ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পেরোলেও প্রশাসনের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য আস্থাভাজন ও উপযুক্ত কর্মকর্তা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হচ্ছে বিএনপি সরকারকে।
নিয়মিত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় তাদের মধ্য থেকে কর্মকর্তা বাছাই নিয়েও তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। এ অবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বিএনপির আগের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে সচিব বা সমমর্যাদার ৭৯ কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক, যা মোট কর্মকর্তার প্রায় ২৯ শতাংশ।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের রদবদল অব্যাহত রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য উপযুক্ত ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা বাছাইয়ে জটিলতা কাটেনি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব কিংবা সমমর্যাদার পদে নিয়োগের জন্য কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হলেও তাদের অনেকের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন মিলছে না। আবার যাদের এসিআর ইতিবাচক, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় তাদেরও চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের এক সিনিয়র সচিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ পতনের পর কর্মকর্তাদের একটি অংশ নিজেদের বিএনপিপন্থী হিসেবে পরোক্ষভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। আরেকটি অংশ বিগত সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন বলে দাবি করে আসছেন। তবে সরকার খুবই সতর্কভাবে এসব বিষয় মূল্যায়ন করছে। কোন কর্মকর্তার কার্যক্রম কেমন, সেগুলো সরকার ওয়াকিবহাল। ফলে বিভিন্ন পদায়নের ক্ষেত্রে সরকার খুব সতর্কভাবে বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’
প্রশাসনে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত) অনুগত কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনো রয়ে গেছেন বলে সম্প্রতি মতপ্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আগের সরকারের অনুগত কিছু ব্যক্তি এখনো প্রশাসনে রয়ে গেছেন। তাদের সংশ্লিষ্ট জায়গা থেকে চিহ্নিত করে সেসব জায়গা পরিষ্কার করার একটি চেষ্টা আমরা করেছি এবং তা ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রয়েছে।’
এদিকে গতকাল সচিব পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তাকে রদবদল করেছে সরকার। তাদের সবাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে মাত্র ১১ দিন আগে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগে বদলি হওয়া রফিকুল আই মোহাম্মদকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব করা হয়েছে। একই বিভাগের সচিব মোহা. শওকত রশীদ চৌধুরীকে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) এবং বোর্ডের চেয়ারম্যান এজেএম সালাহউদ্দিন নাগরীকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগের সচিব পদে বদলি করা হয়েছে।
এর আগে গত ১০ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগের সচিব পদে পরিবর্তন করেছিল সরকার। চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োজিত কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল আই মোহাম্মদকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগে সচিব (চুক্তিভিত্তিক) করা হয়েছিল। আর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সেলিম খানকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে একই মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়। অন্যদিকে সেদিন পৃথক প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগের সচিব খান মো. নূরুল আমীনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
এদিকে গত ১৮ আগস্ট রাতে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার এবং নাটোর, গাইবান্ধা ও রংপুরের জেলা প্রশাসককে (ডিসি) দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে সরকার। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. এএনএম বজলুর রশীদকেও দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তী পদায়নের জন্য তাকেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। অন্যদিকে নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন, গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা এবং রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জনপ্রশাসনে সিনিয়র সচিব ও সচিব বা সমমর্যাদার পদে কর্মরত ৭৯ জন। এর মধ্যে ২৩ জন চুক্তিভিত্তিক। অর্থাৎ কর্মরত সচিবদের ২৯ শতাংশের মতো চুক্তিভিত্তিক। গত ১৬ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি ও একদিন পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হয়। ১৭ তারিখেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ দুই পদে ফের তাদেরই আবারো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়।
আওয়ামী লীগ আমলাতন্ত্রকে পুরোপুরি রাজনৈতিকীকরণ করেছিল। মেধাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, যার প্রভাব আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি। অকার্যকর ও ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রশাসন ব্যবস্থাকে এখন নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে এরই মধ্যে অবসরে পাঠানো হয়েছে। আবার মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হচ্ছে —মো. আব্দুল বারী প্রতিমন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
বর্তমানে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. মো. নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা রয়েছেন। এছাড়া সচিব পদমর্যাদায় বস্ত্র অধিদপ্তর, ভূমি আপিল বোর্ড, ভূমি সংস্কার বোর্ড, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট ও ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানেও চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক আনুগত্য কর্মকর্তা পদায়ন ও পদোন্নতির অন্যতম বিবেচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। নীতিনির্ধারণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রশাসনের ভূমিকা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দীর্ঘদিনের এ কাঠামো ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে প্রশাসনের ভেতরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও নাগরিক সেবা সচল রাখার জন্য অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমলাতন্ত্রকে পুরোপুরি রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছিল। সেখানে মেধাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, যার প্রভাব আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি বলেন, ‘অকার্যকর ও ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রশাসন ব্যবস্থাকে এখন নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে। অনেক অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে এরই মধ্যে অবসরে পাঠানো হয়েছে। আবার মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হচ্ছে। সরকারের সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার। আমাদের নির্বাচনী ইশতাহারের আলোকেই জনপ্রশাসনকে সাজানো হচ্ছে।’
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে জনপ্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়। ওই বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অনেক সচিব ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়, অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। গত দুই বছরে কয়েক দফায় সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রধানের পদেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। কারণ দীর্ঘদিন বঞ্চিত বা উপেক্ষিত হলেও অনেক দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ পান। একইভাবে বর্তমান প্রশাসনে থাকা কর্মকর্তাদেরও বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে সবকিছু মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়। আর পুরো এ প্রক্রিয়া একদিনে পরিবর্তনযোগ্য নয়, বরং ধীরে ধীরে সময় নিয়ে গড়ে তোলার একটি প্রশাসনিক বাস্তবতা।’