সম্প্রতি ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন সাভারের বাসিন্দা মাবিয়া খাতুন লাকি। তার ছেলেও ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তাদের তিনতলা বাড়ির পাশেই একটি ফাঁকা ডোবা জমি। জমে থাকা পানিতে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে মশা ডিম পেড়েছে–আর সেই অদৃশ্য বিপদই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে একটি প্রাণ।
ডেঙ্গু রোগী দ্রুত বাড়ায় দেশের হাসপাতালগুলোতে এখন নাভিশ্বাস। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিইও আনোয়ারুল কাদির নাজিম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ‘প্রতিদিনই ৩০-৪০ জন নতুন রোগী আসছে। যেভাবে চাপ বাড়ছে, তাতে সবাইকে সিট দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৬৭১ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এক শিশুসহ মারা গেছেন ২ জন। এ নিয়ে জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ২৭২ জনে, মারা গেছেন ৭৬ জন।
নতুন রোগীদের মধ্যে বরিশাল বিভাগেই সবচেয়ে বেশি–১৩৩ জন। বর্তমানে দেশজুড়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন এক হাজার ৮২২ জন রোগী।
বর্ষা নামার পর চিত্রটা দ্রুত বদলাচ্ছে। মার্চে যেখানে মাসে রোগী ছিল মাত্র ৩৫৩ জন, জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৬২ জনে।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বরিশালে, সেখানে চার হাজার ৬২৯ জন রোগী। এ ছাড়া ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় সাত হাজার পাঁচজন ও চট্টগ্রামে চার হাজার ১৮৯ জন।
আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় শতকরা ৬২ শতাংশ হলেও নারীদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেশি–প্রায় ৫৮ শতাংশ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করলেও এডিস মশা মারতে আধুনিক উদ্যোগের বালাই নেই। ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়ানোর ‘ফগিং’ পদ্ধতি বছরের পর বছর ব্যর্থ প্রমাণিত হলেও কর্তৃপক্ষ এখনো সেই পুরনো পথেই হেঁটে চলেছে।
অথচ বিশ্বজুড়ে মশা দমনের কৌশল অনেক বদলে গেছে। মশাবাহিত রোগে বিশ্বে বছরে ৭ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। এটি ঠেকাতে সিঙ্গাপুর ‘ওলবাকিয়া’ নামের একটি ব্যাকটেরিয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে মশার বংশবৃদ্ধি আটকে দিচ্ছে। আবার জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ‘বন্ধ্যা মশা প্রযুক্তি’ (এসআইটি), জৈব ওষুধ ও বৈজ্ঞানিক নজরদারির পথ ধরেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ এখনও ধোঁয়া দেওয়া, সাধারণ ওষুধ ছিটানো আর হাতে-কলমে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পুরনো চক্রেই বন্দী।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা টাইমসকে বলেন, ‘শুধু উড়ন্ত মশা মেরে ডেঙ্গু আটকানো যাবে না। মশার লার্ভা ও প্রজননস্থল নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে। মশা ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে কি না, সেটা পরীক্ষা না করে শুধু রাসায়নিক ছিটিয়ে কোনো লাভ হবে না।’
তবে সিটি করপোরেশনের কর্তারা একটু দেখেশুনে এগোতে চান। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসিফ ইকবাল টাইমসকে জানান, নতুন সব প্রযুক্তির জন্য প্রচুর তহবিল ও গবেষণার প্রয়োজন।
রাতারাতি এগুলো চালু করা সম্ভব নয়, আবার তা না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান কাজ বন্ধও রাখা যায় না। তবে তারা অপ্রয়োজনীয় ফগিং কমাচ্ছেন এবং জৈব ওষুধ ব্যবহারের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে সফল হওয়া ‘সমন্বিত মশা ব্যবস্থাপনা’–অর্থাৎ এক সঙ্গে জৈব নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর ওষুধ ছিটানোর পথ ধরলেই কেবল মশার প্রজনন থামানো এবং ডেঙ্গুর চেইন ভাঙা সম্ভব।