্থিতি। ঘটনার তদন্তে নেমে বিদেশি কনটেইনার জাহাজ ‘বক্স এনডেভার’-এর বেহাল ও বিপজ্জনক চিত্রের প্রমাণ পেয়েছে নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর। শনাক্ত হয়েছে জাহাজের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা অকেজো থাকাসহ মোট ১৫টি মারাত্মক কারিগরি ও পরিচালন ত্রুটি।

আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা নীতিমালার চরম লঙ্ঘনের দায়ে জাহাজটিকে বহির্নোঙরের ‘চার্লি’ এলাকায় আটক রাখা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে চট্টগ্রাম ছাড়ার অনুমতি সনদ এবং স্থগিত হয়েছে ১ হাজার ১০০ একক রপ্তানি কনটেইনার নিয়ে মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাংগামী যাত্রাও।

গত শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রপ্তানি পণ্য বোঝাই করে যাত্রা শুরুর সময় বহির্নোঙরে ঘটে এ দুর্ঘটনা। বন্দরের জ্যেষ্ঠ পাইলট ক্যাপ্টেন রবিউজ্জামান জাহাজটিকে নিরাপদে বহির্নোঙরে পৌঁছে দেওয়ার পর মই বেয়ে নিচে নামার মুহূর্তে ম্যানরোপ বা মইয়ের দুই পাশে থাকা দড়ি ছিঁড়ে নিচে পড়ে যান। নিচে থাকা বোটে আছড়ে পড়ায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলেও ডান হাত ও পিঠে মারাত্মক জখম হন তিনি। আহত পাইলট চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

‘বক্স এনডেভার’ জাহাজের শিপিং এজেন্ট কন্টিনেন্টাল ট্রেডার্সের (বিডি) মহাব্যবস্থাপক রফিক উদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘আমরা তদন্ত কমিটির রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি। ফলাফল পর্যবক্ষেণ করে জাহাজ পরিচালনাকারী সেন্ট্রাল অফিসকে জানাব। তারা যেভাবে বলবে সেভাবেই হবে পরবর্তী পদক্ষেপ।’

দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রাম বন্দর ও নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। সদস্যরা গতকাল শনিবার সকালে বহির্নোঙরে চার্লি অ্যাংকরেজে নোঙর করে রাখা জাহাজে সরেজমিনে তদন্ত করেন। নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের শিপ সার্ভেয়ার মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমানের পরিদর্শনে জাহাজটির আন্তর্জাতিক সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের ত্রুটি পান। পাইলট নামার সময় ম্যানরোপ ছিঁড়ে যাওয়াই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলেও মনে করেছে কমিটি। কারণ ওই দড়ি ছিল নিম্নমানের এবং তা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো না।

জাহাজে নাবিকদের থাকার জায়গার জরুরি ফায়ার হাইড্রেন্ট ভালভ পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় পেয়েছে তদন্ত কমিটি। ইঞ্জিন রুমের পোর্ট ও স্টারবোর্ড— উভয় পাশের ভেন্টিলেশন ফ্ল্যাপ ঠিকমতো বন্ধ হচ্ছিল না। এই ত্রুটির কারণে সাগরে চলমান অবস্থায় জাহাজে আগুন লাগলে বাতাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যেত না। এতে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।

এছাড়া জাহাজে হেভি ফুয়েল অয়েল সেপারেটর ট্রের ওপর বিপজ্জনকভাবে তেল জমে ছিল। ফুয়েল ট্রান্সফার পাম্প, স্লাজ ট্যাংক এবং কুলিং পাম্পের গ্ল্যান্ড থেকে নিয়মিত তেল চুইয়ে পড়ার স্পষ্ট প্রমাণ পায় কমিটি। এছাড়া ইনসিনারেটর সেটলিং ট্যাংকের ট্রেতে তেল জমা এবং ফানেলে তেলের ঘন আস্তরণও পাওয়া যায়।

তদন্তে জাহাজের ড্রাফট মার্কগুলো অস্পষ্ট ছিল অর্থ্যাৎ জাহাজে পণ্য বোঝাই থাকলে কী পরিমাণ ডুবে থাকতো তার চিহ্ন ছিল না। জাহাজের মাস্টার স্টেশনের মার্কিংয়ের সঙ্গে নাবিকদের তালিকার মিল ছিল না বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সবচেয়ে অবাক করার মতো যে বিষয়টি দেখা গেছে সেটি হলো ইঞ্জিন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কর্মীরা জাহাজের কার্গো হোল্ড স্মোক ডিটেকশন সিস্টেম ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালনার বিষয়ে অবগতই ছিলেন না। কমিটি প্রশ্ন তুলে বলেছে, জাহাজটি ‘লয়েডস রেজিস্ট্রার’ ক্লাসের মতো আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংস্থার সনদধারী এবং আধুনিক মানের হলেও, এর ফিলিপাইন বা বিদেশি ক্রুরা প্রাথমিক স্মোক ডিটেকশন সিস্টেম পরিচালনায় কেন দক্ষ নন।

দেশি-বিদেশি কন্টেইনার জাহাজ চালান এমন একজন ক্যাপ্টেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘যে জাহাজের ফায়ার হাইড্রেন্ট অচল, ক্রুরা অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা চালাতে পারেন না এবং ইঞ্জিন রুমে তেল চুইয়ে পড়ে, সেই জাহাজে গভীর সাগরে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির শিকার হতে পারে।’

এর আগে ২০২৫ সালে নভেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এসে ‘এএস সিসিলিয়া’ জাহাজে ম্যানরোপ ছিঁড়ে আহত হয়েছিলেন এক বন্দর পাইলট। এরপর দীর্ঘদিন তিনি ট্রমায় ছিলেন। তখন অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় জাহাজকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। তিনদিন আটকের পর জরিমানা পরিশোধ করে জাহাজ বন্দর ছেড়েছিল। এখন এই অভিযোগের সঙ্গে জাহাজ ব্যবস্থাপনার অনেকগুলো অনিয়ম মিলেছে। অভিযোগ উঠেছে, তদন্তে এসব তথ্য উঠে আসার পরও একটি চক্র বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে দ্রুত জাহাজটি ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি সংশ্লিষ্ট কেউ।

নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রধান ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বললেন, ‘সিসিলিয়া জাহাজকে আমিই তিনদিন আটক রেখেছিলাম। ইউরোপিয়ান জাহাজ মালিক এসে জরিমানা পরিশোধ করে তদন্তে প্রতিটি ত্রুটি শতভাগ সংশোধন এবং পুনঃপরিদর্শনে ছাড়পত্র নিয়েই বন্দর জলসীমা ছেড়েছিল। এখনো একই নিয়ম অনুসরণ করা ছাড়া জাহাজ বহির্নোঙর ছাড়ার অনুমতি পাবে না।’