Image description

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিএনপি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে অঙ্গীকার করলেও এখন তারা কোন পথে হাঁটবে তা স্পষ্ট নয়। দলটির যে ৩১ দফা, সেখানেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ঘোষণা নেই। আর নেতারা বলছেন, এখানে সুযোগ সীমিত।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফেরার পর থেকে রাষ্ট্রপতিকে প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ীই কাজ করতে হয়। এমনকি তার বক্তব্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকার লিখে দেয়। তবে সংবিধানের ধারাগুলো প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়ায় এ নিয়ে সমালোচনা আছে। রাষ্ট্রপতি অবশ্য সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান, যদিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়ে আলোচনা হয় জাতীয় ঐক্যমত কমিশনে। সেখানে বিএনপির প্রতিনিধি বর্তমানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিষয়ে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ সংশোধনের কথা বলেছিলেন। তবে সেটি সুনির্দিষ্ট নয়। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে কিছু বলা নেই। তাদের ৩১ দফাতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথাই কেবল বলা আছে।

সংবিধান সংশোধনে বিএনপি যে বিশেষ কমিটি গঠন করেছে, তাবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধী জোট অংশ নেয়নি। বিরোধীদের অংশগ্রহণ ছাড়াই বিশেষ কমিটির যে সভা হয়েছে, সেখানে এ বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে টাইমস অব বাংলাদেশের। তারা সবাই বলেছেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো সুযোগ তারা দেখেন না।
একজন নেতা বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সম্মানিত ব্যক্তি, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী। তার জীবনে চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। সেক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন করে তার ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কি?’
আরেক নেতা বলেন, ‘অতীতে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা সফল হয়নি বলেই তো এই পরিবর্তন। এখন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মতেই রাষ্ট্রপতির কাজ করা উচিত।’

রাষ্ট্রপতি কী করতে পারেন?

সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে, কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ছাড়া রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করবেন।

তবে প্রধানমন্ত্রী কী পরামর্শ দিয়েছেন বা আদৌ কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কারণ, একই অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কিনা এবং দিলে কী পরামর্শ দিয়েছেন, কোনো আদালত সে সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করতে পারবেন না।

৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বলা আছে, যে সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন।

সংসদীয় সরকারে ফেরার পর ১৯৯১ সালের প্রথম নির্বাচনে বিএনপি ১৪০ আসনে জিতেছিল। সে সময়ের বিরোধী দল আওয়ামী লীগ পায় ৮৮ আসন। ১৮ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামী আগেই বিএনপিকে সমর্থন জানানোর পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকারের স্থায়ীত্ব নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। এরপর প্রতিটি নির্বাচনেই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ১৫১টির বেশি আসন পায়।

৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফায় বলা আছে, প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি দ্বারা নিযুক্ত হবেন এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারককে নিয়োগ দেবেন। তবে বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতিরা সরকারের ইচ্ছার বাইরে যেতে পারেন কি না, সেই প্রশ্ন সব সময় ছিল।

রাষ্ট্রপতির আরও একটি ক্ষমতা আছে, যার প্রয়োগ দুইবার হয়েছিল। সংবিধানের ৮০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদে পাস হওয়া বিল পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি তাতে সম্মতি দেবেন অথবা অর্থবিল ছাড়া অন্য কোনো বিল পুনর্বিবেচনা বা সংশোধনের অনুরোধ জানিয়ে সংসদে ফেরত পাঠাতে পারবেন।

১৫ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যবস্থা না নিলে ধরে নেওয়া হবে যে তিনি বিলটিতে সম্মতি দিয়েছেন। এই বিল ফেরত পাঠানোর ঘটনা দুইবার ঘটেছিল। দুইবারই তা আটকে যায়।

১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ ‘জননিরাপত্তা বিল’ সংসদে ফেরত পাঠান। বিলে যেকোনো অভিযুক্তকে জামিন না দেওয়া এবং কোনো সুনির্দিষ্ট পরোয়ানা বা কারণ ছাড়া ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ সন্দেহে ৯০ দিন পর্যন্ত আটকে রাখার মতো কিছু ধারা ছিল। সে সময় সমলোচনা ছিল, এই আইনের কারণে সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার সুযোগ পাবে।

রাষ্ট্রপতি ফেরত পাঠানোর পর বিলটির সংশোধন করে ২০০০ সালে জননিরাপত্তা (বিশেষ বিধান) আইন পাস হয়। ২০০২ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার আইনটি বাতিল করে।

সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২০ নভেম্বর বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিলে সই না করে ফেরত পাঠান। বিলটির একটি নির্দিষ্ট ধারায় শ্রমিকদের বেআইনি ধর্মঘটের সাজা বাড়ানোর প্রস্তাব ছিল। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা তৈরি করতে পারে আশঙ্কায় ফেরত পাঠানোর পর সংসদ আর আগায়নি।

ভারত-পাকিস্তানসহ অন্য দেশে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা

ভারতের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে বিল ফেরত পাঠানোর কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়নি। তিনি অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান না করে বিল অনির্দিষ্টকালের জন্য রেখে দিতে পারেন। একে ‘পকেট ভেটো’ বলা হয়।

১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধী সরকারের পাস করা ইন্ডিয়ান পোস্ট অফিস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিলে সই না করে পকেট ভেটো প্রয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং। এই বিলের একটি ধারায় সরকারকে নাগরিকদের যেকোনো চিঠি বা পার্সেল মাঝপথে আটকে খুলে দেখার এবং সেন্সর করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

১৯৮৭ সালে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত বিলটি ঝুলে থাকে। পরের রাষ্ট্রপতি আর ভেঙ্কটরমণও বিলটিতে সই করেননি। ১৯৯৯ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকার বিলটি প্রত্যাহার করে নেয়।

পাকিস্তানের সংবিধানে সংসদ ভেঙে দেওয়া ও প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা ছিল প্রেসিডেন্টের। দেশের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে—এমন মনে হলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই সংসদ ভেঙে দিতে পারতেন।

এই ধারা ব্যবহার করে ১৯৮৮ সালে মুহাম্মদ খান জুনেজো, ১৯৯০ সালে বেনজীর ভুট্টো এবং ১৯৯৩ সালে নওয়াজ শরীফের নেতৃত্বাধীন সরকার ভেঙে দেওয়া হয়।

২০১০ সালে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ৫৮(২)(বি) অনুচ্ছেদটি সংবিধান থেকে বাতিল করে দেয়। এরপর থেকে দেশটিতে রাষ্ট্রপতির পদটি আলঙ্করিক।

সিঙ্গাপুরে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের কিছু ‘বিবেচনামূলক ভেটো ক্ষমতা’ আছে। রিজার্ভ থেকে সরকার টাকা খরচ করতে চাইলে তিনি সেটি আটকে দিতে পারেন।

প্রধান বিচারপতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান বা দুর্নীতি দমন সংস্থার প্রধানের মতো পদগুলোতে প্রধানমন্ত্রী কাকে নিয়োগ দিচ্ছেন, প্রেসিডেন্ট তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেন এবং নিয়োগ বাতিল করতে পারেন।

ইতালিতে প্রেসিডেন্ট কোনো মন্ত্রীর নিয়োগ নাকচ করতে পারেন। ২০১৮ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-বিরোধী অর্থনীতিবিদকে অর্থমন্ত্রী নিয়োগ এভাবে আটকে দেওয়া হয়।
কোনো আইন পছন্দ না হলে প্রেসিডেন্ট জোরালো আপত্তি ও পরামর্শসহ পার্লামেন্টে ফেরত পাঠাতে পারেন। আপত্তিগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেয় না পার্লামেন্ট।

বিএনপির ‘বল’ বিরোধী দলের দিকে

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় ঐক্যমত কমিশনে বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়া ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রপতিকে কী কী ক্ষমতা দেওয়ার কথা তারা ভাবছেন।

জবাবে তিনি বিরোধী দলের দিকে বল ঠেলে দিয়ে বলেন, ‘বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় অংশ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’

‘বিএনপি কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের পক্ষে নয়। বরং সব রাজনৈতিক মতামতের ভিত্তিতে একটি টেকসই সাংবিধানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়,’ বলেন তিনি।

এ বিষয়ে বিরোধী দল জামায়াতের প্রস্তাব সুনির্দিষ্ট নয়। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলেছে, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ভেঙে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের মধ্যে কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবে রাষ্ট্রপতির কিছু স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকতে পারে, তবে সেটি যেন নির্বাহী সরকারের বিকল্প ক্ষমতা হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সেটিও তারা চায়।

চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি টাইমসকে বলেন, ‘কিন্তু বিরোধী দল সরকারের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আর এগোয়নি।’